Friday, August 8, 2014

ঈদে দেশী-বিদেশী চক্রান্ত ছিল সর্বাধিক বিদেশী মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পটি ধ্বংস করার ॥ টার্গেট গার্মেন্টস ০ সরকার পরিকল্পনা জানতে পেরে আগেই সতর্ক অবস্থানে ছিল ০ বিদেশী সাংবাদিকদের ইন্টারভিউয়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয় ০ মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতে আঘাত করা

ঈদে দেশী-বিদেশী চক্রান্ত ছিল সর্বাধিক বিদেশী মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পটি ধ্বংস করার ॥ টার্গেট গার্মেন্টস
০ সরকার পরিকল্পনা জানতে পেরে আগেই সতর্ক অবস্থানে ছিল
০ বিদেশী সাংবাদিকদের ইন্টারভিউয়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয় 
০ মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতে আঘাত করা
ফিরোজ মান্না ॥ গার্মেন্টস সেক্টরকে ধ্বংস করার জন্য দেশী-বিদেশী চক্রান্ত চলছেই। দেশীয় কিছু শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের দিয়ে এই সেক্টরকে ধ্বংস করার জন্য বিপুল অর্থের যোগান দেয়া হচ্ছে। এ কারণে সাধারণ কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে কারখানাগুলোতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে বিদেশীদের চোখে এই শিল্পকে কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানাকে টার্গেট করা হয়েছিল। বেশির ভাগ গার্মেন্টসে বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় তারা সুযোগটি তোবা গার্মেন্টসের ওপর নিয়ে যায়। টানা ১২ দিন ধরে সেখানে বেতন-ভাতার দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। গার্মেন্টসে অস্থিরতা তৈরি হতে পারেÑএমন প্রতিবেদন প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে ঈদের আগেই দিয়েছিল। সরকারও ওই প্রতিবেদন পেয়ে সতর্ক অবস্থানেই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে তোবা গার্মেন্টস নিয়ে ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করছে এই শিল্পবিরোধী লোকজন।
প্রভাবশালী ওই গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, গার্মেন্টস সেক্টরকে এভাবে অশান্ত করে তোলা হলো কিভাবে, তা পর্যালোচনা করে দেখা হয়েছে। তাতে অনেক প্রশ্নের উত্তরও বের হয়ে এসেছে। তোবা গার্মেন্টসে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে বেশির ভাগ বাইরের লোক। এদের ব্যবহার করা হয়েছে। বাইরে থেকে যোগ দেয়া আন্দোলনকারীদের বেশির ভাগ জামায়াত ও বিএনপিপন্থী লোকজন। প্রথমদিকে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে। পরে তারা কৌশলে এই শিল্পকে বিনষ্ট করার জন্য দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে ইন্টারভিউ দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যায়। ভূ-রাজনৈতিক ও কর্তৃত্ববাদিতার জন্য বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গার্মেন্টস শিল্পকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দেয়াই তাদের মূলকাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পেছনে বিশ্বের একটি প্রভাবশালী দেশ এবং জামায়াতের ইন্ধন রয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাটি খবর দিয়েছে।
২০০৭ সালের পর এটাই সবচেয়ে বড় শ্রমিক আন্দোলন। কেন এমন আন্দোলন দানা বেঁধেছে, এটা নিয়ে অনেক বিষয় জড়িত রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এর একটা বড় কারণ। মিয়ানমার হঠাৎ করে দুটি শক্তিশালী দেশের বন্ধু রাষ্ট্র হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী, সেখানে কোন তৈরি পোশাক শিল্প গড়ে উঠেনি। এখন সেখানে গার্মেন্টস শিল্প গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাটি জানিয়েছে। বাংলাদেশে একজন শ্রমিক প্রতিমাসে সর্বনিম্ন বেতন পান ৫৫ মার্কিন ডলার। চীনে প্রতিমাসে একজন শ্রমিক ২০৬ ডলার, শ্রীলংকায় ১০৭ ডলার, পাকিস্তানে ৮৫ ডলার, ভারতে ৬৫ ডলার বেতন পান। দেশে শ্রমের মূল্য কম হলেও এই সেক্টর থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে। এই বাজারটি অন্য কোথাও চলে যাকÑএ জন্য দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র চলছে দীর্ঘদিন ধরে। তারই বহির্প্রকাশ গত কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ। পোশাক শিল্পে এমন অস্থিরতার পেছনে বিদেশী চক্রান্তকেই বড় করে দেখা হচ্ছে।
এক হিসেবে বলা হয়েছে, বেসরকারী খাতে সর্ববৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী একটি খাত হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প। মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৮০ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। উদ্যোক্তারা আশা করছেন, আগামী ২০১৫ সালের মধ্যেই তৈরি পোশাক রফতানি থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েই কাজ করছেন উদ্যোক্তারা। তবে এ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চূড়া স্পর্শ করতে হলে উদ্যোক্তাদের একার চেষ্টাই যথেষ্ট নয়। এ জন্য দরকার তৈরি পোশাক শিল্পের স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ এবং এ খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকারের নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখা।
সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের নবেম্বরে সরকার-মালিক-শ্রমিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে গার্মেন্টসের সর্বনিম্ন বেতন ঠিক করা হয় ৫ হাজার ৩শ’ টাকা। ওই বৈঠকে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল আগামী দুই বছরের মধ্যে আর কোন বেতন বৃদ্ধির প্রশ্ন তোলা হবে না। তখন বিষয়টি শ্রমিকরাও মেনে নেয়। দুই বছর পার হতে আরও ৬ মাস বাকি রয়েছে। এখন কেন বেতন-ভাতা বৃদ্ধির নামে তৈরি পোশাক শিল্পে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হলো। তোবা গার্মেন্টসকে কেন্দ্র করে অন্য কারখানাগুলোতেও শ্রমিক আন্দোলন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। সবখানেই পেছন থেকে ইন্ধন দেয়া হচ্ছে। আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। বাকিরা আসে বাইরে থেকে। তারা ভাড়াটে লোকজন। তাদের কাজই হচ্ছে গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিরতা তৈরি করা।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকা-ের পর ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল লেবার হিউম্যান রাইটস নামের একটি সংগঠনের দুইজন এ্যাগোল গ্রীন সুজান ও চার্লস কার্লহাম ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাঁরা বাংলাদেশে ঘুরেফিরে একাধিক শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁরা দেশে গিয়ে বিসিডাব্লিউএস নামের একটি শ্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে আমিনুল ইসলাম হত্যাকা- নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসসহ বেশ কয়েকটি কাগজে প্রতিবেদন প্রকাশ করায়। এরপর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে চলে আসে। তখন থেকেই গার্মেন্টস শিল্পের ওপর একের পর এক আঘাত আসতে শুরু করে। ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমিনুলের বিষয় নিয়ে কথা বলেন। হিলারি আমিনুলের বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পর বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্প প্রস্ততকারক ও রফতানিকারক সমিতির নির্বাহী পরিষদের সভায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
সূত্র জানিয়েছে, এর আগে এএফএল-সিআইও বাংলাদেশের জিএসপি অধিকার বাতিলের জন্য আবেদন করেছে, যা এখনও নির্ধারিত হয়নি। যদিও এর ফলে তৈরি পোশাক শিল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবে এ অধিকার বাতিল হলে সমস্ত আমেরিকাজুড়ে একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে যাবে যেÑবাংলাদেশ শ্রমবান্ধব নয়; এ বার্তাটি তৈরি পোশাক ক্রেতা ও ভোক্তার কাছেও পৌঁছে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি (টিকফা) সম্পাদনে দেরি হওয়াটা ওয়াশিংটনে দেখানো হয়েছেÑবাংলাদেশ তার আন্তর্জাতিক শ্রম আইনগত বাধ্যবাধকতা থেকে পিছু হটছে, যা তারা আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন ঘোষণায় অঙ্গীকার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটি গ্রহণ করেছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অঙ্গীকার থেকে পিছু হটতে পারবে না। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এবিসি নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্পর্র্কে নেতিবাচক প্রতিবেদনসমূহ আমেরিকার জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ওই গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, তৈরি পোশাক খাতে শ্রম পর্যবেক্ষণকারী বাংলাদেশী কর্মীরা প্রধানত জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেতন বৃদ্ধি না হওয়ায় এবং আমিনুল ইসলামের মৃত্যু ও অন্যান্য শ্রম কর্মীদের হয়রানির ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। এই হতাশা বেপরোয়া কর্মকা-ের আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের বিশৃঙ্খলতায় ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এই বক্তব্যের পর থেকেই শ্রমিক অসন্তোষ বাড়তে শুরু করে। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বলেন, মালিকরা সমস্ত গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ করে দেন। শ্রমিক নেতৃবৃৃন্দের বক্তব্য হচ্ছে- এভাবে কোন কারখানা মালিক কারখানা বন্ধ করতে পারেন না। বাংলাদেশে এমন কোন আইন নেই, যার বলে একযোগে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা যায়। এটা কারখানা আইনবিরোধী।
গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, তৈরি পোশাক বাজারজাত করার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সঙ্গে মার খাচ্ছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ। বাস্তবতা একটু অবাক করার মতো। পোশাক শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজসহ সবকিছুই আমদানি করতে হয়। অথচ পাশাপাশি এমন অনেক দেশ আছে যাদের তুলা, সুতা ও হেভি ইন্ডাস্ট্রির শক্ত ভিত্তি রয়েছে। তারাও কুলিয়ে উঠছে না বাংলাদেশের সঙ্গে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উত্থান ঘটেছে তিলে তিলে। এই শিল্পকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে।
বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম জানান, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁরা টাকা নিয়ে প্রস্তুত রয়েছেন। শ্রমিকরা এলেই টাকা দেয়া শুরু করবেন। ইতোমধ্যে ৫৯০ শ্রমিককে তাদের বেতন-ভাতা পারিশোধ করা হয়েছে। সরকার সর্বনিম্ন বেতন ৫ হাজার ৩শ’ টাকা করলেও মোশরেফা মিশু বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়েছে তিন হাজার টাকা। এই তিন হাজার টাকা দিয়ে ঘরভাড়া করে থাকা, খাওয়া, ওষুধপত্রের খরচা চালানো অসম্ভব। এত অল্প টাকায় মনুষ্যচিত জীবনযাপন অসম্ভব। তাই দেখা যায় যে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকাংশই বস্তিতে ঘরভাড়া করে থাকেন। কিন্তু বস্তিতেও এখন ঘরভাড়া বেড়েছে। আর গত কিছু দিনে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। তাই সব মিলিয়ে দেখা যায়, খেয়ে না খেয়ে কোনভাবে বেঁচে আছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment