Saturday, August 9, 2014

আদিবাসী অধিকার নিয়ে কিছু কথা

আদিবাসী অধিকার নিয়ে কিছু কথা
ড. শাহজাহান মণ্ডল
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত বাহাত্তরের সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে এ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছিল যেটিকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজে বাঙালী হওয়া সত্ত্বেও বাতিল করেছিলেন ১৯৭৯ সালে, সংবিধানের ৫ম সংশোধনী দ্বারা। তখন থেকে বত্রিশ বছর অপেক্ষা। অতঃপর বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংখ্যাগুরু বাঙালীদের আবারও এনে দিলেন সেই সত্য স্বীকৃতি : ‘বাঙালী।’ সঙ্গে সঙ্গে এনে দিলেন এদেশের প্রায় ১৬ লাখ অবাঙালীর অস্তিত্ব ও মর্যাদার স্বীকৃতি : ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়।’
এদেশের ব্যুৎপত্তিগত/ভাষাগত সংখ্যালঘু হলো ৫৭টি জনগোষ্ঠী, যেমন সাঁওতাল, মগ, মুরং, চাকমা, মারমা প্রভৃতি। এই সংখ্যালঘু মানুষগণকেই পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। এই স্বীকৃতি তাদের অধিক মর্যাদার আসনে নিয়ে এসেছে এবং তাদের মানবাধিকার সমুন্নত করেছে।
এই মর্যাদার স্বীকৃতিকে সংখ্যালঘু মানুষরা সহজভাবে গ্রহণ করেছে বলে মনে হয় না। তারা এই জাতীয়তার স্বীকৃতির পরিবর্তে বুঝে কিংবা না বুঝে ‘আদিবাসী’ (রহফরমবহড়ঁং) হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বেশি আগ্রহী। ঢাকা থেকে প্রকাশিত উপজাতিবিষয়ক গ্রন্থ ঐঁসধহ জরমযঃং জবঢ়ড়ৎঃ ২০১১ ড়হ ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষবং রহ ইধহমষধফবংয-এ দেখা যায়, আদিবাসী নেতৃবৃন্দ এই বলে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর প্রতিবাদ জানিয়েছেন যে, সরকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক অধিকার না দেয়ার মতো ও বিভ্রান্তিকর বিধান গ্রহণ করেছেন; এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহকে এভাবে চিহ্নিতকরণ হলো দুর্ভাগ্যজনক ও বিভ্রান্তিকর। ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতির দাবির প্রেক্ষিতে দেখা প্রয়োজন আসলেই বংলাদেশে তারা আদিবাসী কিনা এবং সংবিধান যে তাদের ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে তা যথার্থ কিনা।
সংবিধানে দেয়া ‘উপজাতি’ শব্দটি ‘জাতি’র সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ করে বলে প্রতীয়মান হয়। এটি কোন বিশেষ জনগোষ্ঠীর লোকেদের সংখ্যাগুরু জাতির লোকেদের তুলনায় সংখ্যায় কম বলে প্রকাশ করে। জাতীয়তা হতে পারে ব্যুৎপত্তিগত/বংশগত, ভাষাগত, ধর্মীয়, বর্ণগত ইত্যাদি। জাতীয়তাবোধ একটি মানসিক, একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। একটি মানব-গোষ্ঠীর মধ্যে একই ধরনের স্বার্থের বন্ধন, ধ্যান-ধারণার সাদৃশ্য, অতীতের স্মৃতি-ঐতিহ্যের প্রতি সমান অনুরাগ কিংবা কোন একই আদর্শ থাকলে সেই মানব-গোষ্ঠী একটি জাতি হতে পারে। এ সমস্ত উপাদানের বিচারে তথা ব্যুৎপত্তিগত বা/ও ভাষাগত বিচারে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু জাতি হলো বাঙালী; আর সংখ্যালঘু জাতি হলো উল্লেখিত সাতান্নটি, যেমন চাকমা, মগ, মুরং, খাসিয়া, সাঁওতাল, তঞ্চংগ্যা ইত্যাদি। এদেশে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু জাতি হলো মুসলমান, ধর্মীয় সংখ্যালঘু জাতি হলো হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ও শিখেরা।
যেহেতু ব্যুৎপত্তির ভিত্তিতে বাঙালী জাতির লোকেদের তুলনায় চাকমা, মগ, মুরং, খাসিয়া, সাঁওতাল, তঞ্চংগ্যা প্রভৃতির লোকসংখ্যা কম সেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে তাদের একেকটি উপজাতি বললে ভুল হয় না। একটি নির্দিষ্ট শহরের পার্শ্ববর্তী ছোট এলাকা যেমন ঐ শহরের উপশহর, প্রশান্ত মহাসাগরের উপকণ্ঠে যেমন বঙ্গ উপসাগর তেমনি একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সংখ্যাগুরু লোকেদের সঙ্গে যে সংখ্যালঘুরা বসবাস করে তারা হলো সংখ্যাগুরু জাতির তুলনায় সংখ্যালঘু বা উপজাতি। ‘উপজাতি’ বলার মাধ্যমে তাদের অসম্মান করার কোন সুযোগ বা চর্চা নেই। সংখ্যায় বেশি হওয়াটা যেমন সম্মান অর্জনের কোন মানদ- নয়, সংখ্যায় কম হওয়াটা তেমনি সম্মান হারানোর কোন মানদ- হয় না।
‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ দিয়ে সংখ্যাগত অবস্থানের বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায় মাত্র। সংবিধানে ‘উপজাতি’ ও ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ বলতে মূলত একই লোকেদের বোঝানো হয়েছে। ‘উপ’ ও ‘ক্ষুদ্র’ শব্দ দুটি এখানে সমার্থক। ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ বলতে মান-সম্মানগত ক্ষুদ্রতা এখানে প্রকাশ পায়নি, সংখ্যাগত স্বল্পতা প্রকাশ পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের যে দুটি প্রধান দলিলের ভিত্তিতে এদেশের সংখ্যালঘুরা ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করে সেগুলো হলো : একটি ঘোষণা এবং একটি কনভেনশন। প্রথমটি হলো (ক) টঘ উবপষধৎধঃরড়হ ড়হ ঃযব জরমযঃং ড়ভ ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষবং ২০০৭, এবং দ্বিতীয়টি হলো (খ) আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গৃহীত ১৬৯ নম্বর কনভেনশন, ওহফরমবহড়ঁং ধহফ ঞৎরনধষ চবড়ঢ়ষবং ঈড়হাবহঃরড়হ ড়ভ ১৯৮৯। এর মধ্যে ঘোষণাটিতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির কোন সংজ্ঞা নেই। তবে কনভেনশনটিতে রয়েছে। কনভেনশনের ১.১.খ. অনুচ্ছেদে যে সংজ্ঞা দেয়া রয়েছে তা হলো: স্বাধীন দেশসমূহের জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের কোন অংশকে এই বিবেচনায় আদিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয় যে তারা রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্থাপনের কালে অথবা বর্তমান রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের কালে এই দেশে কিংবা যে ভৌগোলিক ভূখণ্ডে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারী জাতিগোষ্ঠীর বংশধর এবং তারা তাদের আইনগত মর্যাদা নির্বিশেষে তাদের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অক্ষুণœ রাখে। এ সংজ্ঞা মতে দেখা যেতে পারে বাংলাদেশের ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ভুক্ত মানুষগুলো আদিবাসী কিনা, এবং অত্যন্ত গুরুত্বের বিষয় হলো, এ সংজ্ঞা মতে বাঙালীরাও আদিবাসী কিনা।
কনভেনশনের এই সংজ্ঞায় তিনটি কালের কথা উল্লেখিত হয়েছে। রাজ্য বিজয় কাল, উপনিবেশ স্থাপনের কাল অথবা বর্তমান রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের কাল। এই তিন কালের যে কোন এক কালে এই ভূখণ্ডে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীর বংশধররাই এদেশের ‘আদিবাসী’ গণ্য হওয়ার কথা।
প্রথমত জানা প্রয়োজন যে, কোন রাজ্য বিজয়ের মাধ্যমে বর্তমান ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় উপমহাদেশ কার্যত ইংরেজদের উপনিবেশে পরিণত হয় ১৭৫৭ সালে, তাদের নিকট নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের মাধ্যমে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তখন বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উল্লেখিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বংশধররা বাস করত। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাবের লগ্ন থেকে সেই উপনিবেশও নেই। তবে এ কথা সত্য যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে উক্ত সংখ্যালঘুরা এখানে বাস করত; এবং উভয় সময়েই তারা নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অক্ষুণœ রাখতে পেরেছিল। অতএব তারা উক্ত ঈড়হাবহঃরড়হ ড়ভ ১৯৮৯ মোতাবেক বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে আদিবাসী হওয়ার যোগ্য। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এ সূত্র প্রয়োগ করলে দেখা যায়, একই ভূখণ্ডে বাঙালীরাও উভয় সময়েই সংখ্যাগুরু বাঙালী জনগোষ্ঠীর বংশধর এবং তারাও তাদের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আংশিক বা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে। কাজেই বাঙালীরাও এই ঈড়হাবহঃরড়হ মোতাবেক বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে আদিবাসী। সুতরাং উক্ত ঈড়হাবহঃরড়হ অনুযায়ী বাংলাদেশের বাঙালী ও অবাঙালী সকল জনগোষ্ঠীই আদিবাসী।
এই কনভেনশনটিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর দেয়নি কিংবা একে অনুমোদন দেয়নি। সুতরাং সরকারী দৃষ্টিভঙ্গিতে এদেশের উক্ত ৫৭টি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কিংবা বাঙালী কেউই কনভেনশনটির আলোকে নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবার দাবি করার ক্ষেত্রে আইনগতভাবে যোগ্য নয়।
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদ মোতাবেক নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান সরকার গ্রহণ করতে পারেন। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এদেশের অ-বাঙালী জনগণের সংখ্যা ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১। এটি মোট জনসংখ্যার ১.১০ শতাংশ। কিন্তু বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারী চাকরিতে তাদের জন্য অনগ্রসর অংশ হিসেবে ৫ শতাংশ সুযোগ সংরক্ষিত রয়েছে যা তাদের লোকসংখ্যার অনুপাতে চার গুণের বেশি। উপরন্তু এক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাগণের ছেলেমেয়ে, বা ছেলের ছেলে অথবা ছেলের মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত ৩০ শতাংশ, নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১০ শতাংশ এবং জেলার জন্য সংরক্ষিত ১০ শতাংশ চাকরিও তাদের জন্য উন্মুক্ত। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ইসলামীসহ সকল সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে আসনও সংরক্ষণ করা হয় তাদের জন্য। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান বা শিখদের জন্য উপরে উল্লেখিত কোন ধরনের কোটা সংরক্ষিত হয় না।
আলোচ্য আন্তর্জাতিক ঘোষণা বা কনভেনশনে কিংবা এ জাতীয় আন্তর্জাতিক কোন আইনগত দলিলেই ‘আদিবাসী’ (Indigenous) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কোন অধিকারের উল্লেখ নেই। এদেশের দেশীয় আইনগত দলিলেও তা নেই। এদেশের ব্যুৎপত্তিগত সংখ্যালঘুদের যা আছে তা হলো, UN Declaration on the Rights of Indigenous Peoples, 2007-এর অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী জাতীয়তা পাওয়ার অধিকার। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী এবং ১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ২৪(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ীও তাদের রয়েছে জাতীয়তা পাওয়ার অধিকার। সংখ্যালঘুদের এই অধিকারটিকেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। সুতরাং এ স্বীকৃতির পর স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগতে পারে, ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির আদৌ প্রয়োজন আছে কি?


লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, আইন বিভাগ ও প্রাক্তন ডিন, আইন অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।
msmondol@gmail.com
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment