মার্কিন বঙ্গনামা নীনা আহমেদ, পুজো ও লাল শাক
দাউদ হায়দার
‘যে বঙ্গেরই হোন, আপনি বাঙালী। শিকড় যদি বাংলায়, সোনার বাংলা গাইতেই হবে। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বলে কি দেশের বাইরে পাবলিকলি, মানে, সম্মেলনে গাওয়া যাবে না?
এই গান দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু করব। দেখবেন, সব শ্রোতাই উঠে দাঁড়াবেন। কোরাস গাইবে। কেউ মিহি, হেঁড়ে গলায়, চেঁচিয়ে গাইবে। কেউ শুধু ঠোঁট নাড়াবে। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটবে। মেয়েদের ঠোঁটের লিপস্টিক মুছে যাবে। সোনার বাংলা শেষ হলেই নারীকুল চেয়ারে বসবে, পয়লা ডিউটি, ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট্ট আয়না এবং লিপস্টিক বের করবে। ঠোঁট রাঙাবে, দেখবে যুতসই হয়েছে কিনা।
অতঃপর রংমাখা হাসির সঙ্গে প্রশ্ন, হাই, হাউ আর ইউ। এসব দেখেশুনে চোখমুখ কাবু করবেন না, বলবেন, ওয়েল। মনে রাখবেন, এটা মার্কিনমুলুক। ইংরেজী পয়লা ভাষা। দ্বিতীয় হিস্পানি।
তিন নম্বর চাইনিজ। লিবার্টি বেলের রেপ্লিকা তথা স্যাভেনির কিনুন, দেখবেন, মেড ইন চায়না।
বছরে দুইবার বাঙালী হই, পুজো এবং বাংলা নববর্ষে, পয়লা বৈশাখে। মাঝে মধ্যে অবশ্য বাংলা গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, সাহিত্য সম্মেলনও হয়। দুই বাংলার মানুষ সমবেত। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা এবং বাংলার আসল কালচার পরনিন্দা, পরচর্চা। এই নিয়েই আছি পরবাসে, বিভূঁইয়ে। দেশসমাজ থেকে দূরে আছি বলে কি এর-ওর কেচ্ছা, গীত গাইব না? ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’
পুজো কবে? ...এই প্রশ্নে, পাশেই দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ়, সৈয়দ পদবিধারী, ভ্রূ কুঁচকে, ব্যঙ্গ কণ্ঠে বলেন, ঈদ কবে জিজ্ঞেস করলেন না, পুজোর খবর আগে জানতে চাইলেন।
আরেকজন, তাঁর নামের শেষে রহমান, ‘দোষের কী? আজ তিন রোজা, ২৭ দিন পরেই ঈদ, প্রত্যেকে জানে। এই নিয়ে জিজ্ঞেস করার কী আছে। পুজোর দিন-তারিখ নিয়েই ঝামেলা। নানা পুরোহিতের নানা মত। পুজোর সময় নিত্যদিনই আপনাকে দেখি। আপনিই আগে আসেন। খেতে। এক ডলারও চাঁদা দেন না। উল্টো, লুচি-ম-া ব্যাগে নিয়ে যান। এবারের পুজোয় বাঘা বাঘা আর্টিস্ট আসবেন। বাঘিনীরাও। পয়লা আসন দখল করবেন আপনিই। ...চত্বরে নারদ ছিলেন না, রক্ষে।
ফিলাডেলফিয়াসহ পেনসিলভানিয়ার নানা শহরে এত কবি-গাল্পিক, গায়ক, নাচিয়, দুই বাংলার, দুই হাতের আঙ্গুলে গুনেও কুল পাওয়া দুষ্কর। পুজোর সময়, ফিলাডেলফিয়াতেই চারটি পুজো, সঙ্কলন প্রকাশিত। সাহিত্যচর্চায় ভাটা নেই। রাধাপ্রসাদ গুপ্ত ওরফে সাঁটুল গুপ্তর ভাষ্য : বিদেশে গিয়েও বাঙালী হেঁজে গেছে। বিজ্ঞান চর্চা কর, পয়সা হবে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। মার্কিনমুলুকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।’ গান শেষে তিন মিনিটের বিরতি। কানে আসে, বলছেন অনেকেই, টাগোর ওয়াজ এ্যা গ্রেট সং রাইটার।
বিরতির পর ভাষণ। কোথায় লাগে বুদ্ধদেব-মমতা-হাসিনা-খালেদা-এরশাদের ভাষণ। এও সহনীয়। দুইজনের ‘ছোট গল্প’ এক ঘণ্টায় শেষ হয় না। শ্রোতাদের চিতকার, থামুন, থামুন। কবিতাপাঠেও প্রায় একই চিত্র। ২৭ কবির কবিতা। কোন কবির কবিতাই পাঁচ/সাত পৃষ্ঠার কম নয়। একজনের মন্তব্য : বাংলায় এত মহাকবির জন্ম, মার্কিনমুলুকে প্রতিভা বিকশিত।
অনুষ্ঠানে নীনা আহমেদ আসছেন, গুঞ্জরণ সন্ধ্যা থেকেই। নীনা এখন দুই বাংলার গর্ব। থাকেন ফিলাডেলফিয়ায়। ইনকামট্যাক্স ল ইয়ার। মহিলা-ধনকুবের। শরীর স্বাস্থ্যে পৃথুলা, চোখেমুখে সুন্দরী। বয়সও কম, চল্লিশের নিচে। বারাক ওবামার উপদেষ্টাকুলের একজন (আয়করসংক্রান্ত)। নীনা আহমেদ বাংলাদেশের। তাতে কী। তিনি বাঙালী। আহ্লাদে ষোলোখানা। শোনা কথা, তিনি কোন বাঙালীর কেস নেন না, সাহায্য করেন না। ওবামার উপদেষ্টা বলে কথা!! অনুষ্ঠানে আসেননি।
ভাগ্যিস আসেননি। পুলিশী ঝামেলা হয়নি। অনুষ্ঠান শেষে বুফে-ডিনার। চিংড়ি দিয়ে লাল শাক। সঙ্গে শুকনো মরিচ। মুহূর্তেই শেষ। আফসোস শুনে শেখ জাহিদ বললেন, ‘কত খাইবেন, আমার দ্যাড় বিঘা জমিনে লাল শাক, মরিচ, পুইশাক, ঢ্যাঁড়স, কুমড়া, বেগুন লাগাইছি। চলেন, ছিঁড়বেন আর খাইবেন।’
ফিলাডেলফিয়া থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে লানসডেল। না শহর, না গ্রাম। লানসডেল থেকে চার মাইল দূরেই শেখ জাহিদের খামার। গোটা অঞ্চল ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুর। ওঁরা বলেন, রান্চ। হরিণ, ঘোড়া-গরু-ছাগল সবই আছে। চরছে। নেই কেবল পশুপ্রেম। শেখ জাহিদ জিজ্ঞেস করলেন, কোনটা খাইবেন? কচি বাছুর, কচি ফাঁঠা, সিংহীন হরিণের একই স্বাদ।
বললুম, রাত্রি হয়েছে। সকালে বস্টনে যেতে হবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা।
শেখ জাহিদ : আপনার মতো ফালতু কবিও হার্ভার্ডে বক্তা!
daud.haider21@gmail.com
এই গান দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু করব। দেখবেন, সব শ্রোতাই উঠে দাঁড়াবেন। কোরাস গাইবে। কেউ মিহি, হেঁড়ে গলায়, চেঁচিয়ে গাইবে। কেউ শুধু ঠোঁট নাড়াবে। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটবে। মেয়েদের ঠোঁটের লিপস্টিক মুছে যাবে। সোনার বাংলা শেষ হলেই নারীকুল চেয়ারে বসবে, পয়লা ডিউটি, ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট্ট আয়না এবং লিপস্টিক বের করবে। ঠোঁট রাঙাবে, দেখবে যুতসই হয়েছে কিনা।
অতঃপর রংমাখা হাসির সঙ্গে প্রশ্ন, হাই, হাউ আর ইউ। এসব দেখেশুনে চোখমুখ কাবু করবেন না, বলবেন, ওয়েল। মনে রাখবেন, এটা মার্কিনমুলুক। ইংরেজী পয়লা ভাষা। দ্বিতীয় হিস্পানি।
তিন নম্বর চাইনিজ। লিবার্টি বেলের রেপ্লিকা তথা স্যাভেনির কিনুন, দেখবেন, মেড ইন চায়না।
বছরে দুইবার বাঙালী হই, পুজো এবং বাংলা নববর্ষে, পয়লা বৈশাখে। মাঝে মধ্যে অবশ্য বাংলা গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, সাহিত্য সম্মেলনও হয়। দুই বাংলার মানুষ সমবেত। খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা এবং বাংলার আসল কালচার পরনিন্দা, পরচর্চা। এই নিয়েই আছি পরবাসে, বিভূঁইয়ে। দেশসমাজ থেকে দূরে আছি বলে কি এর-ওর কেচ্ছা, গীত গাইব না? ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’
পুজো কবে? ...এই প্রশ্নে, পাশেই দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ়, সৈয়দ পদবিধারী, ভ্রূ কুঁচকে, ব্যঙ্গ কণ্ঠে বলেন, ঈদ কবে জিজ্ঞেস করলেন না, পুজোর খবর আগে জানতে চাইলেন।
আরেকজন, তাঁর নামের শেষে রহমান, ‘দোষের কী? আজ তিন রোজা, ২৭ দিন পরেই ঈদ, প্রত্যেকে জানে। এই নিয়ে জিজ্ঞেস করার কী আছে। পুজোর দিন-তারিখ নিয়েই ঝামেলা। নানা পুরোহিতের নানা মত। পুজোর সময় নিত্যদিনই আপনাকে দেখি। আপনিই আগে আসেন। খেতে। এক ডলারও চাঁদা দেন না। উল্টো, লুচি-ম-া ব্যাগে নিয়ে যান। এবারের পুজোয় বাঘা বাঘা আর্টিস্ট আসবেন। বাঘিনীরাও। পয়লা আসন দখল করবেন আপনিই। ...চত্বরে নারদ ছিলেন না, রক্ষে।
ফিলাডেলফিয়াসহ পেনসিলভানিয়ার নানা শহরে এত কবি-গাল্পিক, গায়ক, নাচিয়, দুই বাংলার, দুই হাতের আঙ্গুলে গুনেও কুল পাওয়া দুষ্কর। পুজোর সময়, ফিলাডেলফিয়াতেই চারটি পুজো, সঙ্কলন প্রকাশিত। সাহিত্যচর্চায় ভাটা নেই। রাধাপ্রসাদ গুপ্ত ওরফে সাঁটুল গুপ্তর ভাষ্য : বিদেশে গিয়েও বাঙালী হেঁজে গেছে। বিজ্ঞান চর্চা কর, পয়সা হবে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। মার্কিনমুলুকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।’ গান শেষে তিন মিনিটের বিরতি। কানে আসে, বলছেন অনেকেই, টাগোর ওয়াজ এ্যা গ্রেট সং রাইটার।
বিরতির পর ভাষণ। কোথায় লাগে বুদ্ধদেব-মমতা-হাসিনা-খালেদা-এরশাদের ভাষণ। এও সহনীয়। দুইজনের ‘ছোট গল্প’ এক ঘণ্টায় শেষ হয় না। শ্রোতাদের চিতকার, থামুন, থামুন। কবিতাপাঠেও প্রায় একই চিত্র। ২৭ কবির কবিতা। কোন কবির কবিতাই পাঁচ/সাত পৃষ্ঠার কম নয়। একজনের মন্তব্য : বাংলায় এত মহাকবির জন্ম, মার্কিনমুলুকে প্রতিভা বিকশিত।
অনুষ্ঠানে নীনা আহমেদ আসছেন, গুঞ্জরণ সন্ধ্যা থেকেই। নীনা এখন দুই বাংলার গর্ব। থাকেন ফিলাডেলফিয়ায়। ইনকামট্যাক্স ল ইয়ার। মহিলা-ধনকুবের। শরীর স্বাস্থ্যে পৃথুলা, চোখেমুখে সুন্দরী। বয়সও কম, চল্লিশের নিচে। বারাক ওবামার উপদেষ্টাকুলের একজন (আয়করসংক্রান্ত)। নীনা আহমেদ বাংলাদেশের। তাতে কী। তিনি বাঙালী। আহ্লাদে ষোলোখানা। শোনা কথা, তিনি কোন বাঙালীর কেস নেন না, সাহায্য করেন না। ওবামার উপদেষ্টা বলে কথা!! অনুষ্ঠানে আসেননি।
ভাগ্যিস আসেননি। পুলিশী ঝামেলা হয়নি। অনুষ্ঠান শেষে বুফে-ডিনার। চিংড়ি দিয়ে লাল শাক। সঙ্গে শুকনো মরিচ। মুহূর্তেই শেষ। আফসোস শুনে শেখ জাহিদ বললেন, ‘কত খাইবেন, আমার দ্যাড় বিঘা জমিনে লাল শাক, মরিচ, পুইশাক, ঢ্যাঁড়স, কুমড়া, বেগুন লাগাইছি। চলেন, ছিঁড়বেন আর খাইবেন।’
ফিলাডেলফিয়া থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে লানসডেল। না শহর, না গ্রাম। লানসডেল থেকে চার মাইল দূরেই শেখ জাহিদের খামার। গোটা অঞ্চল ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুর। ওঁরা বলেন, রান্চ। হরিণ, ঘোড়া-গরু-ছাগল সবই আছে। চরছে। নেই কেবল পশুপ্রেম। শেখ জাহিদ জিজ্ঞেস করলেন, কোনটা খাইবেন? কচি বাছুর, কচি ফাঁঠা, সিংহীন হরিণের একই স্বাদ।
বললুম, রাত্রি হয়েছে। সকালে বস্টনে যেতে হবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা।
শেখ জাহিদ : আপনার মতো ফালতু কবিও হার্ভার্ডে বক্তা!
daud.haider21@gmail.com

No comments:
Post a Comment