Saturday, August 9, 2014

দেশের সকল গার্মেন্টস কারখানায় স্বাভাবিক কাজকর্ম ॥ ধর্মঘট নয় ০ তোবার প্রভাব কোথাও পড়েনি। তিন মাসের বেতন হওয়ায় সব ধরনের কর্মসূচী প্রত্যাহার ০ শ্রমিক, বিজিএমইএ ও সরকারের বৈঠক

দেশের সকল গার্মেন্টস কারখানায় স্বাভাবিক কাজকর্ম ॥ ধর্মঘট নয়
০ তোবার প্রভাব কোথাও পড়েনি। তিন মাসের বেতন হওয়ায় সব ধরনের কর্মসূচী প্রত্যাহার
০ শ্রমিক, বিজিএমইএ ও সরকারের বৈঠক
এম শাহজাহান ॥ অবশেষে তিন মাসের বেতন পাচ্ছে তোবা গ্রুপের পোশাক শ্রমিকরা। আর তাই আন্দোলন নয়, এবার তোবা গ্রুপকে সহযোগিতা করতে চায় তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি। দাবি অনুযায়ী তিন মাসের বেতন হওয়ায় সব ধরনের কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিয়েছে আন্দোলনরত শ্রমিক সংগঠনগুলো। জুলাই মাসের বেতন আজ রবিবার দেয়ার ঘোষণা আগেই দিয়েছিল সরকার। সরকারের সেই ঘোষণা অনুযায়ী আজ বিজিএমইএ থেকে দুপুর ২টায় বেতন পাবেন তোবার পোশাক শ্রমিকরা। শ্রমিকদের দাবি পূরণ হওয়ায় শনিবারের ধর্মঘটও পালিত হয়নি দেশের কোন গার্মেন্ট কারখানায়। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের সব পোশাক কারখানায় স্বাভাবিক কাজকর্ম হয়েছে। গাজীপুর শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, গাজীপুরের সব পোশাক কারখানায় কাজ চলছে।
এদিকে, শ্রম অসন্তোষের জন্য তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেন ও বিজিএমইএকে দায়ী করেছেন তোবা গ্রুপ সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশু। তিনি বলেছেন, পুরো ঘটনার জন্য দায় এড়াতে পারে না সরকারও। কারণ বকেয়া বেতন-ভাতা ও ঈদ বোনাস নিয়েই তোবায় যত সমস্যা। ঈদের আগে বেতন-ভাতা ওভারটাইম ও বোনাস না পাওয়ায় শ্রমিকরা অনশনে যেতে বাধ্য হয়েছে। আন্দোলন করেছে। অথচ আমরা কি দেখলাম ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে এতে রঙ চঙ মাখিয়ে ভিন্ন রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরও শেষ পর্যন্ত সরকারের উদ্যোগে বিজিএমইএ শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন পরিশোধ করতে যাচ্ছে।
ফলে এখন থেকে তোবা গ্রুপ নিয়ে আর আন্দোলন নয়। তিনি বলেন, আমরা এই গ্রুপের ব্যবস্থাপনাকে সহযোগিতা করতে চাই। তারা যেন তাদের সব পোশাক কারখানা আবার চালু করে। শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে নেয়। তাদের বেতন যেন প্রতিমাসের ৭ তারিখে দেয়া হয়। তবে গ্রুপের মালিক দেলোয়ার যেহেতু তাজরীন ফ্যাশনের ১২২ জন শ্রমিক হত্যাকারী, তাই দেশের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী তার সর্বোচ্চ শাস্তি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
মোশরেফা মিশু বলেন, দেশের সবচেয়ে হতদরিদ্র শ্রমিকরা কাজ করে পোশাক কারখানায়। কিন্তু এই দরিদ্র শ্রেণীর শ্রমিকদের বেতন দিতে চায় না মালিকপক্ষ। মালিকরা ঠিকমতো বেতন-ভাতা পরিশোধ করলে দেশে কোন শ্রম অসন্তোষ হবে না। তিনি বলেন, তিন মাসের বেতন দেয়া হচ্ছে এটা প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে মে মাসের ওভারটাইম এবং ঈদ বোনাস দিয়ে দেয়া হোক। এ ছাড়া তোবা ইস্যুতে ১৭ শ্রমিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অনুরোধ করব এসব মামলা প্রত্যাহার করে এ শিল্পের অস্থিরতা দূর করবে সরকার।
সঙ্কট উত্তরণে শ্রমিক সরকার-বিজিএমইএ বৈঠক ॥ তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ ইস্যুতে উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে শ্রমিক-সরকার-বিজিএমইএ’র মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার বিকেল চারটায় জাতীয় সংসদ ভবনে এ বৈঠক শুরু হয়। বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে সংসদ ভবনে এ বৈঠক করা হয়। ওই বৈঠকে বিজিএমইএ, সরকার ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে সমস্যা সমাধানে আলোচনা করা হয়। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম জনকণ্ঠকে বলেন, তোবা সঙ্কট উত্তরণে আমরা বৈঠকে বসেছি। তিনি বলেন, আশা করছি, এই বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে একটা পথ বের হয়ে আসবে। এছাড়া এ বিষয়ে তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির নেত্রী জলি তালুকদার বলেন, আমরা সংসদ ভবনে তোবার শ্রমিকদের সমস্যা নিরসনে বৈঠক করেছি। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান আমাদের বৈঠকে আসার জন্য আহ্বান করেছেন।
জুলাই মাসের বেতনও বিজিএমইএ থেকে দেয়া হচ্ছে ॥ তোবা গ্রুপ সংগ্রাম কমিটির দাবি ছিল তিন মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ। বেতনের সঙ্গে মে মাসের ওভারটাইম এবং ঈদ বোনাসের দাবি করা হয়েছিল। তবে মে ও জুন মাসের বেতন ইতোমধ্যে বিজিএমইএ থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি জুলাই মাসের বেতনও আজ রবিবার বেলা ২টায় বিজিএমইএ ভবন থেকে দেয়া হবে। একই সঙ্গে এক মাসের ওভারটাইমের টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বোনাসের টাকাও যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে দেয়া যায় সে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আজ রবিবার বিজিএমইএ থেকে তোবা গ্রুপের পোশাক শ্রমিকদের জুলাই মাসের বেতন দেয়া হবে। তবে এই বেতন বিজিএমইএ থেকে না দিয়ে বাড্ডার তোবা গ্রুপের পোশাক কারখানা থেকে দিলে ভাল হতো বলে মনে করেন শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশু। তিনি বলেন, বিজিএমইএ থেকে বেতন নেয়া ভাল দেখায় না। প্রত্যেক শ্রমিক তাঁর নিজের কারখানা থেকে বেতন নিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ধর্মঘট পালিত হয়নি দেশের কোথাও ॥ দু’ একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দেশের কোন পোশাক কারখানায় ধর্মঘট পালিন হয়নি। সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া, পলাশবাড়ি, নিশ্চিন্তপুর, ইউনিক এলাকার পোশাক কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কাজকর্ম চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, ফতুল্লার পোশাক কারখানাগুলোতেও ধর্মঘট পালনের কোন খবর পাওয়া যায়নি। জেলা পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশু দেশের সব পোশাক কারখানায় ধর্মঘটের ডাক দেন। তোবার শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ, দেলোয়ার হোসেনের জামিন বাতিল, শ্রমিকদের ওপর ছাঁটাই-নির্যাতন বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে এ কর্মসূচী ডাকা হয়। তবে ওই দিনই নৌপরিবহনমন্ত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক শাজাহান খান বলেন, ধর্মঘটের সঙ্গে সমন্বয় পরিষদ নেই। এই সমন্বয় পরিষদের অধীনে আছে ৫২টি শ্রমিক সংগঠন। তবে দেশের শিল্পকারখানাগুলোয় শ্রমিকরা স্বাভাবিকভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সব জায়গায় স্বাভাবিক কাজকর্ম হলেও সাভারের হ্যালিকন সোয়েটারে শ্রমিকরা বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করছেন। এদিকে শিল্পকারখানাগুলোয় স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম বলেন, দেশের কোন শিল্পকারখানায় ধর্মঘট পালিত হয়নি। সাধারণ শ্রমিকরা ধর্মঘটে সাড়া দেয়নি। তবে শনিবার সকাল থেকেই সাভার ডিইপিজেডের হ্যালিকন সোয়েটারের শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। সাভারের অন্যান্য শিল্পকারখানায় শ্রমিকরা স্বাভাবিক নিয়মে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, গাজীপুর জেলা প্রশাসন ধর্মঘটের নাশকতা এড়াতে চারজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করে। টিমটি গাজীপুর সদর, কালিয়াকৈর ও শ্রীপুরে দায়িত্বরত ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের কাজে আইনগত সহায়তা প্রদানে কাজ করে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিমের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক গাজীপুর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম মোস্তফা জানান, যে কোন প্রকার নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে চারজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে দিনভর কাজ করা হয়। তবে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
আজ বেতন না পেলে নতুন কর্মসূচী ॥ শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর নির্দেশ অনুযায়ী তোবা গ্রুপের শ্রমিকরা সম্পূর্ণ বেতন-বোনাস না পেলে বৃহত্তর কর্মসূচী প্রদান করা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির অন্তর্গত ১৫টি সংগঠনের নেতারা শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে এ হুমকি প্রদান করেছেন। ওই বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতি ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, সরকারের দুইজন মন্ত্রী বলেছেন, তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেন রবিবারের মধ্যে শ্রমিকদের সম্পূর্ণ বেতন-বোনাস প্রদান করবেন। এ সময়ের মধ্যে তোবা গ্রুপের শ্রমিকরা বেতন না পেলে শুধু ধর্মঘট নয়, আরও বৃহত্তর কর্মসূচী প্রদান করা হবে।
প্রসঙ্গত, তিন মাসের ও বেতন-ভাতা ওভারটাইম ও ঈদ বোনাসের দাবিতে ঈদের আগের দিন ২৮ জুলাই থেকে বাড্ডার হোসেন সুপার মার্কেটে অনশন করে আসছিলেন তোবা গ্রুপের শ্রমিকরা। বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আশিংক বেতন প্রদান করলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করে অনশন ও ধর্মঘট অব্যাহত রাখে। পরে ৭ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ করে তাদের হোসেন সুপার মার্কেট থেকে বের করে দেয়। এ সময় তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মোশরেফা মিশু দেশব্যাপী শিল্পকারখানায় লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দেন। তবে পরে জরুরি বৈঠক করে তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির অন্তর্গত ১৫টি সংগঠন শনিবার ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment