Saturday, August 9, 2014

ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হল না শারমিনের

ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হল না শারমিনের

ইত্তেফাক ডেস্ক
ইডেন কলেজের ছাত্রী শারমিন জাহানের ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল! তিনি ৩৪ তম বিসিএস এর লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই গত সোমবার পিনাক-৬ লঞ্চ দুর্ঘটনায় তিনি নিখোঁজ হন। গতকাল শনিবার পর্যন্ত তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার বড় বোন হারিজা আক্তার জানান, ৩টি স্পিডবোট দিয়ে ও বিভিন্ন ভাবে পদ্মায় অনুসন্ধান চালিয়েও প্রিয় বোনকে উদ্ধার করতে পারেননি তারা। সরকারি ভাবেও তার লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। 

শারমিনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে মাওয়ার পদ্মার তীর থেকে মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি বাছিরউদ্দিন জুয়েল জানান, গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠী জেলার শিরপুর গ্রামে ঈদ উদযাপন শেষে ঢাকায় ফেরার পথে মর্মান্তিক ওই লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হন শারমিন। মেধাবী এই ছাত্রী কিছুদিন আগে ইডেন কলেজ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এর আগে তিনি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। শারমিন এসএসসি ও এইচএসসিতে বরিশাল বোর্ডে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। ছোট বেলা থেকে তার ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন ছিল। ৫ বোন ১ ভাইয়ের মধ্যে শারমিন সবার ছোট। সবার আদরের ছোট বোনকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সকলেই এখন পাগল প্রায়। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পদ্মার তীর। স্বজনরা বলেন, আমরা টাকা চাই না, সরকার কত টাকা দিবে? আমরা চাই শারমিনের লাশ। সরকারের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে তারা ২৪ ঘন্টার মধ্যে লাশের সন্ধানের দাবি জানান। 

বোন হারিজা আক্তার জানান, কন্যার শোক সইতে না পেরে তাদের পিতা শিরযুগ আজিমুন নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক শেখ আব্দুল মজিদ গতকাল স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। মা সেলিনা মজিদ 'আমার মেয়ের কবর খুঁড়তে হবে' বলে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। শারমিন তার ভগ্নিপতির সঙ্গে রাজধানীর মুগদাপাড়া পিডিবি অফিসার্স কলোনী ৫০১নং ভবনে বসবাস করতেন। 

এদিকে শারমিনের সঙ্গে থাকা তার ১০ বছরের ভাগ্নে মিরাজও নিখোঁজ রয়েছে। তার লাশ উদ্ধার হয়নি।

ফরিদপুরে একই পরিবারের ৭ জন নিখোঁজ: সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা আব্দুল মজিদ মিয়া জানান, পদ্মায় লঞ্চডুবিতে সদরপুরের ২টি পরিবারের ১০ জন নিখোঁজের ঘটনায় সেসব বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। গত ৬ দিনেও তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে ৭ জন একই পরিবারের। তাদের বাড়ি সদরপুর উপজেলার সদরের সাতরশি গ্রামে। অন্য ৩ জনের বাড়ি একই উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নিজগ্রামে। 

জানা গেছে, সাতরশি গ্রামের মোহাম্মদ আলী মাতুব্বরের পরিবারের শিশু ও নারীসহ ৭ জন লঞ্চ ডুবিতে নিখোঁজ রয়েছে। এরা হলেন, মোহাম্মদ আলী মাতুব্বরের পুত্র সোবাহান মাতুব্বর (৩৫), তার স্ত্রী ইতি আক্তার (২৫), পুত্র ইমন (৭), ছোট বোন সিমু আক্তার ওরফে ফরিদা (৩০), ফরিদার স্বামী রুবেল হোসেন (৪০), কন্যা ফায়েজা আক্তার (৮) ও ফাতেহা আক্তার (২)। গত সোমবার সকাল আনুমানিক ৭টায় তারা বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। কাওড়াকান্দি ঘাটে গিয়ে মুঠোফোনে পরিবারের লোকজনকে জানান, তারা পিনাক-৬ লঞ্চে উঠেছে। এরপর আর তাদের সাথে কোন যোগাযোগ হয়নি, সাথে থাকা ৪টি মোবাইল ফোনের একটিরও কোন সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার বাসায় গিয়ে বাসা তালা মারা অবস্থায় দেখা গেছে বলে পরিবারের লোকজন জানান।

অন্যদিকে উপজেলার নিজগ্রামের আমিনউদ্দিন শেখের পুত্র আজিজুল হক শেখ (২৮), তার স্ত্রী রূপালী বেগম (২৫) ও ৬ মাসের শিশু কন্যা আরজু এখনও নিখোঁজ রয়েছে। আজিজুল ফুতুল্লার একটি টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক। ঘটনার দিন তারা কাওড়াকান্দি ঘাটে গিয়ে পরিবারকে জানায়, তারা পিনাক -৬ লঞ্চে উঠেছে। এর পর থেকে আর তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের ব্যবহত ফোনটিও বন্ধ রয়েছে। 

বরুড়ায় একই পরিবারের ৪ জন নিখোঁজ:কুমিল্লা প্রতিনিধি লুত্ফর রহমান জানান, লঞ্চডুবির ঘটনায় বরুড়া উপজেলার পয়ালগাছা ইউনিয়নের পেড্ডা গ্রামের ফখরুল ইসলাম, তার স্ত্রী ও ২ শিশু সন্তানসহ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের স্বজনরা গত ৬ দিন যাবত্ লাশের অপেক্ষায় পদ্মার তীরে অপেক্ষার প্রহর গুণছেন। ফখরুলের গ্রামের বাড়ি এবং ফরিদপুরে তার শ্বশুর বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। ওই দুর্ঘটনায় ফখরুলের শ্বশুরের পরিবারের আরো ৩ সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। 

জানা যায়, জেলার বরুড়া উপজেলার পেড্ডা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুরুল ইসলামের পুত্র ফখরুল ইসলাম (৩৬), তার স্ত্রী শিমুল আক্তার (২৮), মেয়ে জান্নাতুল মারজান ফাইজা (৭) ও মারহাম ফাতেহাকে (৩) নিয়ে ঈদের ছুটিতে বেড়াতে শ্বশুরবাড়ি ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার সাতরশি গ্রামে যান। গত সোমবার ঢাকায় ফেরার জন্য তারা পিনাক-৬ লঞ্চে উঠেন। সেখান থেকে ফখরুল তার বাবা-মায়ের সাথে শেষবারের মতো মোবাইল ফোনে কথা বলেন। লঞ্চ দুর্ঘটনার পর থেকে তারা নিখোঁজ রয়েছেন। ওই দুর্ঘটনায় ফখরুলের শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী ও ১ সন্তানও নিখোঁজ রয়েছেন। 

গতকাল শনিবার দুপুরে ফখরুলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুত্র-পুত্রবধূ ও নাতনিদের হারিয়ে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে আছেন ফখরুলের পিতা নুরুল ইসলাম মাস্টার ও পরিবারের সদস্যরা। তাদের সান্ত্বনা দেয়ার ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছে ওই বাড়িতে ভিড় করা পাড়া-প্রতিবেশীরা। ফখরুলের পিতা নুরুল ইসলাম মাস্টার জানান, তার ছেলে ঢাকার মিরপুর এলাকার 'এইচ.ডি ডিজাইন' নামের একটি বায়িং হাউজে এবং তার স্ত্রী ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, এখন আমাদের একটাই চাওয়া পুত্র-পুত্রবধূ ও নাতনিদের লাশ। তিনি পরিবারের ৪ সদস্যের লাশ ফেরত পেতে সরকারের সহায়তা কামনা করেছেন।

মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, কালকিনি উপজেলার ডাসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী সবুজের পরিবারের ৪ সদস্য এখনও নিখোঁজ রয়েছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। এদের মধ্যে রয়েছেন চেয়ারম্যানের মা হিরোনন্নেছা (৬৫), স্ত্রী তিশা আক্তার ময়না (২৫), ছেলে তৌহিদ (১) ও শ্যালক আলামিন।

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, লঞ্চডুবির ঘটনায় নিখোঁজ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার কৃষ্ণাদিয়া গ্রামের মিন্টু মোল্লার ব্যাগ উদ্ধার হলেও তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। মাওয়া থেকে স্বজনরা ব্যাগটি উদ্ধার করে গতকাল গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসে।

নিখোঁজ মিন্টু মোল্লা কৃষ্ণাদিয়া গ্রামের সালাম মিয়ার একমাত্র ছেলে। মিন্টুর ব্যবসার আয়েই সালাম মিয়ার সংসার চলত। মিন্টু সিলেটের মধু বাজারে ছিট কাপড়ের ব্যবসা করতেন। তার মা নূরজাহান বেগম বলেন, আমার বাঁচার অবলম্বন হারিয়ে ফেলেছি। আমার মিন্টুকে আমি ফেরত চাই। ও আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে না। আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই। বাবা আবদুস ছালাম মোল্লা বলেন, তার টাকায় আমাদের সংসার চলতো। এখন তো আমার কেউ রইলো না। কি করে আমাদের সংসার চলবে আল্লাহই জানেন।

No comments:

Post a Comment