কোথায় গ্লাসগো আর কোথায় আগরতলা! কোথায় স্কটল্যান্ড আর কোথায় বিশাল ভারতের ছোট্ট এক কোণের পার্বতী ত্রিপুরা৷ কিন্তু ঘর তো ঘরই৷ এই মাটি, এই জল-হাওয়া, এই মানুষ তাঁর কত চেনা৷ কত আপন৷ আকাশ থেকে নেমে সেই মাটি-মায়ের বুকেই যেন ঝাঁপিয়ে পড়লেন গুড্ডু৷ আর ত্রিপুরা মা-ও যেন তাঁকে বুকে জড়িয়ে স্নেহচুম্বনে, সোহাগে ভরিয়ে দিল সোমবার৷ এ এক ঐতিহাসিক আলিঙ্গন৷ স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে-উচ্ছ্বাসে টইটম্বুর গণ-অভ্যর্থনা৷ বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং বৈদ্যুতিন চ্যানেলের মাধ্যমে রাজ্যের ক্রীড়াপ্রেমীরা জেনে গিয়েছিলেন, এদিন সকালে শহরে ফিরে আসছেন ‘হীরের টুকরো’ মেয়ে গুড্ডু বা দীপা কর্মকার৷ স্বভাবতই সকাল থেকে আগরতলা বিমানবন্দর ছিল ভিড়ে ঠাসা৷ ইন্ডিগোর ৬-ই-২৭৩ নম্বর ফ্লাইটের চাকা আগরতলা বিমানবন্দরের রানওয়ে ছুঁতেই উচ্ছ্বাস বাড়তে থাকে ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে৷ বিমানবন্দরের লাউ? থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ক্রীড়াপ্রেমী জনতার ঢেউ যেন ভাসিয়ে দিতে চাইল একরত্তি মেয়ে দীপাকে৷ প্রায় দেড়শত বাইক সুদৃশ্য র্যালি করে ইতিহাস গড়া দীপাকে নিয়ে সারা শহর পরিক্রমা করে৷ উমাকাম্ত মিনি স্টেডিয়ামের অস্হায়ী মঞ্চে এই জিমন্যাস্টকে যখন অভ্যর্থনা জানানো হয়, তখন দীপার চোখে-মুখে ছিল আত্মবিশ্বাসের উজ্জ্বল প্রতিভাস৷ দৃঢ়প্রত্যয়ী দীপা মঞ্চেই ঘোষণা করেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত এশিয়ান গেমসে পদকের রঙ পাল্টানোই এখন তাঁর লক্ষ্য৷ ব্রো? নয়, সোনা বা রুপো জয় করেই ফিরতে চাইছেন সাই ভারোত্তোলন কোচ দুলাল এবং গৃহিণী গৌরী কর্মকারের ছোট মেয়ে (গুড্ডু)৷ মানুষের উষ্ণ আবেগ আর ভালবাসায় আপ্লুত দীপা বুঝিয়ে দিলেন কতটা আত্মবিশ্বাসী তিনি৷ অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের পর উদয়পুরের মাতাবাড়ি ঘুরে দীপা যখন ঘরে ফিরলেন, তখন অনেকটাই ক্লাম্ত৷ সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের সঙ্গে দেখা করে আশীর্বাদ নেন৷ দীপার সারাটা দিন ঘড়ির কাঁটা ধরে যত এগিয়েছে, ততই মালায় মালায়, ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে তাঁর গলা, দুই হাত আর হুডখোলা জিপটা৷
সকাল ৯টা: আগরতলা বিমানবন্দরে উৎসুক ক্রীড়াপ্রেমীদের ভিড়৷ স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে কমনওয়েলথ গেমসে দেশের হয়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারী রাজ্যের গর্ব দীপা কর্মকারকে একনজর দেখার জন্য৷ ধীরে ধীরে বিমানবন্দরে রাজ্যের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্হার কর্মকর্তারা দীপাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য ভিড় জমাতে থাকেন৷ বিমানবন্দরের বাইরে প্রায় দেড়শত বাইক সুসজ্জিতভাবে ছিল দীপাকে নিয়ে বর্ণাঢ্য র্যালি করার জন্য৷
সকাল ৯টা ৫০: ইন্ডিগোর বিমান নম্বর ৬-ই-২৭৩৷ স্পর্শ করল রানওয়ে৷ বিমান থেকে নেমে নিজের জন্মভূমিতে পা রাখতেই লাউঞ্জের বাইরে আছড়ে পড়ে জনতার ভিড়৷ লাউঞ্জের ভেতরে বাবাকে দেখেই দৌড়ে ছুটে আসেন দীপা৷ ‘হীরের টুকরো’ মেয়েকে বুকে জড়িয়ে খুশিতে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি দুলালবাবু৷ বুক থেকে ছাড়া পেয়ে মেয়েই মুছে দেন বাবার চোখের জল৷ সঙ্গে সঙ্গেই বাবার হাতে তুলে দেন বহু আকাব্ভিত কমনওয়েলথ গেমস থেকে জয় করা ব্রো? পদক৷
সকাল ১০টা ১: বিমানবন্দরের লাউ? থেকে বাবা দুলাল কর্মকার এবং কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দীর হাত ধরে দীপা যখন বেরিয়ে আসছিলেন, তখন উৎসুক ক্রীড়াপ্রেমীদের ভিড়ে যেন ভেসে গেলেন৷ পরিস্হিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসতে হয় নিরাপত্তারক্ষীদের৷ অনেকটা জোরপূর্বক জনতার ভিড় ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দীপাকে৷ আবেগ এবং উচ্ছ্বাসে মানুষের হৃদয় বাঁধভাঙা৷ নিরাপত্তা-বেষ্টনীকে টপকেই যেন ছুঁতে চাইছে ‘হীরের টুকরো’ মেয়ে দীপাকে৷ যেন পাহাড়ি রাজ্যে আচমকাই উঠে-আসা সমুদ্রের উচ্ছ্বাস৷ ভিড়ের মাঝেই ইতিহাস গড়া দীপাকে বরণ করে নেন ক্রীড়া পর্ষদের সচিব কমল সাহা, দপ্তরের অধিকর্তা দুলাল দাস-সহ রাজ্যের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্হার শীর্ষস্হানীয় কর্তারা৷
সকাল ১০টা ২৫: প্রায় দেড়শত মোটরবাইকের র্যালি৷ গলায় ব্রো? পদক ঝুলিয়ে ত্রিপুরা পুলিসের হুডখোলা জিপসি গাড়িতে কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা জনতার অভিবাদন গ্রহণ করলেন৷ কখনও হাত নাড়িয়ে, কখনও-বা হাত স্পর্শ করে, আবার কখনও দু’হাত জোড় করে৷ স্বপ্নের ঘোর কাটতে মাঝে মাঝে জয় করা ব্রো? পদক কামড়াচ্ছেন৷ এয়ারপোর্ট থেকে নতুননগর, দুর্জয়নগর, লিচুবাগান, ক্যাপিটাল কমপ্লে‘, রাধানগর, উত্তর গেট, মহিলা মহাবিদ্যালয়, কামান চৌমুহনি, পোস্ট অফিস চৌমুহনি, বটতলা এবং ফায়ার ব্রিগেড হয়ে র্যালি এসে থামে উমাকাম্ত মিনি স্টেডিয়ামে৷ রাস্তায় কয়েক হাজার জনতার মাঝে বিভিন্ন স্কুল এবং নিজের মহাবিদ্যালয়ের সহপাঠীরা করতালি এবং পুষ্পস্তবক দিয়ে বরণ করে নেন তাঁদের চোখের মণি দীপাকে৷
সকাল ১১টা ২৫: উমাকাম্ত মিনি স্টেডিয়ামে দীপার কনভয় পৌঁছতেই বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা শুরু করে দেয় দৌড়ঝাঁপ৷ ‘দীপা দিদি’-কে একটু দেখার জন্য৷ উমাকাম্ত মিনি স্টেডিয়ামের হ্যান্ডবল কোর্টে গাড়ি থামতেই করতালি দিয়ে ছোট ছোট স্কুলপড়ুয়ারা অভিনন্দন জানায় তাদের প্রিয় দিদিকে৷ গাড়ি থেকে নেমে অভ্যর্থনা মঞ্চে উঠেই জয় করা ব্রো? পদক দীপা তুলে দেন ক্রীড়ামন্ত্রী সহিদ চৌধুরির হাতে৷ ক্রীড়ামন্ত্রী-সহ রাজ্য জিমন্যাস্টি‘ সংস্হার সভাপতি সমীর চক্রবর্তী পুষ্পস্তবক এবং স্মারক দিয়ে বরণ করে নেন দীপা এবং তাঁর কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দীকে৷ অনুষ্ঠানে এশিয়ান গেমসে যাতে সাফল্য আসে তার পরামর্শ দেন ক্রীড়ামন্ত্রী৷ দীপা এবং তাঁর কোচ স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন, ‘পদকের রঙ পাল্টাতে আপ্রাণ চেষ্টা করব৷’
দুপুর ১২টা: উমাকাম্ত মিনি স্টেডিয়াম থেকে জিপসি গাড়ি চড়েই সোজা চলে যান তাঁর পুরনো স্কুল অভয়নগর নজরুল স্মৃতি বিদ্যাভবনে৷ স্কুলের পক্ষ থেকে এক আড়ম্বর অনুষ্ঠানে বরণ করে নেওয়া হয় দীপাকে৷ পুষ্পস্তবকের পাশাপাশি দেওয়া হয় স্মারক৷ উপস্হিত ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা-সহ অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ছাত্রছাত্রীরা৷
দুপুর ১২টা ৪৭: কামনা ছিল আগেই৷ কমনওয়েলথ আসরে সাফল্য পেলে বাড়িতে ঢোকার আগেই কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী এবং তাঁর প্রিয় ছাত্রী দীপা পুজো দেবেন উদয়পুর ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে৷ সেই অনুযায়ী স্কুল থেকেই চলে যান প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে উদয়পুর মাতাবাড়িতে৷ সেখানে পৌঁছে মন্দির দর্শন করেই বাড়ি ফেরার পথে উদয়পুরের রমেশ চৌমুহনিতে মামা বলুন চৌধুরির বাড়িতে ঢোকেন দীপা-সহ তাঁর কোচ এবং বাবা৷ কোচ এবং বাবা না খেলেও মামা-মামির আবদারে দীপার মধ্যাহ্নভোজন হয় সেখানে৷
বিকেল ৪টে ২০: বহু প্রতীক্ষার অবসান৷ ঘরে ফেরেন আদরের দীপা৷ ‘হীরের টুকরো’ মেয়েকে একঝলক দেখতে বাড়ির সামনে ভিড় জমান এলাকাবাসীরা৷ কেউ দেন পুষ্পস্তবক, কেউবা মিষ্টিমুখ করান দীপাকে৷ তখনও ঘরে ভিড় জমিয়ে ছিলেন বিভিন্ন বৈদ্যুতিন চ্যানেলের সাংবাদিকরা৷ ক্লাম্ত দীপা অনেকটা হাসিমুখেই সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের জবাব দেন৷ সন্ধ্যার পর মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের সঙ্গে মহাকরণে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়েছেন দীপা ও তাঁর কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী৷
|
No comments:
Post a Comment