
|
আজকালের প্রতিবেদন: শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগেনি আকাদেমি-মঞ্চে৷ বৃহস্পতিবার সন্ধেয় নাট্যদলেরই আলোকসম্পাতের কাজে ব্যবহূত হাজার ওয়াটের বালব দীর্ঘক্ষণ সাইড-স্ক্রিনে লেগে থাকায় সিম্হেটিক ওই পর্দায় আগুন লেগে যায়৷ শুক্রবার দুপুরে আকাদেমিতে তদম্তে-আসা ফরেনসিক দলের এমনটাই প্রাথমিক অনুমান৷ কিন্তু জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন নাট্যকর্মী ও দর্শকেরা৷ তাঁদের বক্তব্য, অব্যবস্হার জন্যেই আগুন লেগেছে৷ এমন একটা প্রেক্ষাগৃহে আলোকসম্পাতের ক্ষেত্রে কেন সরাসরি জ্বলম্ত বালব লেগে থাকবে পর্দার গায়ে? বিভিন্ন নাট্যদলের কর্মী ও দর্শকেরা প্রশ্ন তোলেন, এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাগৃহের নিরাপত্তা-ব্যবস্হা এমন পলকা কেন? প্রশ্ন উঠেছে, কেন নাট্যকর্মী থেকে শুরু করে দর্শকেরা এতদিন জানতেনই না যে, প্রেক্ষাগৃহের একতলার পেছনের দিকেও দুটি দরজা আছে? বৃহস্পতিবার যদি নাট্যদলের কর্মী ও আকাদেমির কর্মীদের তৎপরতায় আগুন না নেভানো যেত, তা হলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারত এদিন৷ পেছনের দিকের তালাবন্ধ দরজা বৃহস্পতিবার খোলাও যায়নি৷ একটা দরজা দিয়েই অন্ধকারে দর্শকেরা হুড়োহুড়ি করে বেরিয়েছেন৷ আকাদেমির পরিচালন-ব্যবস্হা নিয়ে এদিন নানা প্রশ্ন উঠেছে৷ প্রেক্ষাগৃহের অব্যবস্হার জন্যে পরিচালন ব্যবস্হার ত্রুটির দিকেই আঙুল উঠেছে৷ রাজ্য ফরেনসিক ল্যাবরেটরির তরফে এদিন একদল বিশেষ: আসেন মঞ্চে নমুনা সংগ্রহ করতে৷ তদম্ত সেরে বেরোনোর সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রতিনিধিদলের তরফে ড. চিত্রাক্ষ সরকার জানান, সব কিছু ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখার পর চূড়াম্ত সিদ্ধাম্ত জানানো যাবে৷ তবে মঞ্চ ঘুরে দেখার পর তাঁদের মনে হচ্ছে, পরিস্হিতি দুর্ঘটনার দিকেই ইঙ্গিত করছে৷
|
|
শাপাশি তিনি এটাও জানান, আকাদেমির লাইট-অয়্যারিং ব্যবস্হা ঠিকঠাকই আছে৷ যে অগ্নিপ্রতিরোধক ব্যবস্হা আছে এই হলে, তা-ও সম্তোষজনক৷ তবে দর্শকদের ঢোকা-বেরোনোর ব্যবস্হা দেখা তাঁদের এক্তিয়ারভুক্ত নয় বলে, তা নিয়ে তিনি মম্তব্য করেননি৷ যে পার আলোটি থেকে আগুন লাগে, সেটিও ফরেনসিক দল এদিন নিয়ে যায় নমুনা হিসেবে৷ এদিকে, ফরেনসিক দল আসার আগে থেকেই মঞ্চ-মেরামতির কাজ শুরু করে দেন আকাদেমির কর্মচারীরা৷ মঞ্চের যেসব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা ভোর থেকেই সারাইয়ের কাজ শুরু হয়৷ যাতে শুক্রবার বন্ধ থাকলেও শনিবার দুপুর থেকেই শুরু হয়ে যেতে পারে পূর্বনির্ধারিত নাটকের শো৷ কর্মচারীদের একটি ইউনিয়নের তরফে তুলসীদাস দে বলেন, এই আকাদেমি মঞ্চের ওপর যেমন বিভিন্ন নাট্যদল নির্ভরশীল, তেমনই নির্ভরশীল আকাদেমির বহু কর্মী৷ হল বন্ধ থাকলে সবারই ক্ষতি৷ সেকথা ভেবেই আমরা, কর্মচারীরাই উদ্যোগ নিয়ে সকাল থেকে মঞ্চ স্বাভাবিক করার কাজে নেমে পড়েছি৷ তবে ফরেনসিক দল আসার আগেই তাঁদের এই মঞ্চ সাফাই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ৷ প্রসঙ্গত, আজ শনিবার দুপুর ৩টেয় আকাদেমি-মঞ্চে মঞ্চস্হ হওয়ার কথা বিভাস চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন দল ‘অন্য থিয়েটার’-এর ‘নিজের খোঁজে’৷ সন্ধেবেলায় ‘দমদম শব্দমুগ্ধ’র নাটক ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ’৷ শুক্রবার দুপুর থেকেই চালু ছিল ওই দুই নাটকের টিকিট বিক্রির কাজও৷ ফরেনসিক দল হলের পরিকাঠামো নিয়ে সম্তোষজনক মম্তব্য করে যাওয়ার পরে কর্মীরা নিশ্চিতভাবেই জানিয়ে দেন, শনিবার শো হচ্ছেই৷ হলের গেটে দাঁড়ানো যে মানুষটির সঙ্গে রোজই দর্শকদের দেখা হয়, সেই সজল পাল আবেগের সঙ্গে বলেন, আকাদেমির সুনামে আমরা আঁচ লাগতে দেব না৷ এদিন সন্ধেবেলা বিভাস চক্রবর্তীও জানান, আমরা শো করতে প্রস্তুত৷ বিভাসবাবু অবশ্য পাশাপাশি বলেন, ঘটনা যখন একটা ঘটেছে, তখন নিরাপত্তার ব্যাপারটা নিয়ে এবার কিন্তু আকাদেমি কর্তৃপক্ষকে ভাবতেই হবে৷
বৃহস্পতিবার সন্ধেয় আকাদেমিতে শো ছিল কৌশিক সেনের ‘স্বপ্নসন্ধানী’ দলেরও৷ শুক্রবার কৌশিক বলেন, কী থেকে আগুন লেগেছে, এটার থেকেও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তার পরে কী? অর্থাৎ এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কী কী করা হচ্ছে৷ কৌশিক মনে করছেন, শনিবারই তড়িঘড়ি করে নাটক চালু না করে বরং আরও কয়েকটা দিন ভালভাবে সব দিকের নিরাপত্তা ব্যবস্হাকে আঁটোসাঁটো করে নিলে ভাল হত৷ আকাদেমির কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে এদিন বেশ খানিকটা ক্ষোভ দেখা গেল গতকাল কারও কারও করা একটি মম্তব্য নিয়ে৷ তাঁরা বলেন, আকাদেমির দর্শকাসনের পেছন দিকে দুটি এমার্জেন্সি এগজিট গেট আছে৷ অথচ বলা হচ্ছে বেরোনোর দরজা নাকি একটা! কৌশিক বলেন, এগুলো থাকলেও দর্শকদের তো তা কোনও দিন জানানো হয়নি৷ যাঁর নাটকের মধ্যে আগুন লেগেছিল, সেই সুমন মুখোপাধ্যায় এদিন বলেন, আমি এটা কখনই ইঙ্গিত করিনি যে, এ-ঘটনার মধ্যে কোনও বা কারও অভিসন্ধিমূলক ভূমিকা আছে৷ বরং আমি বারবারই বলেছি, এটা বোধহয় দুর্ঘটনাই৷ সুমন এটাও বলেন, এটা ভালই যে, দ্রুত মঞ্চ স্বাভাবিক অবস্হায় ফিরছে৷ প্রসঙ্গত, সুমন ও কৌশিক এর পর যে ২ সেপ্টেম্বর একসঙ্গে আকাদেমিতে নাটক করার কথা ভেবেছেন, তা-ও তিনি জানান৷ নাট্যকার চন্দন সেনও বলেন, এ ঘটনা হয়ত দুর্ঘটনাই, তবে আকাদেমি-মঞ্চকেও এর পর এ-সব ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে৷ শুক্রবার বিকেলে আকাদেমি মঞ্চে আসেন নাট্যব্যক্তিত্ব তথা সাংসদ অর্পিতা ঘোষ৷ তাঁর দল ‘পঞ্চম বৈদিক’-এর উৎসব শুরু হওয়ার কথা ২২ আগস্ট থেকে৷ উদ্বিগ্ন অর্পিতাও মঞ্চের মেরামতির কাজের খোঁজখবর নেন৷ তবে এদিন উদ্ভূত পরিস্হিতির দায় আকাদেমির সদ্য-পদত্যাগী ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের ঘাড়েই চাপাতে চেয়েছেন কার্যকরী সমিতির সম্পাদক বুলবুল রায় ও সভাপতি জহর দাশগুপ্ত৷ বুলবুলদেবী বলেন, আকাদেমি-মঞ্চের সংবিধান অনুযায়ী কার্যকরী সমিতি যে কোনও ব্যাপারে সর্বাধিক ২৫০০ টাকা পর্যম্ত ব্যয় করতে পারে৷ তার বেশি ব্যয় করতে হলে ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়৷ তাঁরা আকাদেমির ব্যাপারস্যাপার সম্পর্কে বহুদিনই উদাসীন৷ ১২ জুলাই তাঁরা আবার একযোগে পদত্যাগ করেছেন৷ ফলে ইচ্ছে থাকলেও আমাদের পক্ষে মঞ্চের এর থেকে বেশি উন্নয়ন করা সম্ভব নয়৷ তবু এরই মধ্যে আমরা যে দর্শকদের নিরাপত্তার জায়গায় কোনও আপস করিনি, তার সাক্ষ্য তো আজ ফরেনসিক অফিসারদের কথাতেই পাওয়া গেল৷ জহর দাশগুপ্ত বলেন, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা সবাই ব্যস্ত শিল্পপতি৷ তাঁদের পক্ষে আকাদেমির শিল্পচর্চার দৈনন্দিন কাজে মাথা ঘামানোই সম্ভব নয়৷ এই সমস্যা কাটাতে নাটক ও শিল্পমহলের সবাইকেই উদ্যোগী হতে হবে বলে অভিমত তাঁর৷ তবে মঞ্চ পরিষ্কার করা নিয়ে কার্যকরী সমিতি ও কর্মচারীদের দ্বিমতও সামনে এসেছে৷ বুলবুলদেবী বলেন, ফরেনসিক টিম আসার আগে মঞ্চ পরিষ্কার করার কাজ শুরু না করলেই ভাল হত৷ এর ব্যয়ভার নিয়েও আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি কর্মচারীরা৷ এই মঞ্চ কি রাজ্য সরকার অধিগ্রহণ করার কথা ভাবছে? এ-প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে মঞ্চে-আসা অর্পিতা ঘোষ বলেন, এই মঞ্চ একটি ট্রাস্টি বোর্ডের আওতাধীন৷ ফলে রাজ্য সরকারের সেই এক্তিয়ার কোথায়? ‘হেরিটেজ প্লেস’ বলে তা কেন্দ্রীয় সরকার করলেও করতে পারে৷ তবে তা ট্রাস্টি বোর্ড আবেদন করলে তবেই৷ আকাদেমির পরিচালন সমিতিও এমন কোনও অনুরোধ রাজ্য সরকারকে করছে না, জানান বুলবুলদেবী৷
|
|
|
 |
|
|
No comments:
Post a Comment