Thursday, July 3, 2014

আল মাহমুদের কবিতা সাগর জামান

আল মাহমুদের কবিতা
সাগর জামান
আল মাহমুদ পঞ্চাশ দশকের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি তাঁর কবিতায় ঐতিহ্যের নিদর্শন রেখেছেন নানাভাবে। উপমা উৎপ্রেক্ষা, চিত্র কল্প স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্ব কবিতায় স্থাপন করে শ্রেষ্ঠত্বের স্থানে পৌঁছে গেছেন। তিনি বক্তব্যের সংকীর্ণতা পেছনে ফেলে উপমা প্রযুক্ত করে বক্তব্যকে উচ্চাকিত করেন উপমার নান্দনিক সৌন্দর্য তাঁর কবিতাকে মানুষের হৃদয়ে বিভিন্ন বক্তব্যের রূপায়ন ঘটায়। আল মাহমুদের কবিতার পরিমণ্ডলে উপমার বিপুল ব্যবহার বক্তব্যকে স্পষ্ট করতে সহায়ক হয়ে ওঠে। আগামীর একটি বিশুদ্ধ সময় মানুষের জন্য অপেক্ষায় আছে এ ধরনের নির্মল বিশ্বাসের প্রতিভাস তার বিশুদ্ধতা ফুলের পাপড়ির মতো পেলবতা মখমল সৌন্দর্যে জাগরুক। তাঁর প্রাণবন্ত কবিতা মানুষের মনোজগতে নানাভাবে জায়গা করে নেয়। জাগতিক জীবনের বিভিন্ন অনুভূতি আল মাহমুদের কবিতায় অনুরিত হয়।
রাজনৈতিক ঘটনাবলী প্রেম স্মৃতি নিসর্গ প্রভৃতি তাঁর কবিতায় অন্তর্ভুক্ত হতে দেখা যায়।
তিনি উপমাকে প্রাধান্য দিতে মনোযোগী হন। উপমাকে অবলম্বন করে তিনি কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করেন। তাঁর কবিতা উপমা প্রধান। কিন্তু কোন উপকরণ তাঁর কাছে উপেক্ষিত নয়। আল মাহমুদ উপমার পাশাপাশি অন্যান্য উপাদান দিয়ে নানা বিষয়কে কবিতায় উপজীব্য করেন। তাঁর কবিতার স্থাপনায় সব রঙের স্পর্শ করান তিনি সযত্নে। তাঁর লৈখিক নৈপুণ্যে কবিতা ভিন্ন আস্বাদে উপস্থাপিত হয়। তাঁর সংক্ষুব্ধ উচ্চারণ কবিতাকে চৌচির করে না। বরং তাঁর সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ অখণ্ড বিক্ষোভে বাতাসকে খণ্ডিত করে। আল মাহমুদ কবিতায় বহুমুখী অনুষঙ্গের বিস্তার ঘটান বিষয়ের বিস্তর গেরস্তালি তাঁর কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। তিনি কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করেন নানা বিষয়ের আবর্তে। উপমাকে অবলম্বন করে তিনি উচ্চারণ করেন।

কবিতা তো কৈশরের স্মৃতি
সেতো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ।
নীম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাত জাগা
ছোট ভাই বোন।
আব্বার ফিরে আসা
সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি
রাবেয়া রাবেয়া...
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া
দক্ষিণের ভেজান কপাট।

আল মাহমুদের কবিতায় খণ্ড খণ্ড ছবি দুলে ওঠে। নাগরিক জীবনের দুর্বার কোলাহলের বাইরের একটা শীতল স্নিগ্ধ শান্ত চঞ্চল অনুভূতির জীবন সন্ধান তাঁর কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর চেতনা ও মননে সমাজের যে সব ঘটনা প্রবাহ তোলপাড় তোলে সে সব বিষয় তিনি কবিতায় তুলে ধরেন। তাঁর কবিতায় শব্দবদ্ধ হয় সমাজ প্রগতির ভাবনা ও জীবন ঘনিষ্ট। আল মাহমুদের কবিতা উপমার মাধ্যমে ঘটনা প্রবাহ ও দৃশ্যমানতা তৈরি করে। কুয়াশায় ঢাকা পথ ভোরের আযান, বাঁশ ঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর কিংবা মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়শা আক্তারের মতো প্রসঙ্গের সংযোজন তাঁর কবিতাকে বহু অর্থময় এবং বহু চিত্রে চিত্রিত করেন। এই বিরলপ্রজ কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর উল্লেখ যোগ্য গ্রন্থসমূহ কালের কলস, সোঁনালি কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে আল মাহমুদের কবিতা। এসব গ্রন্থই পাঠক মহলে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। আল মাহমুদের সমগ্র লেখালেখিতে সাহিত্য ভাবনার নানামাত্রা অঙ্কিত তাঁর কবিতায় পরিণত মনের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ধ্বংসের তুমুল উৎসবের মধ্যে তিনি সৃষ্টির উল্লাস করেন বৈরী বাতাসে ল-ভ- হওয়া সাজানো ভুবন আল মাহমুদ কবিতার মতো বিনির্মাণ করতে ব্রতী হন। তিনি গোটা সমাজকে সুসজ্জিত ও সুনির্মিত করতে তাঁর প্রাজ্ঞা ভাবনা কবিতায় তুলে ধরেন। প্রত্যাশিত সীমানা তিনি প্রতিদিন স্পর্শ করেন। মানুষ জীবন সংগ্রামের বিচিত্র প্রবাহে নিজস্বতা থেকে ক্রমশ সরে যায়। শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এগিয়ে যায় সামনে ভিন্ন পথে অজানা গন্তব্যে। নিরাসক্ত এ যাত্রা জীবন থেকে ফেরা হয় না সহজে। প্রত্যাবর্তন যদি কখনও ব্যর্থতার হয় তাও হতে পারে আনন্দের সুখের।
এখানে আল মাহমুদের প্রত্যাবর্তনের লজ্জা শীর্ষক কবিতার উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। শেষ ট্রেন ধরব বলে এক রকম ছুটতে ছুটতে স্টেশনে পৌঁছে দেখি নীল বর্ণ আলোর সঙ্কেত। হতাশার মতোন হঠাৎ দারুণ হুইসেল দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। যাদের সঙ্গে শহরে যাওয়ার কথা ছিল তাদের উৎকণ্ঠিত মুখ জানালায় উবুড় হয়ে আমাকে দেখছে। হাত নেড়ে সান্ত¡না দিচ্ছে। আসার সময় আব্বা তাড়া দিয়েছিলেন গোছাতে গোছাতেই তোর সময় বয়ে যাবে। তুই আবার গাড়ি পাবি। আম্মা বলছিলেন আজ রাত না হয় বই নিয়েই বসে থাক কত রাততো এমন থাকিস। এক নিঃস্বপ্ন নিদ্রায় নিহত হয়ে থাকলাম। অবশেষে গাড়ি হারিয়ে ফিরে আসা। মায়ের মোহন মুখ থেকে বেরিয়ে আসে সেই চিরাচরিত বাণী ভালই হলো তোর ফিরে আসা। তুই না থাকলে ঘর বাড়ি একেবারে শূন্য হয়ে যায়। এভাবে গাড়ি হারানোর ব্যর্থতাকে ফিরে আসার আনন্দে প্রিয় মুখদের সান্নিধ্য সুখে আল মাহমুদ রূপান্তরিত করেন। তাঁর কবিতায় আনন্দ বিষাদের মিলিত ছবি দুলে ওঠে। অবলোকন শক্তির কাছে আল মাহমুদের কবি সত্তা সমর্পিত হয়। সত্যের সন্ধানে তিনি উদায়াস্ত পরিভ্রমণ করেন পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তর। তাঁর যাত্রা পথ সত্যের সতত আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তিনি স্বপ্নের সানুদেশে কবিতার অসংখ্য বীজ রোপণ করেন। সেই বীজ থেকে বৃক্ষ পুষ্প পত্রালীতে পরিপূর্ণ, পরিণত হয়। তাঁর কবিতায় নিসর্গের নিবিড় সম্পর্ক পরিস্ফুটিত হয়। তাঁর কবিতার বিষয় এবং উপকরণের মিশ্র রূপ আমাদের সমস্ত হৃদয়স্ত গ্রাস করে। নিসর্গ আর উপমা তাঁর কবিতায় একসঙ্গে উঠে আসে। তিনি উপমার উপস্থাপন কৌশলে নিসর্গকে নির্ধারণ করেন। তিনি নিসর্গকে নিপুণভাবে কবিতায় প্রযুক্ত করেন। তিনি নিসর্গ চেতনায় আপ্লুত হন। তাঁর কবিতার কলস্বরে নিসর্গ মুখরিত হয়ে ওঠে। তিনি লেখেন :
একদা এক অস্পষ্ঠ কুয়াশার মধ্যে আমাদের যাত্রা
তারপর দিগন্তে আলোর ঝলকানিতে আমাদের পথ
উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বাতাসে ধানের গন্ধ
পাখির কাকলিতে মুখরিত অরণ্যানী।
আমাদের সবার হৃদয় নিসর্গের এক
অপরূপ ছবি হয়ে ভাসতে লাগল।
আমাদের আভূমি ঘিরে শত্রুদের উল্লাসিত উৎসব মাখন আহত করে রাখে। তখনও পালাবার প্রাণান্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় অন্তরভেদী সব ঘটনাবলি আল মাহমুদ অবলোকন করে শব্দ সমুদ্রে অবগাহন করেন। তিনি কবিতা দিয়ে অশুভ দৃশ্যের আঘাত বোধ করেন।
পলাতক বলে লোকে। বুকে বড়ো বাজে।
আমিতো এখন জীবনের জলাধারে হতে চাই
তুমুল রোহিত।
কোথায় পালাবো আমি যেখানে রাতেও
নারীর নিঃশ্বাস এসে চোখে মুখে লাগে
বুকে লেগে থাকে ক্লান্ত শিশুর শরীর।
বলো পালাবো কোথায়।
জীবনের পক্ষে তাই সারাদিন দরোজা ধরে থাকি। বেদনার বিপুল আঘাত মেনে নিয়ে চির সহিষ্ণুতার মতো স্বসীমানায় অনড় দাঁড়িয়ে সযত্নে কবিতার মধ্যে নানা দায়বদ্ধতা অক্ষমতা সাফল্য স্বপ্নের বৃত্তান্ত আল মাহমুদ তুলে ধরেন। যাপিত জীবনের বহু অর্জন এবং অপ্রাপ্তির হতাশা তাঁর কবিতায় মর্মরিত হয়। আল মাহমুদের কবিতা জাগতিক জীবনের রকমারি ঘটনা বিষয় বৈচিত্র্য উপমার প্রয়োগ নিসর্গের নিবেদন এবং শব্দ যোজনার একান্ত ঐক্যে ঐতিহ্যপূর্ণ। আল মাহমুদের স্বনির্মিত বৈভব নিজস্ব নান্দনিকতায় উজ্জ্বল। তাঁর কবিতার কাছে পরাজিত হয়ে আধার আত্মত্যাগী হয়। তাঁর কবিতা স্তব্ধতাকে চলমান করে। নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে দেয় সরব কোলাহলে। স্থির অনুভূতিকে তরঙ্গিত করে। আল মাহমুদের কবিতায় একই সঙ্গে বহু বক্তব্যকে ধারণ করেছেন। মানুষকে মহৎ করে তার মানবিক বোধ। হৃদয় হয়ে ওঠে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচালক। কবিরা কখনও পরাজিত হয় না। এই উপলব্ধিতে তিনি সগৌরবে উচ্চারণ করেন :
সোনার দিনার নেই দেন মোহর চেয়ো না হরিণী
যদিও নাও দিতে পারি আমার কাবিন বিহীন হাত দুটি
আত্ম বিক্রয়ের স্বর্গ কোনো কালে সঞ্চয় করিনি।
আহত বিক্ষভ করে চারিদিকে চতুর ভ্রুকুটি
ভালৃবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্বন।
ছলনা জানিনা বলে আর কোনো ব্যবসা শিখিনি

আল মাহমুদের বহুমাত্রিক কবিতার বাণী কল্লোলিত করে এ দেশের কাব্য জগতে। তিনি কবিতার আস্বাদ ছড়িয়ে হেঁটে যান আদিগন্তে। তাঁর ফেলে যাওয়া পথ আলোকিত হয়। বর্ণিলতা ধুসর দিগন্তকে আবৃত করে। মুক্ত বাতাসে তাঁর কবিতার সতেজ শিল্প বেরিয়ে পড়ে। প্রবাহিত হয় সর্বত্র।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment