রবীন্দ্রনাথ ॥ প্রজাহিতৈষী জমিদার
হাবিবুর রহমান স্বপন
রবীন্দ্রনাথের জন্ম ধনী এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পিতামহ প্রিন্স (দ্বারকানাথ ঠাকুর) নামে খ্যাত, পিতা মহর্ষী (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর) নামে। নিজে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, স্বল্পকালের জন্য হলেও ইংরেজ সরকারের নাইট উপাধিধারী। লোকচক্ষে অভিজাতকুলতিলক। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয়টা যে তাঁর নিজের হাতে গড়া সে কথা কম লোকই ভেবে দেখেন। বংশের ধারা রক্ষা করে চলাই যদি অভিলাষ হতো তা হলে জোড়াসাঁকোর প্রাসাদ ছেড়ে গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে, খাল-বিল-নদী পথে ঘুরতেন না এবং শান্তিনিকেতনের মাটি ও খড়ের ঘরে বাস করতেন না।
এক সময় দেশের নবীন লেখকরা বলেছেন, দেশের জনজীবনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেই, তাই তিনি এ দেশের হতে পারেন না। তাদের ধারণা দেশের চাষী মজুরদের তিনি চেনেন না, জানেন না। রবীন্দ্রনাথ সব অভিযোগই মাথা পেতে নিয়েছেন। বলেছেন, ‘সম্মানের চির নির্বাসনে সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসেছি সঙ্কীর্ণ বাতায়নে- সেখান থেকে সমস্ত দেশটাকে, দেশের মানুষকে আমি দেখতে পাইনি।’ তিনি সম্মানের উচ্চ আসনে বসতে যাননি, সম্মানের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁর বিচার করা হয়েছে। বিচারে অভিযুক্ত হয়ে তিনি বিনয়ে বলেছেন,-‘তোমরা যাদের চাষী মজুর বল তাদের সঙ্গে আমার কোন পরিচয় ছিল না এমন না। তবে পরিচয়টা যতটা ঘনিষ্ঠ হতে পারত ততটা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারিনি। তিনি তাই তো লিখেছেন, ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে, ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।’
এর পরও বলতে হয় রবীন্দ্রনাথ যতটা তাদের জন্য করেছেন ও ভেবেছেন ততখানি সেদিন ক’জন করেছেন? চাষী, মজুর, তাঁতীদের উন্নয়নের জন্য তিনি যা তাঁর সময়ে করেছেন তা কে করেছে?
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাঙালী শিক্ষিত সমাজে একটি ‘দোনোমোনা’ ভাব ছিল, এখনও আছে। তাঁকে ফেলতেও পারে না, আবার গিলতেও পারে না। এখনও আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজের কাছে নানা কথা শোনা যায় অথচ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন প্রজাহিতৈষী জমিদার। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ডিস্ট্র্রিক্ট গেজেটিয়ারে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট তার রিপোর্টে বর্ণনা করেন, ‘জমিদার মাত্রই যে হৃদয়হীন হন না তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশিষ্ট কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ ‘নায়েব কর্মচারীরা যাতে প্রজাদের ওপর কোন প্রকার জবরদস্তি না করে সে দিকে তাঁর প্রখর দৃষ্টি ছিল।’ ফসলহানির কারণে ১৩১২ বঙ্গাব্দে এক বছরে তিনি কৃষকদের উদারভাবে আটান্ন হাজার টাকা খাজনা মাফ করেন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে গ্রামের রাস্তা-ঘাট সংস্কার করেছেন, স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছেন। বিভিন্ন গ্রামে যে স্কুল স্থাপন করেন তার জন্য বছরে বরাদ্দ ছিল সাড়ে বারো শ’ টাকা। প্রজাদের মধ্যে যারা অন্ধ বা বিকলাঙ্গ এবং যারা উচ্চ শিক্ষা নিতে চায় তাদের জন্য মাসিক বৃত্তি নির্ধারণ করে দেন। নদী ভাঙ্গনে, ঝড় কিংবা অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্তদের জমিদার রবীন্দ্রনাথ অর্থ সহায়তা দিতেন। শাহজাদপুরে অবস্থানকালে আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত এনায়েতপুর থেকে কয়েকজন গ্রামবাসী এসেছিলেন জমিদার রবীন্দ্রনাথের কাছে। তিনি তৎক্ষণাৎ তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা ও নগদ টাকা প্রদান করেন।
রবীন্দ্রনাথ দীন-দরিদ্রের কথা ভেবেছেন, বলেছেন, লিখেছেন। এমন আর কে করেছেন? দেশের অখ্যাত দীন-দুুঃখী দুুর্বল অসহায় মানুষগুলোর সঙ্গে তিনি কতখানি একাত্মবোধ করেছেন তা তাঁর লেখা চিঠি পড়লেই জানা যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি চিঠিতে লিখেন, ‘অন্তরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মতো দরিদ্র সুখ-দুঃখ কাতর মানুষ, পৃথিবীতে আমারও কত ছোট ছোট বিষয় দরকার কত সামান্য কারণে মর্মান্তিক কান্না, কত লোকের প্রসন্নতার উপরে জীবনের নির্ভর। এই সমস্ত ছেলেপিলে গরু-লাঙ্গল-ঘরকন্নাওয়ালা সরল হৃদয় চাষাভুষারা আমাকে কী ভুলই জানে। আমাকে এদের স্বজাতি মানুষ বলেই জানে না।’ গ্রাম্য মহাজনদের কবল থেকে প্রজাদের মুক্ত করবার জন্য এবং যিনি এদেশের কৃষকের উন্নতির জন্য তাঁর নোবেল পুরস্কারের সমুদয় টাকা ব্যয় করে গেছেন কৃষি ব্যাংক করে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদেরই লোক।’ অভিজাত অপবাদটি রবীন্দ্রনাথ কোন মতেই এড়াতে পারেননি। বংশ গৌরব, অপূর্ব দেহকান্তি, অসামান্য ব্যক্তিত্ব তদুপরি বহুবিধ গুণে তিনি এতই স্বতন্ত্র ছিলেন যে তাঁকে সাধারণ একজন বলে ভাবা কঠিন। অথচ তিনি এই আভিজাত্য কথাটাকেই একটা নতুন সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে বলতে চেয়েছিলেন, আভিজাত্য বংশ গৌরবে নয়, অর্থ গৌরবে নয়, পদ গৌরবে নয়; এটি মানুষের স্বভাবজাত উৎকর্ষ, নিত্যদিনের ব্যবহারে যার প্রকাশ। ফুলের যেমন সৌরভ, আভিজাত্য তেমনি মানুষের মনের সৌরভ।
রবীন্দ্রনাথ ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, ‘যদি জমিদারী হস্তান্তরে বাধা না থাকে এবং জমি যদি খোলা বাজারে বিক্রি হয়ই তা হলে যে ব্যক্তি স্বয়ং চাষ করে তার কেনবার সম্ভাবনা অল্পই; যে লোক চাষ করে না, কিন্তু যার টাকা আছে, অধিকাংশ বিক্রয় যোগ্য জমি তার হাতে গিয়ে পড়বেই। তাতে গরীব চাষীর সমস্যার সমাধান হবে না। গরীব চাষীর হাতে জমি দিলেও সে রাখতে পারবে না। কারণেই জমিদারী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে পল্লীগ্রামের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করতে পারলে তবেই চাষী রক্ষা পাবে। প্রতিনিয়ত নিজেকে রক্ষা করবার শক্তি নিজের ভিতর থেকেই উদ্ভাবন করতে পারবে।’
অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া দেশবাসীর মুক্তি যে সম্ভব না তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশক ও বিংশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত নদীয়া (বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহ যা ছিল বিরাহিমপুর পরগণাভুক্ত), পাবনা (ইউসুফশাহী পরগণাভুক্ত শাহজাদপুর বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলাধীন), রাজশাহী (বর্তমানে নাটোর জেলার পতিসর যা ছিল কালিগ্রাম পরগণাভুক্ত) এবং বীরভূম জেলায় জমিদারির কাজ তদারকি করার সময় রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, গ্রামের জীবনকে কিভাবে ইংরেজ শাসন-শোষণ ক্ষতি করেছে। ইউরোপে শিক্ষা গ্রহণকালে সেখানকার মানুষ ও অর্থনৈতিক চিত্র অবলোকন করেছেন। ‘নোবেল’ পুরস্কার পাওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে যে অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছিলেন, তা তিনি এদেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকেই কৃষক, তাঁতী, জেলে, কামার, কুমোরদের উন্নয়নের প্রচেষ্টার পাশাপাশি তাদের সন্তানদের শিক্ষার তাগাদা অনুভব করেন।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে উপরিল্লিখিত চার জমিদারির দেখাশোনার দায়িত্ব দেন রবীন্দ্রনাথকে। এর পাঁচ বছর পর ১৮৯৬-এর ৮ আগস্ট উক্ত জমিদারিসমূহের সর্বময় দায়িত্ব দেন (পাওয়ার অব এ্যাটর্নি)। জমিদারির কাজে তিনি নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। পুরাতন বিধি পরিবর্তন করার বিরুদ্ধে ছিলেন পুরাতন কর্মচারীরা। দুর্বোধ্য কার্যপ্রণালী পদ্ধতির পরিবর্তে তিনি যে নতুন বা সহজ পদ্ধতির প্রবর্তন করেন তা অনুকরণ করার জন্য পার্শ¦বর্তী জমিদাররা তাদের কর্মচারীদের পাঠাতেন তা জানার জন্য।
প্রজাদের জন্য জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বার ছিল অবারিত। সকাল-সন্ধ্যা-রাত্রি যখন-তখন প্রজারা তাঁর সাক্ষাত পেতেন। তিনি লিখেছেন, ‘কোন কোন দিন দরবারে দিন কেটে যেত নাওয়া-খাওয়ার সময় কেটে যেত। তাতেই আমি আনন্দ পেতাম। যতদিন পল্লীগ্রামে ছিলাম ততদিন তাকে তন্ন তন্ন করে জানবার চেষ্টা আমার মনে ছিল। কাজের উপলক্ষে এক গ্রাম থেকে আর এক দূর গ্রামে যেতে হয়েছে, শিলাইদহ থেকে পতিসর, নদী-নালা-বিলের মধ্য দিয়ে-তখন গ্রামের বিচিত্র দৃশ্য দেখেছি। পল্লীবাসীদের দিনকৃত্য, তাদের জীবনযাত্রার বিচিত্র চিত্র দেখে প্রাণ ঔৎসুক্যে ভরে উঠতো। আমি নগরে পালিত, এসে পড়লাম পল্লীশ্রীর কোলে- মনের আনন্দে কৌতূহল মিটিয়ে দেখতে লাগলুম। ক্রমে এই পল্লীর দুঃখ দৈন্য আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো, তার জন্যে কিছু করব এই আকাক্সক্ষায় আমার মন ছট্ফট্ করে উঠেছিল। তখন আমি যে জমিদার ব্যবসায় করি, নিজের আয়-ব্যয় নিয়ে ব্যস্ত, কেবল বণিক-বৃত্তি করে দিন কাটাই-এটা নিতান্তই লজ্জার বিষয় মনে হয়েছিল। তার পর থেকে চেষ্টা করতুম -কী করলে এদের মনের উদ্বোধন হয়, আপনাদের দায়িত্ব এরা আপনি নিতে পারে। আমরা যদি বাইরে থেকে সাহায্য করি তাতে এদের অনিষ্টই হবে। কী করলে এদের মধ্যে জীবন সঞ্চার হবে। এই প্রশ্নই তখন আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। এদের উপকার করা শক্ত। কারণ এরা নিজেকে বড়ো অশ্রদ্ধা করে। তারা বলত ‘আমরা কুকুর, ক’ষে চাবুক মারলে তবে আমরা ঠিক থাকি? ’
তিনি শিলাইদহে গ্রামবাসীদের বয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। একজন শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়। একটি ঘর উঠানো হয়েছিল গ্রামের মাঝে। সন্ধ্যায় সেখানে গ্রামবাসী বই, পুঁথিপাঠ শুনে জ্ঞান অর্জন করবে এই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু নানা অজুহাতে ছাত্র জুটল না। তবে মুসলমান গ্রামবাসী জমিদারকে অনুরোধ করে ‘ওরা যখন স্কুল নিচ্ছে না তখন আমাদের একজন প-িত দিন আমরা তাকে রাখব। তার বেতন দেব, তাকে খেতে দেব।’ উক্ত স্কুলটি দীর্ঘদিন ছিল। শিলাইদহ কাছারি বাড়ি থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত উঁচু করে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “সমগ্র দেশ নিয়ে চিন্তা করবার দরকার নেই। আমি একলা ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারব না । আমি শুধু জয় করব একটি বা দুটি ছোট গ্রাম, এদের মনকে পেতে হবে, এদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। সেটা খুব সহজ নয়, খুব কঠিন কৃচ্ছ্রসাধন। আমি যদি কেবল দুটি-তিনটি গ্রামকেও মুক্তি দিতে পারি অজ্ঞতা-অক্ষমতার বন্ধন থেকে, তবে সেখানেই সমগ্র ভারতের একটি ছোট আদর্শ তৈরি হবে।”
জমিদারির কাজে বসে রবীন্দ্রনাথ মানুষের নানা সমস্যার সমাধান করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে। শাহজাদপুরের মাদলা গ্রামের দরিদ্র জেলে রামগতির খাজনা বকেয়া হওয়ায় জমি নিলামে ওঠার উপক্রম হয়। জেলে রামগতি একটি চিতল মাছ নিয়ে জমিদার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি মাছের দাম পরিশোধ করে দেন এবং রামগতির খাজনাও মওকুফ করে দেন। রবীন্দ্রনাথ জমিদারির দায়িত্ব পাওয়ার পর পতিসর ও শাহজাদপুরে দেখলেন প্রজাদের বসার ব্যবস্থা ভিন্ন। তিনি মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করার আদেশ দেন তাঁর কর্মচারীদের। হিন্দু ব্রাহ্মণরা ফরাসে বসতেন আর মুসলমান ও নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা দাঁড়িয়ে থাকতেন অথবা নিচে বসতেন। কবি এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করে মহানুভবতার পরিচয় দেন। সে সময়ে এই পরিবর্তন জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সকলেই শাহজাদপুরের দুধ, ঘি-মাখন, ছানা পছন্দ করতেন। প্রতিমাসে ঠাকুর পরিবারের জন্য ১৫ সের ঘি যেত শাহজাদপুর থেকে। এসব সরবরাহ করতেন রাউতারার গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তিনি জমিদারের কাছে আবেদন করেন গো-চারণ ভূমির জন্য। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে পাঁচ শ’ টাকায় এক শ’ বিরানব্বই বিঘা জমি (সোনাই নদীর চরে) গিরিশ ঘোষের নামে পত্তন দেন। উল্লেখ্য, এই জমি এবং এর নিকটবর্তী এলাকায় মিল্ক ভিটার বর্তমান গো-চারণ ভূমি। গরিব জেলেদের জন্য জমিদার রবীন্দ্রনাথ উন্মুক্ত জলাভূমি দিয়েছিলেন। এর জন্য জেলেদের কোন কর দিতে হয়নি। শাহজাদপুরে তাঁর সহায়তায় দুটি স্কুল স্থাপিত হয়েছিল। সেটাই ছিল ওই এলাকার প্রথম স্কুল।
ম্যালেরিয়া, কলেরা, ডায়ারিয়া প্রভৃতি রোগ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য তিনি জন সাধারণকে স্বাস্থ্য শিক্ষা দেন ও কয়েকটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেন। প্রজারা যেন অযথা ঝগড়া বিবাদে অথবা মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে না পড়ে এর জন্য তিনি সালিশী বিচারের প্রবর্তন করেন। গঠন করেন বিচার সভা। বিচার কারও পছন্দ না হলে সে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আপীল সভায় যেতে পারত। এই আপীল সভার প্রধান ছিলেন জমিদার নিজেই। বিচারের জন্য বাদী বা বিবাদীকে কোন ব্যয় বহন করতে হতো না। কেবল দরখাস্ত করার জন্য বা কাগজ কেনার জন্য সামান্য কিছু মূল্য দিতে হতো। এ ব্যবস্থা প্রবর্তন হওয়ার পর এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় ছিল। কালিগ্রামে হিতৈষী সভা গঠন করা হয়েছিল প্রজাদের কল্যাণার্থে। হিতৈষী সভায় প্রজারা যে টাকা উঠাতেন সমপরিমাণ টাকা দেয়া হতো জমিদারের তহবিল থেকে। এই টাকায় কয়েকটি পাঠশালা, তিনটি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং পতিসরে একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। উক্ত তহবিল থেকেই উচ্চ শিক্ষায় ইচ্ছুকদের বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা হয়। পতিসরে নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি ব্যাংক। ট্রাক্টর দিয়ে উন্নত চাষাবাদ ছাড়াও ছাতা তৈরি, মাটির সানকি, খোলা তৈরি ও গামছা-শাড়ি-ধুতি ও লুঙ্গি বুনন শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। গড়ে তোলা হয় ধর্মগোলা। সেখানে আপদকালীর জন্য কৃষকেরা ফসল জমা রাখত, এখান থেকে সেটা তারা প্রয়োজনে ধার নিতে পারত। কালিগ্রাম পরগণায় তিনি আমদানি করা উৎকৃষ্টমানের ভুট্টার বীজ এনে চাষ করেন। আলু, টমেটো ও আখের চাষও শুরু করেন। স্থাপন করেন মাটি পরীক্ষার রসায়নাগার। বাড়ির আঙ্গিনায় শাক-সবজি, ক্ষেতের আইলে আনারস, খেজুর গাছ ও কলাগাছ লাগাতে প্রজাদের উদ্বুদ্ধ করেন। এ কাজের জন্য পুত্র রথীন্দ্রনাথকে নিয়োগ করেন। তিনি তাঁর স্বপ্নের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কৃষির উন্নয়নের জন্য আমৃত্যু চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বোলপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিদ্যাপিঠ এবং সেখানেই স্থাপন করেছেন শ্রীনিকেতন। বিশ্বভারতী এখন বিশ্বের অন্যতম বিদ্যাপিঠ। শ্রীনিকেতনে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কৃষি, গবাদিপশু পালন, আসবাবপত্র নির্মাণসহ বিভিন্ন ব্যবহারিক শিক্ষা দেয়া হয়।
হিন্দু-মুসলিম সুসম্পর্ক ছাড়া দেশের মানুষের কল্যাণ সম্ভব না সেটা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বয়ন শিল্পের মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চেয়েছেন। সুশিক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তিতেই মানুষের ভেদ-বুদ্ধির প্রকাশ পাবে এমন বিশ্বাস তিনি লালন করতেন।
লেখক : সাংবাদিক
hrahman.swapon@gmail.com
এক সময় দেশের নবীন লেখকরা বলেছেন, দেশের জনজীবনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেই, তাই তিনি এ দেশের হতে পারেন না। তাদের ধারণা দেশের চাষী মজুরদের তিনি চেনেন না, জানেন না। রবীন্দ্রনাথ সব অভিযোগই মাথা পেতে নিয়েছেন। বলেছেন, ‘সম্মানের চির নির্বাসনে সমাজের উচ্চ মঞ্চে বসেছি সঙ্কীর্ণ বাতায়নে- সেখান থেকে সমস্ত দেশটাকে, দেশের মানুষকে আমি দেখতে পাইনি।’ তিনি সম্মানের উচ্চ আসনে বসতে যাননি, সম্মানের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁর বিচার করা হয়েছে। বিচারে অভিযুক্ত হয়ে তিনি বিনয়ে বলেছেন,-‘তোমরা যাদের চাষী মজুর বল তাদের সঙ্গে আমার কোন পরিচয় ছিল না এমন না। তবে পরিচয়টা যতটা ঘনিষ্ঠ হতে পারত ততটা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারিনি। তিনি তাই তো লিখেছেন, ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে, ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।’
এর পরও বলতে হয় রবীন্দ্রনাথ যতটা তাদের জন্য করেছেন ও ভেবেছেন ততখানি সেদিন ক’জন করেছেন? চাষী, মজুর, তাঁতীদের উন্নয়নের জন্য তিনি যা তাঁর সময়ে করেছেন তা কে করেছে?
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাঙালী শিক্ষিত সমাজে একটি ‘দোনোমোনা’ ভাব ছিল, এখনও আছে। তাঁকে ফেলতেও পারে না, আবার গিলতেও পারে না। এখনও আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজের কাছে নানা কথা শোনা যায় অথচ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন প্রজাহিতৈষী জমিদার। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ডিস্ট্র্রিক্ট গেজেটিয়ারে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট তার রিপোর্টে বর্ণনা করেন, ‘জমিদার মাত্রই যে হৃদয়হীন হন না তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিশিষ্ট কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ ‘নায়েব কর্মচারীরা যাতে প্রজাদের ওপর কোন প্রকার জবরদস্তি না করে সে দিকে তাঁর প্রখর দৃষ্টি ছিল।’ ফসলহানির কারণে ১৩১২ বঙ্গাব্দে এক বছরে তিনি কৃষকদের উদারভাবে আটান্ন হাজার টাকা খাজনা মাফ করেন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে গ্রামের রাস্তা-ঘাট সংস্কার করেছেন, স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছেন। বিভিন্ন গ্রামে যে স্কুল স্থাপন করেন তার জন্য বছরে বরাদ্দ ছিল সাড়ে বারো শ’ টাকা। প্রজাদের মধ্যে যারা অন্ধ বা বিকলাঙ্গ এবং যারা উচ্চ শিক্ষা নিতে চায় তাদের জন্য মাসিক বৃত্তি নির্ধারণ করে দেন। নদী ভাঙ্গনে, ঝড় কিংবা অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্তদের জমিদার রবীন্দ্রনাথ অর্থ সহায়তা দিতেন। শাহজাদপুরে অবস্থানকালে আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত এনায়েতপুর থেকে কয়েকজন গ্রামবাসী এসেছিলেন জমিদার রবীন্দ্রনাথের কাছে। তিনি তৎক্ষণাৎ তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা ও নগদ টাকা প্রদান করেন।
রবীন্দ্রনাথ দীন-দরিদ্রের কথা ভেবেছেন, বলেছেন, লিখেছেন। এমন আর কে করেছেন? দেশের অখ্যাত দীন-দুুঃখী দুুর্বল অসহায় মানুষগুলোর সঙ্গে তিনি কতখানি একাত্মবোধ করেছেন তা তাঁর লেখা চিঠি পড়লেই জানা যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি চিঠিতে লিখেন, ‘অন্তরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মতো দরিদ্র সুখ-দুঃখ কাতর মানুষ, পৃথিবীতে আমারও কত ছোট ছোট বিষয় দরকার কত সামান্য কারণে মর্মান্তিক কান্না, কত লোকের প্রসন্নতার উপরে জীবনের নির্ভর। এই সমস্ত ছেলেপিলে গরু-লাঙ্গল-ঘরকন্নাওয়ালা সরল হৃদয় চাষাভুষারা আমাকে কী ভুলই জানে। আমাকে এদের স্বজাতি মানুষ বলেই জানে না।’ গ্রাম্য মহাজনদের কবল থেকে প্রজাদের মুক্ত করবার জন্য এবং যিনি এদেশের কৃষকের উন্নতির জন্য তাঁর নোবেল পুরস্কারের সমুদয় টাকা ব্যয় করে গেছেন কৃষি ব্যাংক করে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদেরই লোক।’ অভিজাত অপবাদটি রবীন্দ্রনাথ কোন মতেই এড়াতে পারেননি। বংশ গৌরব, অপূর্ব দেহকান্তি, অসামান্য ব্যক্তিত্ব তদুপরি বহুবিধ গুণে তিনি এতই স্বতন্ত্র ছিলেন যে তাঁকে সাধারণ একজন বলে ভাবা কঠিন। অথচ তিনি এই আভিজাত্য কথাটাকেই একটা নতুন সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে বলতে চেয়েছিলেন, আভিজাত্য বংশ গৌরবে নয়, অর্থ গৌরবে নয়, পদ গৌরবে নয়; এটি মানুষের স্বভাবজাত উৎকর্ষ, নিত্যদিনের ব্যবহারে যার প্রকাশ। ফুলের যেমন সৌরভ, আভিজাত্য তেমনি মানুষের মনের সৌরভ।
রবীন্দ্রনাথ ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, ‘যদি জমিদারী হস্তান্তরে বাধা না থাকে এবং জমি যদি খোলা বাজারে বিক্রি হয়ই তা হলে যে ব্যক্তি স্বয়ং চাষ করে তার কেনবার সম্ভাবনা অল্পই; যে লোক চাষ করে না, কিন্তু যার টাকা আছে, অধিকাংশ বিক্রয় যোগ্য জমি তার হাতে গিয়ে পড়বেই। তাতে গরীব চাষীর সমস্যার সমাধান হবে না। গরীব চাষীর হাতে জমি দিলেও সে রাখতে পারবে না। কারণেই জমিদারী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে পল্লীগ্রামের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করতে পারলে তবেই চাষী রক্ষা পাবে। প্রতিনিয়ত নিজেকে রক্ষা করবার শক্তি নিজের ভিতর থেকেই উদ্ভাবন করতে পারবে।’
অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া দেশবাসীর মুক্তি যে সম্ভব না তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশক ও বিংশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত নদীয়া (বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহ যা ছিল বিরাহিমপুর পরগণাভুক্ত), পাবনা (ইউসুফশাহী পরগণাভুক্ত শাহজাদপুর বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলাধীন), রাজশাহী (বর্তমানে নাটোর জেলার পতিসর যা ছিল কালিগ্রাম পরগণাভুক্ত) এবং বীরভূম জেলায় জমিদারির কাজ তদারকি করার সময় রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, গ্রামের জীবনকে কিভাবে ইংরেজ শাসন-শোষণ ক্ষতি করেছে। ইউরোপে শিক্ষা গ্রহণকালে সেখানকার মানুষ ও অর্থনৈতিক চিত্র অবলোকন করেছেন। ‘নোবেল’ পুরস্কার পাওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে যে অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছিলেন, তা তিনি এদেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকেই কৃষক, তাঁতী, জেলে, কামার, কুমোরদের উন্নয়নের প্রচেষ্টার পাশাপাশি তাদের সন্তানদের শিক্ষার তাগাদা অনুভব করেন।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে উপরিল্লিখিত চার জমিদারির দেখাশোনার দায়িত্ব দেন রবীন্দ্রনাথকে। এর পাঁচ বছর পর ১৮৯৬-এর ৮ আগস্ট উক্ত জমিদারিসমূহের সর্বময় দায়িত্ব দেন (পাওয়ার অব এ্যাটর্নি)। জমিদারির কাজে তিনি নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। পুরাতন বিধি পরিবর্তন করার বিরুদ্ধে ছিলেন পুরাতন কর্মচারীরা। দুর্বোধ্য কার্যপ্রণালী পদ্ধতির পরিবর্তে তিনি যে নতুন বা সহজ পদ্ধতির প্রবর্তন করেন তা অনুকরণ করার জন্য পার্শ¦বর্তী জমিদাররা তাদের কর্মচারীদের পাঠাতেন তা জানার জন্য।
প্রজাদের জন্য জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বার ছিল অবারিত। সকাল-সন্ধ্যা-রাত্রি যখন-তখন প্রজারা তাঁর সাক্ষাত পেতেন। তিনি লিখেছেন, ‘কোন কোন দিন দরবারে দিন কেটে যেত নাওয়া-খাওয়ার সময় কেটে যেত। তাতেই আমি আনন্দ পেতাম। যতদিন পল্লীগ্রামে ছিলাম ততদিন তাকে তন্ন তন্ন করে জানবার চেষ্টা আমার মনে ছিল। কাজের উপলক্ষে এক গ্রাম থেকে আর এক দূর গ্রামে যেতে হয়েছে, শিলাইদহ থেকে পতিসর, নদী-নালা-বিলের মধ্য দিয়ে-তখন গ্রামের বিচিত্র দৃশ্য দেখেছি। পল্লীবাসীদের দিনকৃত্য, তাদের জীবনযাত্রার বিচিত্র চিত্র দেখে প্রাণ ঔৎসুক্যে ভরে উঠতো। আমি নগরে পালিত, এসে পড়লাম পল্লীশ্রীর কোলে- মনের আনন্দে কৌতূহল মিটিয়ে দেখতে লাগলুম। ক্রমে এই পল্লীর দুঃখ দৈন্য আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো, তার জন্যে কিছু করব এই আকাক্সক্ষায় আমার মন ছট্ফট্ করে উঠেছিল। তখন আমি যে জমিদার ব্যবসায় করি, নিজের আয়-ব্যয় নিয়ে ব্যস্ত, কেবল বণিক-বৃত্তি করে দিন কাটাই-এটা নিতান্তই লজ্জার বিষয় মনে হয়েছিল। তার পর থেকে চেষ্টা করতুম -কী করলে এদের মনের উদ্বোধন হয়, আপনাদের দায়িত্ব এরা আপনি নিতে পারে। আমরা যদি বাইরে থেকে সাহায্য করি তাতে এদের অনিষ্টই হবে। কী করলে এদের মধ্যে জীবন সঞ্চার হবে। এই প্রশ্নই তখন আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। এদের উপকার করা শক্ত। কারণ এরা নিজেকে বড়ো অশ্রদ্ধা করে। তারা বলত ‘আমরা কুকুর, ক’ষে চাবুক মারলে তবে আমরা ঠিক থাকি? ’
তিনি শিলাইদহে গ্রামবাসীদের বয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। একজন শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়। একটি ঘর উঠানো হয়েছিল গ্রামের মাঝে। সন্ধ্যায় সেখানে গ্রামবাসী বই, পুঁথিপাঠ শুনে জ্ঞান অর্জন করবে এই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু নানা অজুহাতে ছাত্র জুটল না। তবে মুসলমান গ্রামবাসী জমিদারকে অনুরোধ করে ‘ওরা যখন স্কুল নিচ্ছে না তখন আমাদের একজন প-িত দিন আমরা তাকে রাখব। তার বেতন দেব, তাকে খেতে দেব।’ উক্ত স্কুলটি দীর্ঘদিন ছিল। শিলাইদহ কাছারি বাড়ি থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত উঁচু করে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “সমগ্র দেশ নিয়ে চিন্তা করবার দরকার নেই। আমি একলা ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারব না । আমি শুধু জয় করব একটি বা দুটি ছোট গ্রাম, এদের মনকে পেতে হবে, এদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। সেটা খুব সহজ নয়, খুব কঠিন কৃচ্ছ্রসাধন। আমি যদি কেবল দুটি-তিনটি গ্রামকেও মুক্তি দিতে পারি অজ্ঞতা-অক্ষমতার বন্ধন থেকে, তবে সেখানেই সমগ্র ভারতের একটি ছোট আদর্শ তৈরি হবে।”
জমিদারির কাজে বসে রবীন্দ্রনাথ মানুষের নানা সমস্যার সমাধান করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে। শাহজাদপুরের মাদলা গ্রামের দরিদ্র জেলে রামগতির খাজনা বকেয়া হওয়ায় জমি নিলামে ওঠার উপক্রম হয়। জেলে রামগতি একটি চিতল মাছ নিয়ে জমিদার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি মাছের দাম পরিশোধ করে দেন এবং রামগতির খাজনাও মওকুফ করে দেন। রবীন্দ্রনাথ জমিদারির দায়িত্ব পাওয়ার পর পতিসর ও শাহজাদপুরে দেখলেন প্রজাদের বসার ব্যবস্থা ভিন্ন। তিনি মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করার আদেশ দেন তাঁর কর্মচারীদের। হিন্দু ব্রাহ্মণরা ফরাসে বসতেন আর মুসলমান ও নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা দাঁড়িয়ে থাকতেন অথবা নিচে বসতেন। কবি এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করে মহানুভবতার পরিচয় দেন। সে সময়ে এই পরিবর্তন জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সকলেই শাহজাদপুরের দুধ, ঘি-মাখন, ছানা পছন্দ করতেন। প্রতিমাসে ঠাকুর পরিবারের জন্য ১৫ সের ঘি যেত শাহজাদপুর থেকে। এসব সরবরাহ করতেন রাউতারার গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তিনি জমিদারের কাছে আবেদন করেন গো-চারণ ভূমির জন্য। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে পাঁচ শ’ টাকায় এক শ’ বিরানব্বই বিঘা জমি (সোনাই নদীর চরে) গিরিশ ঘোষের নামে পত্তন দেন। উল্লেখ্য, এই জমি এবং এর নিকটবর্তী এলাকায় মিল্ক ভিটার বর্তমান গো-চারণ ভূমি। গরিব জেলেদের জন্য জমিদার রবীন্দ্রনাথ উন্মুক্ত জলাভূমি দিয়েছিলেন। এর জন্য জেলেদের কোন কর দিতে হয়নি। শাহজাদপুরে তাঁর সহায়তায় দুটি স্কুল স্থাপিত হয়েছিল। সেটাই ছিল ওই এলাকার প্রথম স্কুল।
ম্যালেরিয়া, কলেরা, ডায়ারিয়া প্রভৃতি রোগ থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য তিনি জন সাধারণকে স্বাস্থ্য শিক্ষা দেন ও কয়েকটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেন। প্রজারা যেন অযথা ঝগড়া বিবাদে অথবা মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে না পড়ে এর জন্য তিনি সালিশী বিচারের প্রবর্তন করেন। গঠন করেন বিচার সভা। বিচার কারও পছন্দ না হলে সে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আপীল সভায় যেতে পারত। এই আপীল সভার প্রধান ছিলেন জমিদার নিজেই। বিচারের জন্য বাদী বা বিবাদীকে কোন ব্যয় বহন করতে হতো না। কেবল দরখাস্ত করার জন্য বা কাগজ কেনার জন্য সামান্য কিছু মূল্য দিতে হতো। এ ব্যবস্থা প্রবর্তন হওয়ার পর এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় ছিল। কালিগ্রামে হিতৈষী সভা গঠন করা হয়েছিল প্রজাদের কল্যাণার্থে। হিতৈষী সভায় প্রজারা যে টাকা উঠাতেন সমপরিমাণ টাকা দেয়া হতো জমিদারের তহবিল থেকে। এই টাকায় কয়েকটি পাঠশালা, তিনটি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং পতিসরে একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। উক্ত তহবিল থেকেই উচ্চ শিক্ষায় ইচ্ছুকদের বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা হয়। পতিসরে নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি ব্যাংক। ট্রাক্টর দিয়ে উন্নত চাষাবাদ ছাড়াও ছাতা তৈরি, মাটির সানকি, খোলা তৈরি ও গামছা-শাড়ি-ধুতি ও লুঙ্গি বুনন শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। গড়ে তোলা হয় ধর্মগোলা। সেখানে আপদকালীর জন্য কৃষকেরা ফসল জমা রাখত, এখান থেকে সেটা তারা প্রয়োজনে ধার নিতে পারত। কালিগ্রাম পরগণায় তিনি আমদানি করা উৎকৃষ্টমানের ভুট্টার বীজ এনে চাষ করেন। আলু, টমেটো ও আখের চাষও শুরু করেন। স্থাপন করেন মাটি পরীক্ষার রসায়নাগার। বাড়ির আঙ্গিনায় শাক-সবজি, ক্ষেতের আইলে আনারস, খেজুর গাছ ও কলাগাছ লাগাতে প্রজাদের উদ্বুদ্ধ করেন। এ কাজের জন্য পুত্র রথীন্দ্রনাথকে নিয়োগ করেন। তিনি তাঁর স্বপ্নের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কৃষির উন্নয়নের জন্য আমৃত্যু চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বোলপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিদ্যাপিঠ এবং সেখানেই স্থাপন করেছেন শ্রীনিকেতন। বিশ্বভারতী এখন বিশ্বের অন্যতম বিদ্যাপিঠ। শ্রীনিকেতনে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কৃষি, গবাদিপশু পালন, আসবাবপত্র নির্মাণসহ বিভিন্ন ব্যবহারিক শিক্ষা দেয়া হয়।
হিন্দু-মুসলিম সুসম্পর্ক ছাড়া দেশের মানুষের কল্যাণ সম্ভব না সেটা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বয়ন শিল্পের মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চেয়েছেন। সুশিক্ষা এবং অর্থনৈতিক মুক্তিতেই মানুষের ভেদ-বুদ্ধির প্রকাশ পাবে এমন বিশ্বাস তিনি লালন করতেন।
লেখক : সাংবাদিক
hrahman.swapon@gmail.com
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/
No comments:
Post a Comment