‘কিশোর কুমার হইতে সাবধান'
শান্তা মারিয়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published: 2014-08-04 12:45:26.0 BdST Updated: 2014-08-04 17:08:32.0 BdST
প্রতিভা যেমন ছিল, তেমনি ছিল খামখেয়ালির ধাত নায়ক হওয়ার পর চেয়েছেন গায়ক হতে সংগীতের কোনো তালিম ছাড়াই হয়েছেন হিন্দি সিনেমার ইতিহাসের সেরা প্লেব্যাক গায়ক তিনি কিশোর কুমার জন্মদিনে গ্লিটজের পাতায় এই কিংবদন্তীর দু্যতিময় জীবন ও কর্মের এক ঝলক।
কিশোর কুমারের জন্ম ভারতের মধ্যপ্রদেশে হলেও তাদের আদিবাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গে। বাবা কুঞ্জলাল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী। কাজের সূত্রে মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়ায় থাকতেন স্ত্রী গৌরী দেবী এবং চার সন্তানকে নিয়ে। কিশোরের পারিবারিক নাম আভাস কুমার গাঙ্গুলি। ১৯২৯ সালের ৪ অগাস্ট জন্ম। বড় ভাই অশোক কুমার ছিলেন হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক। মেজভাই অনুপ কুমারও হিন্দি ছবিতে অভিনয় করতেন। কিশোর কুমার ছোটবেলা থেকেই গান গাইতেন এবং সে সময়ের অভিনেতাদের অনুকরণ করে দেখাতেন। বিখ্যাত গায়ক কুন্দলাল সায়গলের বিশেষ ভক্ত ছিলেন তিনি। তার গান হুবহু গাইতে পারতেন।
অশোক কুমারের হাত ধরেই চলচ্চিত্রে আসেন কিশোর কুমার। তার ফিল্মি ক্যারিয়ার শুরু হয় চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বোম্বে টকিজে। এখানেই কাজ করতেন অশোক কুমার। নামটিও তখনই বদলে ‘কিশোর কুমার’ হয়। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ১৯৪৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শিকারী'। সিনেমাটিতে নায়ক ছিলেন অশোক কুমার। বোম্বে টকিজের সিনেমা ‘আন্দোলন’-এ তিনি প্রথম নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। মধুবালার বিপরীতে তার সিনেমাগুলো বেশ সাফল্য পায়। বিশেষ করে কমেডি নায়ক হিসেবে ছিলেন অনবদ্য। ‘নিউদিল্লি’, ‘চালতি কা নাম গাড়ি’, ‘হাফ টিকেট’, ‘আশা’ ইত্যাদি ব্যবসাসফল সিনেমায় অভিনয় করে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সুপারহিট ‘পারোসান’ সিনেমায় তিনি নায়ক সুনীল দত্তর বন্ধুর ভূমিকায় অভিনয় করেন। চরিত্রটি ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা সিনেমা ‘লুকোচুরি’তে তিনি নায়ক ছিলেন। ছবিটিতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ‘লুকোচুরি’ হিট হওয়ায় নায়ক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও তার চাহিদা সৃষ্টি হয়।

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘ফানটুস’, ‘পেইয়িং গেস্ট’, ‘ন দো গেয়ারা’, ‘কাটি পাতাঙ্গ’ ইত্যাদি ছবিতে তার গাওয়া গান বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। সি রামচন্দ্রন, শচীনদেব বর্মন এবং পরবর্তীতে রাহুলদেব বর্মনের সুরে অসাধারণ সব গান উপহার দেন কিশোর কুমার। রাহুলদেব বর্মনের সঙ্গে তার জুটি ছিল সবচেয়ে সফল। কিশোর কুমার প্রথমবারের মতো সেরা গায়ক হিসেবে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পান ১৯৬৯ সালে। রাজেশ খান্না- শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত সুপারডুপারহিট ‘আরাধনা’ ছবিতে ‘রূপ তেরা মাস্তানা’ গানটির জন্য এ পুরস্কার পান তিনি। এ সিনেমার সংগীত পরিচালক ছিলেন শচীনদেব বর্মন। গীতিকার ছিলেন আনন্দ বকশি। ১৯৭৫ সালে শক্তি সামন্ত পরিচালিত উত্তম কুমার-শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত হিন্দি ও বাংলা ছবি ‘অমানুষ’ এ ‘দিল অ্যায়সা কিসি নে মেরা তোরা’ গানের জন্য আবারও পুরস্কার পান তিনি। গানটির বাংলা ছিল ‘কি আশায় বাঁধি খেলাঘর’। সংগীত পরিচালক ছিলেন শ্যামল মিত্র। ১৯৭৮ সালে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ডন সিনেমায় ‘খাইকে পান বানারস ওয়ালা’(সংগীত পরিচালক ছিলেন কল্যাণ-আনন্দ), ১৯৮০ সালে ‘থোড়িসি বেওয়াফাই’ ছবির ‘হাজার রাহে মুরকে দেখে’(সংগীত পরিচালক খৈয়াম), ১৯৮২ সালে ‘নামাক হালাল’ ছবির ‘পাগ ঘুংরু বান্ধ মিরা’ (সংগীত পরিচালক বাপ্পী লাহিড়ী), ১৯৮৩ সালে ‘আগার তুম না হোতে’ সিনেমার ‘আগার তুম না হোতে’ (সংগীত পরিচালক রাহুলদেব বর্মন) ১৯৮৪ সালে ‘শারাবি’ ছবির ‘মনজিলে আপনি’(সংগীত পরিচালক বাপ্পী লাহিড়ী) এবং ১৯৮৫ সালে ‘সাগর’ ছবির ‘সাগর কিনারে’( সংগীত পরিচালক রাহুলদেব বর্মন) গানের জন্য সেরা গায়কের ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। মনোনয়ন পান ১৯ বার।
‘আরাধনা’, ‘আন্দাজ’, ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ এবং ‘কোরা কাগজ’ ছবিতে গান গাওয়ার জন্য চারবার বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।
চলচ্চিত্রের পর্দায় রাজেশ খান্না এবং অমিতাভ বচ্চনের প্লেব্যাক হিসেবে তিনি ছিলেন সবচেয়ে মানানসই। এই দুই মহাতারকার অসংখ্য ছবিতে গান গেয়েছেন কিশোর কুমার। ‘মেরি ভিগি ভিগি সি’, ‘তেরে বিনা জিন্দেগিমে কোই’, ‘তেরা মুঝছে হ্যায় প্যাহেলে থা নাতা কোই’ - এমন অনেক জনপ্রিয় গানের শিল্পী কিশোর কুমার।
বাংলাতেও তার জনপ্রিয় গান রয়েছে অনেক। ‘আমার পূজার ফুল’, একদিন পাখি উড়ে’, ‘কে যেন আমার পাশে’ , ‘আশা ছিল ভালোবাসা ছিল’, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, ইত্যাদি তার গাওয়া জনপ্রিয় গান। ‘লুকোচুরি’ সিনেমায় তার কণ্ঠে ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ’ গানটি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তার গাওয়া ‘নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে’ গানটির সুরকারও তিনি। তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় কিছু রবীন্দ্রসংগীতও রেকর্ড করেন যা বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
‘তুমি কত সুন্দর’ সিনেমায় ‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে’ গানটি তিনি গেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার আগেই ১৯৮৭ সালে মৃত্যু হয় তার। এই সিনেমায় কিশোর কুমারের শবযাত্রার দৃশ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৫০ সালে বাঙালি অভিনেত্রী রুমা গুহঠাকুরতাকে বিয়ে করেন। ৫৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। নিজেদের প্রযোজনার সিনেমা ‘চালতি কা নাম গাড়ি’তে কাজ করার সময় মধুবালার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৬০ সালে বিয়ে করেন তাকে। ১৯৬৯ সালে মধুবালার মৃত্যু পর্যন্ত এই বিয়ে টিকে ছিল। যদিও কিশোর কুমারের পরিবারের সদস্যরা এই বিয়ে কখনও মেনে নেয়নি। কারণ মধুবালা ছিলেন মুসলমান।
১৯৭৬সালে অভিনেত্রী যোগিতা বালীর সঙ্গে কিশোর কুমারের বিয়ে হয়। এই বিয়েও স্থায়ী হয়নি। ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন অভিনেত্রী লীনা চন্দ্রভারকারকে। ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর কিশোর কুমারের মৃত্যু পর্যন্ত এই বিয়ে টিকে ছিল।


No comments:
Post a Comment