Saturday, March 22, 2014

সেলিনা হোসেন : আপন কৃতিত্বের দ্যুতিতে উজ্জ্বল

সেলিনা হোসেন : আপন কৃতিত্বের দ্যুতিতে উজ্জ্বল
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
সেলিনা হোসেন, বাংলা সাহিত্যের জগতে এই সময়ের অগ্রতম একজন কথাশিল্পী। বিন্দুর মাঝে যেমন সিন্দুকে উপস্থাপন করা যায় না, তেমনি এই ছোট্ট লেখার মধ্য দিয়ে সেলিনা হোসেনের কৃতিত্বের বর্ণনা খুব দুরূহ। তবে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে কোনো দ্বিধা, সংশয় ইত্যাদি ব্যতিরেকে স্পষ্ট ও বলিষ্ঠভাবেই একথা বলা যায়- সুস্থ, সৎ ও মৌলিক সাহিত্যের এই সংকটকালে, জনপ্রিয় ধারার সাহিত্য রচনার প্রবল জোয়ারের বিপরীতে মুষ্টিমেয় যে ক’জন লেখক স্বকীয়তা অক্ষুণœ রেখে সত্যিকারের সাহিত্য রচনার পথে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন, তাদেরই অন্যতম একজন সেলিনা হোসেন। অনেক রক্তক্ষরণ, মেধার সুতীক্ষœ চর্চা, প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের পেছনে প্রবল মনোযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি লেখা কীভাবে সাহিত্য হয়ে ওঠে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সেলিনা হোসেনের প্রত্যেকটি রচনা। তিনি নিজেও বহুবার বলেছেন, সাহিত্য বিনোদনের মাধ্যম নয়। ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘উত্তরসারথি’, ‘জলোচ্ছ্বাস’, ‘যাপিত জীবন’, ‘নীল ময়ূয়ের যৌবন’, ‘চাঁদ বেনে’, ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’, ‘মগ্নচৈতন্যে শিস’, ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’সহ অন্যান্য উপন্যাস, গল্প, শিশুতোষ রচনায় আমরা তার এই উচ্চারণকেই স্পষ্ট হতে দেখি। ব্যতিক্রমধর্মিতা চোখে পড়ে তার বিষয় নির্বাচন, গঠন রীতি এবং ভাষাভঙ্গিতে। বাংলাদেশের সামাজিক সংকটময় আবর্ত, অবক্ষয়, মধ্যবিত্ত জীবনের ক্লেদ, সংগ্রামী চেতনা, ঐতিহ্যগত জীবনবোধ, আপসহীন মনন, যুদ্ধ, নষ্ট রাজনীতি এবং সম্ভাবনায়ম উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তার উপন্যাস ও ছোটগল্পের মূল সুর। জীবন, সমাজ, মাটি ও মানুষের কাছে দায়বদ্ধ এই কথাসাহিত্যিক এ জন্যই স্বকীয়তার দিক থেকে নিজস্ব পরিমণ্ডল গড়ে নিয়েছেন আরো অনেক অনেক আগেই। তার প্রতিটি রচনায় সম্পৃক্ত হয়েছে সমকালীনতা আর গভীর জীবনবোধ। তার চেতনার স্তরে স্তরে রয়েছে অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা ও মমত্ববোধ। সাহিত্যে গ্রাম ও শহর উভয় পটভূমিরই বিশ্বস্ত রূপকার তিনি। জীবনকে গভীরভাবে জানার তার যে প্রচণ্ড আগ্রহ রয়েছে তা-ই পাঠকের দরজায় নিরন্তর কড়া নাড়ে। গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, নানা বিষয়ক প্রবন্ধ সব ক্ষেত্রেই রয়েছে তার অপরিসীম মেধা আর সৃষ্টিশীলতার বিস্তৃত স্পর্শ। তার কৃতকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য পুরস্কার তিনি অর্জন করেছেন এজন্যই।
সব মিলিয়ে তার সর্বশেষ গ্রন্থ সংখ্যা কত সে হিসাব জানি না। তবে তা যে অর্ধশত অতিক্রান্ত এমনটি সহজেই অনুমেয়। তার কয়েকটি উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মালের মতো একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার বেশ কয়েকটি উপন্যাসে তিনি বাংলার লোকপুরাণের উজ্জ্বল চরিত্রগুলোকে নতুনভাবে তুলে এনেছেন। বাঙালির অহঙ্কার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গে তার লেখায় নতুন মাত্রা অর্জন করে। জীবনের গভীর উপলব্ধির প্রকাশকে তিনি শুধু কথাসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন না, শাণিত ও শক্তিশালী গদ্যের নির্মাণে প্রবন্ধের আকারেও উপস্থাপন করেন। নির্ভীক তার কণ্ঠ-কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধে। তার গবেষণামূলক রচনাগুলোও অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে। পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ‘যাপিত জীবন’ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ উপন্যাস দুটি পাঠ্যসূচিভুক্ত। ছাত্র অবস্থায় ছাত্ররাজনীতি, পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমীর পরিচালক পদে চাকরি, সংসার কোনো কিছুই তার সাধনা অর্থাৎ সাহিত্যচর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ছাত্র অবস্থায়ই তার লেখকসত্তার প্রকাশ ঘটে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে একটি হলের নির্বাচিত একজন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেও শিক্ষা এবং সাহিত্যচর্চা সব দিকেই পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন সমান্তরালে। ৬৬ বছর বয়সেও (জন্ম-১৪ জুন, ১৯৪৭) মাথা উঁচু করে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। ক্লান্তিহীন, আলস্যহীন সেলিনা হোসেন যেন সহিষ্ণু বৃক্ষের মতো। ফলবান বৃক্ষ যেমন নতজানু হয়, ঠিক তেমনি বিনয়ের ভারে সেলিনা হোসেন নুইয়ে আছেন। যে প্রদীপ তিনি অসীম ধৈর্য ও অপরাজেয় নিষ্ঠার সঙ্গে অন্তর্লোকে জ্বালিয়ে রেখেছেন, এর আলোই যেন তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার চালই এমন হালকা যে, সহজে বুঝতেই পারা যায় না-এই নিরহঙ্কারী, সদালাপী মানুষটি নিজের ভেতর বিদ্যার্জিত কত রকমারি জিনিস সঞ্চয় করে রেখেছেন, যার আভা বিচ্ছুরিত হয় তার রচনায়। সেলিনা হোসেনের ভেতরকার সম্পদ বুঝতে সে রকম মানুষ লাগে। আমরা তার এমন ক’জন গুণগ্রাহী আছি কিংবা সে মাপের ঠিক সেভাবে তাকে বোঝার ক্ষমতা অর্জন করেছি? না, সে সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাই সেলিনা হোসেনকে নিয়ে কিছু লেখার ব্যাপারে এর চেয়ে বেশি সাহসও আমি অন্ততঃ অর্জন করিনি। তাকে মূল্যায়নের জন্য অনেক বড় যোগ্য হওয়া প্রয়োজন। শুধু এটুকুই বলব, বাংলা সাহিত্যের প্রয়োজনে, আমাদের প্রয়োজনেই তাকে আরো অনেক অনেক দিন আমাদের প্রয়োজন। তিনি আমাদের মাঝে সেই তেজ নিয়েই বেঁচে থাকুন দীর্ঘকাল এ প্রত্যাশাই পোষণ করছি তার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে।
লেখক : সাংবাদিক - See more at: http://manobkantha.com/2013/06/14/125488.html#sthash.JYemR7MR.dpuf

No comments:

Post a Comment