Friday, March 21, 2014

প্রথম আলোর যত ক্ষমাপ্রার্থনা : নিজেদের স্বার্থে অসত্য লেখা, আর ধরা পড়লে ক্ষমাভিক্ষা

প্রথম আলোর যত ক্ষমাপ্রার্থনা : নিজেদের স্বার্থে অসত্য লেখা, আর ধরা পড়লে ক্ষমাভিক্ষা


অবশেষে হাইকোর্ট বিভাগে ক্ষমা চাইতেই হলো প্রথম আলোকে। ক্ষমা না চেয়ে উপায় ছিল না। গত ১১ মার্চ সম্পাদক মতিউর রহমান এবং যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান দুজনই ক্ষমা চাইলেন। শুধু এবারই প্রথম নয়, আরো বহু বিষয়ে মিথ্যা বিভ্রান্তিমূলক লেখা প্রকাশের পর ঠেলায় পড়ে ক্ষমা চেয়েছে প্রথম আলো। নিজেদের স্বার্থে ইচ্ছামত লিখে পরে আবার ক্ষমাপ্রার্থনা প্রথম আলোর স্বভাবে পরিণত হয়েছে। নানা রকম বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার কারণে প্রথম আলোর ক্ষমা চাওয়ার নজির রয়েছে অনেক। ঠেলায় পড়ে পত্রিকার পাতায় দুঃখ প্রকাশ করতেও দেখা যায় সময়ে সময়ে। এর কয়েকটি ছোট নজির পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। 
আদালতে ক্ষমাপ্রার্থনায় মতিউর রহমানের মুক্তি, মিজানুরের জরিমানা
সর্বশেষ চলতি মাসের শুরুতে হাইকোর্ট বিভাগে মঞ্জুর করা জামিন নিয়েও একটি বিভ্রান্তিমূলক লেখা প্রকাশ করে প্রথম আলো। সেই লেখার প্রেক্ষিতে আদালত রুল জারি করলে প্রথম দিকে পত্রিকাটি ক্ষমা না চাওয়ার নানা কৌশল অবলম্বন করে। কোনো কৌশলই কাজে আসেনি। এক সময় পত্রিকাটির পক্ষে আদালতে দাঁড়ানো উকিলও সেদিন বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সর্বশেষ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক দুজনই দাঁড়িয়ে মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যমূলক লেখা প্রকাশের কারণে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলেন। 

মহানবী (সা.)-কে নিয়ে ব্যঙ্গকার্টুন, অতঃপর জোড়হাতে ক্ষমাপ্রার্থনা
২০০৭ সালে পত্রিকাটির ফান ম্যাগাজিন ‘আলপিন’-এ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গকার্টুন প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষ জেগে ওঠে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের রাস্তায় রাস্তায়। ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার অভিযোগে পত্রিকাটির প্রকাশনা বাতিলের দাবি ওঠে তখন। তাতে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। টনক নড়েছে তখনই যখন জাতীয় মসজিদের তত্কালীন খতিব মরহুম মাওলানা উবায়দুল হক জুমার খুতবায় কড়া হুশিয়ারি দিলেন। এই হুশিয়ারির পর ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ খুঁজতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় পত্রিকা কর্তৃপক্ষের।
তখন প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের আন্দোলনের ফসল জেনারেল মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার ক্ষমতায়। জরুরি আইনের সরকারের তত্কালীন তথ্য উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের সহায়তা নেন প্রথম আলো সম্পাদকসহ কর্তৃপক্ষ। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যান বায়তুল মোকাররমে। সেখানে খতিব মাওলানা উবায়দুল হকের কাছে ক্ষমা চান। খতিবের পায়ের কাছে নতজানু সম্পাদক মতিউর রহমান এবং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তথ্য উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের ছবি পরের দিন জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়। বিভ্রান্তিমূলক এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর পর এভাবে নতজানু ক্ষমা চাওয়ার নজির দুনিয়ার কোনো সম্পাদকের আছে কি না, সেটা অনুসন্ধানের বিষয়। তবে বাংলাদেশে এমন নতজানু ক্ষমা চাওয়ার যে নজির নেই, সেটা জোর দিয়েই বলা যায়। 

হাত জোড় করে ক্ষমাভিক্ষার পর বায়তুল মোকাররমের খতিব উবায়দুল হক প্রথম আলোকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান। এতে তখন রেহাই পায় প্রথম আলো। শুধু তা-ই নয়, সাপ্তাহিক ফান ম্যাগাজিন ‘আলপিন’ চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। 
পবিত্র কোরআনের আয়াত বিকৃত করে প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আনিসুল হকের গদ্যকার্টুন ও ক্ষমাপ্রার্থনা
শুধু প্রথম আলো নয়, এখানে কাজ করা একাধিক ব্যক্তিরও একাধিকবার বিভিন্ন অপকর্ম করে পরে ক্ষমা চাওয়ার নজির আছে। প্রথম আলো পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক আনিসুল হক ‘ছহি রাজাকারনামা’ নামে তার একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনায় পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াতকে সম্পূর্ণ বিদ্রূপাত্মকভাবে তুলে ধরেন। আনিসুল হকের এ লেখাটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৯১ সালের ১২ এপ্রিল পুর্বাভাস পত্রিকায়। ১৯৯৩ সালে লেখাটি আনিসুল হকের ‘গদ্যকার্টুন’ বইতে স্থান পায়। ২০১০ সালে এই বইটি পুনরায় মুদ্রণ করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সন্দেশ। বইটিতে পর্দানসিন নারী ও দাড়ি-টুপিধারী আলেমদের নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছেন শিশির ভট্টাচার্য। কিন্তু ২০১৩ সালের মাঝামাঝি লেখাটি আবার একটি ব্লগে প্রকাশ হওয়ার তা নিয়ে ফেসবুক, ব্লগসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সাইট এবং সচেতন মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে দৈনিক আমার দেশ-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা করেন আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘তারপরও যদি কেউ এ লেখাটি পড়ে আহত বোধ করেন তাহলে আমি নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী।’

শাহবাগিদের আকাশে তুলে আবার মাটিতে নামানো, এরপর ক্ষমা চাওয়া
শাহবাগে কিছু ধর্মদ্রোহী ব্লগারের আয়োজনে ও আওয়ামী লীগ সরকারের সহায়তায় যে সার্কাস মঞ্চস্থ হয়েছিল সেখানকার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিল প্রথম আলো গং। বলা হয়ে থাকে, প্রথম আলো এখানে আর্থিকভাবে সহায়তাও করেছিল বেশ উদারভাবে। সেই শাহবাগেই মাসের পর মাস ধরে চলেছে বাংলাদেশ ও ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিজাতীয় ও বিধর্মী সংস্কৃতির চর্চা। ছেলেমেয়েরা অর্ধউলঙ্গ হয়ে নাচানাচি, একসঙ্গে রাত কাটানো, অগ্নিপূজা—এগুলো ছিল শাহবাগিদের নিয়মিত কর্ম। সেখানে বিকৃত যৌনাচারেরও চর্চা হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করে থাকেন। এ সবই প্রায় আড়াই মাস ধরে চলেছে প্রথম আলো গংয়ের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহায়তায়। কিন্তু এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে হঠাত্ ভোল পাল্টে ফেললো প্রথম আলো! তারা এদিন ‘টিভি ক্যামেরার সামনে মেয়েটি’ শিরোনামে একটি গল্প ছাপলো। হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখা সেই গল্পের মূলকথা ছিল শাহবাগিদের এবং তাদের মুর্শিদদের মধ্যকার যৌন লীলাখেলার সবিস্তার বিবরণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরদিন থেকে শাহবাগিরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে প্রথম আলো ‘নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা’ করে।


উদ্দেশ্য ভালো থাকলে এবং সত্য লিখলে ক্ষমা চাইতে হয় না
এখানেই সত্য এবং মিথ্যা লেখার মধ্যে পার্থক্য। এই সততা তথ্য এবং উদ্দেশ্য উভয়ের। প্রথম আলো শাহবাগ সম্পর্কে সত্য লিখলেও তাদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল না। তারা চেয়েছিল তখন সদ্য বন্ধ হওয়া আমার দেশ পত্রিকার সার্কুলেশন নিজেদের দিকে নিয়ে নিজেদের পতিত সার্কুলেশন চাঙ্গা করা। না হলে তারা আড়াই মাস যে আনাচারকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে এসেছে সরকারের জবরদস্তির মুখে আমার দেশ বন্ধ হওয়ার পর হঠাত্ সেটার বিরোধিতায় নামলো কেন?

অন্যদিকে তথ্য ও উদ্দেশ্যে সততা থাকার কারণে দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান হাইকোর্ট বিভাগ নয়, আপিল বিভাগের সামনে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে ক্ষমা না চাওয়ার নজির স্থাপন করেছিলেন। ‘চেম্বার মানেই সরকারপক্ষে স্টে’ শিরোনামে আমার নিজের লেখা একটি প্রতিবেদনের জন্য সম্পাদক, প্রকাশক এবং আমার বিরুদ্ধে রুল জারি করেছিল আপিল বিভাগ। আমার অপরাধ ছিল প্রতিবেদনটি লিখেছি। সম্পাদক এবং প্রকাশকের অপরাধ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনের পক্ষে দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করলে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগ বলেছিলেন ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’। আপিল বিভাগ সম্পাদক এবং আমাকে জেল জরিমানা করলেন। আইনের আওতাবহির্ভূত জরিমানার প্রতিবাদে আমরা অতিরিক্ত কারাভোগ করেছি। তারপরও জরিমানা দিইনি। ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা। আদালত নিজেই সেদিন ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স বলে প্রকারান্তরে আমাদের প্রতিবেদনের প্রতিটি শব্দের সত্যতার স্বীকৃতি দিয়েছিল।
বাংলাদেশের আবহমান কাল থেকে লালন করা ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে শুরু থেকেই তত্পর প্রথম আলো। সামাজিক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বিনষ্টের মাধ্যমে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তারই হলো পত্রিকাটির মূল এজেন্ডা। তাদের কাজই হলো বাংলাদেশের আবহমান কালের সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করে হিন্দুস্তানি সংস্কৃতির প্রতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করা। এজন্য পত্রিকাটির স্লোগান ছিল— ‘বদলে যাও বদলে দাও’। 

দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে খুনের মামলার প্রধান আসামি যখন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগ হন, আদালতের দরজায় লাথি মারা আইনজীবী যখন বিচারকের আসনে বসার সুযোগ পান, তখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য প্রথম আলোর দরদ জাগে না। প্রধান বিচারপতির আদেশের প্রতিবাদে যখন ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও হয়, তখন সেটা জায়েজ করার লক্ষ্যে উল্টো প্রধান বিচারপতিকে আক্রমণ করে শিরোনাম করা হয়। এই হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি পত্রিকাটির দরদের দৃষ্টান্ত। নিম্ন আদালতে অধিকারবঞ্চিত মানুষ উচ্চ আদালতে আশ্রয় নিয়ে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো আদালতের এখতিয়ারকে চ্যালেঞ্জ করে নিবন্ধন লেখা হয়। জামিনের এখতিয়ার পুলিশের বলে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করা হয় নিবন্ধে। যেই পুলিশ রাজপথে প্রকাশ্যে মানুষ খুন করছে সেই পুলিশের প্রতি দরদ দেখাতে গিয়ে হাইকোর্টকে আক্রমণ করে লেখা হয় নিবন্ধ! বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি তাদের এতটাই দরদ যে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে সরকারি চাহিদায় পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কোনো বালাই নেই। আইনের কোনো তোয়াক্কা নেই। চাহিদা অনুযায়ী রিমান্ড মঞ্জুর হচ্ছে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। সেখানে প্রথম আলোর কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি হচ্ছে নিম্ন আদালতে বঞ্চিত মানুষ উচ্চ আদালতে জামিন পেল কেন! উচ্চ আদালতই বা জামিন মঞ্জুর করছে কেন! প্রথম আলোর কথা হলো, জামিন নির্ভর করে পুলিশের ইচ্ছার ওপর। সেটা আদালতের ইচ্ছার ওপর হবে কেন!
হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলে আবার ক্ষমা চেয়ে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। আঘাত করে ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে পত্রিকাটির চরিত্র। শুধু এই ক্ষমা চাওয়াই নয়, আরো বহু বিষয়ে তারা পত্রিকায় দুঃখ প্রকাশ করে নিজেদের অসত্য প্রকাশের বিষয়ে স্বীকৃতি দেয়া আছে।
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2014/03/21/239290#.Uyul7c7m688
__._,_.___

No comments:

Post a Comment