শান্তিপূর্ণ জালিয়াতি
কাফি কামাল, ফরিদপুর থেকে
কাফি কামাল, ফরিদপুর থেকে

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নানা অনিয়ম চোখে পড়েছে ফরিদপুর সদরে। পোলিং এজেন্ট সিল মারছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর আনারস প্রতীকে। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ভাঁজ করে সে ব্যালট ভরছেন বাক্সে। শূন্য পরিচয়পত্র বুকে ঝুলিয়ে দায়িত্বপালন করছেন প্রিসাইডিং-পোলিং অফিসার থেকে পোলিং এজেন্ট সবাই। একই বুথে অবস্থান করছেন সরকার দলীয় প্রার্থীর তিন-চারজন পোলিং এজেন্ট। প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকদের মহড়া। ভোট দিতে লাইনে লাইনে শিশু-কিশোর। আনারসের পক্ষে ভোট কেন্দ্রের গেটে দাঁড়িয়ে ভোট চাইছে স্কুলছাত্রী। ভোট শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই একেরপর এক কেন্দ্র থেকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পোলিং এজেন্টের বিতাড়ন। দিনভর ছিল নীরব হুমকি। প্রভাবশালী মন্ত্রীর ছোটভাই চেয়ারম্যান প্রার্থী তাই নির্বাচন কর্মকর্তারা তটস্থ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা দর্শকের। তবে নানা অনিয়মের মধ্যেও শান্তিপূর্ণ ছিল পরিবেশ। ফরিদপুর সদরের অন্তত ১২টি কেন্দ্র ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহবুবুল হাসান পিংকু অভিযোগ করেন, সরকার দলীয় প্রার্থী তার নিজের ইউনিয়ন কৈজুরীর বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। তারপরও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণ তাকে বিজয়ী করবে এ বিশ্বাস তার রয়েছে।
সময় তখন সাড়ে নয়টা। মামুদপুর বিছমিল্লাহ শাহ মাজার সিনিয়র মাদ্রাসা কেন্দ্র। গেটেই শোডাউন দিচ্ছিল আনারস প্রতীকের সমর্থকরা। সেখানে আনারস প্রতীকের পক্ষে ভোট চাচ্ছিল দুইজন স্কুলছাত্রী। কেন্দ্রে ঢুকতেই বাধা দিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের এএসআই জাহিদ। তিনি সাংবাদিক পরিচয় জেনে বললেন, সাংবাদিক হোন আর যাই হোন আগে প্রিসাইডিং অফিসারের অনুমতি নিতে হবে। সে সময় বুথের ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল আনারস প্রতীকের সমর্থকরা। সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখেই দ্রুত সরে পড়লেন তারা। মামুদপুর মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোটারদের তেমন উপস্থিতি দেখা না গেলেও চারটি বুথ ঘুরে দেখা গেল প্রথম দেড়ঘণ্টায় কাস্ট হয়েছে ২০ ভাগ ভোট। প্রিসাইডিং অফিসার রফিক উদ্দিন বলেন, ভোটারদের ভোটগ্রহণ স্বাভাবিক রাখতেই বাইরের কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। বুথের সামনে একজন বিশেষ প্রার্থীর সমর্থকদের ভিড় সম্পর্কে তিনি বলেন, বুঝেন তো ভাই মন্ত্রীর এলাকা। সময় তখন ৯টা। তখনও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। সকাল তখন ১০টা। মুরারীদহ কেন্দ্রের বাইরে নারী ভোটারদের ছোট্ট লাইন। পুরুষ ভোটারদের উপস্থিতি নগণ্য। কেন্দ্রে ভোটাদের উপস্থিতি বেশি না হলেও কয়েকটি বুথ ঘুরে দেখা গেছে, দুই ঘণ্টায় ভোট কাস্ট হয়েছে ১০০-১১৫টি।
সময় তখন সাড়ে ১০টা। পিয়ারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। বাইরে হট্টগোল করছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী খন্দকার মোহতাসিম হোসেন বাবরের শতাধিক সমর্থক। মাঠে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। কেন্দ্র পাহারা দিচ্ছেন মাত্র তিনজন পুলিশ। কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেল, শূন্য পরিচয়পত্র নিয়ে ভোটগ্রহণ করছেন পোলিং অফিসাররা। কার্ডে নেই কর্মকর্তার ছবি, নেই রিটার্নিং বা প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর। পোলিং এজেন্ট অবস্থাও একই। কেন্দ্রের প্রতিটি বুথে দেখা গেল, পোলিং এজেন্ট নিয়ে চলেছে রীতিমতো স্বেচ্ছাচার। একই প্রার্থীর একাধিক এজেন্ট অবস্থান করছেন এক একটি বুথে। কোন কোন বুথে এ সংখ্যা তিন থেকে চারজন। তাদের বেশির ভাগই সরকার দল সমর্থিত প্রার্থীর এজেন্ট। যাদের কেউ কেউ আবার প্রার্থীর প্রতীক বুকে নিয়েই অবস্থান করছেন বুথে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে এজেন্টরা নিজেরাই পরস্পরকে অভিযুক্ত করে নিজেকে আসল এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু অতিরিক্ত এসব এজেন্টের ব্যাপারে প্রিসাইডিং অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। পিয়ারপুর কেন্দ্রের তিনটি বুথে দেখা গেল, ব্যালট বাক্সের পাশে বসে প্রকাশ্যে সিলকৃত ব্যালট ভাঁজ করে বক্সে ভরছেন কয়েকজন মহিলা এজেন্ট। তারা বলেন, বয়স্ক নারীদের সহায়তা করতেই তারা সেখানে অবস্থান করছেন। কেন্দ্রের এসব অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রিসাইডিং অফিসার নুর ইসলাম বলেন, ৩৮৭৯ ভোটারের কেন্দ্র এটি। সকালেই ভোটারদের ঢল নেমেছে। কিন্তু আমার লোকবল সঙ্কট। তাই পোলিং অফিসার ও পোলিং এজেন্টদের পরিচয়পত্রে সই-স্বাক্ষর করা হয়নি। তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, কেন্দ্রের পাহারায় পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য না থাকায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তিনি উল্টো প্রশ্ন রাখেন- বাইরে সামাল দেব না ভেতরে সামাল দেব। তবে সাংবাদিকরা যখন কেন্দ্রে নানা অনিয়মের বিষয়গুলো প্রিসাইডিং অফিসারের নজরে আনেন তখন বারবার বাধা দিচ্ছিলেন কেন্দ্রের দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ।
সময় তখন সোয়া ১১টা। ডোমরাকান্দি আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। কেন্দ্রের বাইরে মহড়া দিচ্ছে সরকার সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকরা। বুথের সামনে লাইন দেখা না গেলেও প্রথম তিনঘণ্টায় ভোট কাস্ট হয়েছে ৩৫ ভাগের বেশি। এ কেন্দ্রের ১নং পুরুষ বুথে ৩২১ ভোটের মধ্যেই কাস্ট হয়েছে ১১৬ ভোট। কেন্দ্র ঘুরে একটি বুথেও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মাহবুবুল হাসান পিংকুর এজেন্টদের দেখা যায়নি। পিয়ারপুরের মতো ডোমরাকান্দি কেন্দ্রেও একই অবস্থা। খোদ প্রিসাইডিং অফিসারই শূন্য পরিচয়পত্র নিয়ে পালন করছেন নির্বাচনী দায়িত্ব। প্রিসাইডিং অফিসার শামীম আহমেদ জানান, আগের রাতেই জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে বস্তায় ভরে নির্বাচনী সরঞ্জাম ও ব্যালটের সঙ্গে কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র দেয়া হয়েছে। সেগুলোতে কোন সই স্বাক্ষর ছিল না। এছাড়া কার্ডে ছবি ব্যবহার করার ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। ডোমরাকান্দি কেন্দ্রে ৩ নম্বর বুথে পোলিং এজেন্টদের পাশে বসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ এক মহিলা সালমা খাতুন। কারণ জানতে চাইতেই তিনি নিজেকে পোলিং এজেন্ট পরিচয় দিলেন। তার কাছে রাখা একটি শূন্য পরিচয়পত্রও দেখালেন। তবে তিনি কোন প্রার্থীর এজেন্ট সেটা বলতে পারেননি।
সময় তখন সাড়ে ১১টা। তাম্বুলখানা কবি জসীম উদদীন স্কুল এ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের সামনে জমে উঠেছে ভিড়। বুকে আনারস প্রতীক ঝুলিয়ে সেখানে মহড়া দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকরা। সামনে এগোতেই কয়েকজন এসে জানতে চাইলেন সাংবাদিকদের পরিচয়। বললেন, দেখার কি আছে, ভোট চলছে পানির মতো। কেন্দ্রের ৮ নম্বর পুরুষ বুথে দেখা গেল একজন হম্বিতম্ভি করছেন ভোটারদের। কিন্তু তিনি ওই বুথের পোলিং এজেন্ট নন। সাংবাদিকরা পরিচয় জানতে চাইতেই বেরিয়ে গেলেন কক্ষ থেকে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তাকে দেখা গেল ৬ নম্বর বুথে। সেখানে গিয়ে পোলিং অফিসার ও এজেন্টদের হুমকি দিয়ে বলছেন, সাংবাদিকদের কাছে যেন উল্টোপাল্টা না বলেন। কয়েকজন এজেন্ট জানান, শাহজাহান নামের যুবকটি সরকার সমর্থিত প্রার্থী বাবরের বাসায় থাকেন। তিনি সকাল থেকেই ভোটারদের প্রকাশ্যে আনারস প্রতীকে সিল দিতে বাধ্য করছিলেন। সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ আবুল হাসেমের কাছে নির্বাচন পরিস্থিতি জানলে চাইলে মুচকি হাসেন। পরমুহূর্তে বলেন, আনারস পাস। ডাবল ভোটে পাস। ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই নির্বাচনে হারলে মান যাবে না। কিছু দুই নম্বরী তো হবেই।
সময় তখন দুপুর দেড়টা। মঙ্গলকোর্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। কেন্দ্রের কম্পাউন্ডে খোশ গল্প করছেন পুলিশ সদস্যরা। বাইরে মহড়া দিচ্ছেন আনারস প্রতীকের সমর্থকরা। বুথের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন যুবক। ১ নম্বর বুথের দরজায় দাঁড়িয়েছিল শাকিল নামের এক কিশোর। পরিচয় জানতে চাইতেই বলল, সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। ভোট দিতে এসেছে। ভোটার না হয়েও ভোট দিতে কেন এসেছে জানতে চাইলে শাকিল জানায়, আনারসের এজেন্ট আবদুল হান্নান চাচা বলেছে, তাই এসেছি।কেন্দ্রের একটি কক্ষে স্থাপন করা হয়েছে ১-২ নম্বর বুথ। বুথে ঢুকে দেখা গেল, একজন টেবিলে বসে আনারস প্রতীকে সিল মারছেন আর সেগুলো ভাঁজ করে বক্সে ভরছেন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার। গোপন সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে জানতে চাইতেই তেড়ে এলেন আনারস প্রতীকের পোলিং এজেন্ট আবদুল হান্নান। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিলেন। এক পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বললেন, মিডিয়ার প্রচার করে কোন লাভ নেই। একই কেন্দ্রের ৩-৪ নাম্বার বুথের গোপন কক্ষের পাশেই জানলায় দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন। তারা প্রত্যেক ভোটারকেই আনারস প্রতীকে ভোট দিতে ভোটারদের বাধ্য করছেন। প্রিসাইডিং অফিসার আতাউল হক অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, সামলে রাখতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পুলিশ না থাকায় কিছুটা অগোছালো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মঙ্গলকোর্ট গ্রামের ভোটার রইসউদ্দিন বলেন, দুপুরে হঠাৎ করেই বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এরপর ভয়ে অনেক ভোটারই ভোট কেন্দ্রে আসেনি। এছাড়াও ফরিদপুর সদর উপজেলার রামখন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়, রংকাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাসকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নিখুদি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা মহড়া দিচ্ছেন ভোটকেন্দ্রের বাইরে। এদিকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল হাই শিকদার ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধানের নেতৃত্বে একটি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল ফরিদপুর সদরের বিভিন্ন কেন্দ্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন।
http://mzamin.com/details.php?mzamin=+MTUyODU%3D&s=Mw%3D%3D
No comments:
Post a Comment