Tuesday, March 25, 2014

শিশু-কিশোরদের অন্ধকারে ঠেলছে গাঁজা শীসা ড্যান্ডি

মাদকের ভয়াল ছোবল

The Daily Ittefaq
বাসস
'আসল নাম একটা আছে। তয় সবাই ডাকে সেন্টু মিয়া।' 'কোথায় থাকো?' ওই টিচার কোয়ারটারের শ্যাষ মাথায় নীলক্ষেতে ডাসবিনের পাশে। ফুটপাতে ঘুমাই সবাই একলগে চিপাচিপি কইর্যা।' আমার ফিরতি প্রশ্ন, 'কেন, তোমার বাড়ি নেই? মা-বাবা নেই?। '১৩ বছরের সেন্টুর সাথে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চত্বরে। সে সময় তার সঙ্গে ছিল আরো দুই কিশোর। তারা সবাই মাদকাসক্ত। ওরা বলে, 'গাঁজার পরে ড্যান্ডিও লইছি। এখন গাঁজা কম খাই। ড্যান্ডিই লই বেশি। ড্যান্ডি হইল জুতার পেস্টিংয়ের আঠা!

'কোথায় পাও এসব? 'হাতিরপুলের জুতার কারখানা থেইক্যা কিনি। ৬৫ টেকায় এক ডিব্বা পাই। ড্যান্ডি লইতে লইতে মনে হয়, কইলজ্যাটা এতো দিনে পেলাসটিক হইয়্যা গেছে গো আফা'। 'পরথমে বন্ধুদের কাছ থেইকা লইয়া সিগারেট খাইছি। হের বাদে গাঁজা আর মদ খাওয়া ধরছি। খুব মজা লাগে খাইতে।' কথাগুলো বলছিল নয়ন নামে ১৩ বছরের এক কিশোর। ওর বাড়ি ফরিদপুরে। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর সে দুই বছর আগে ঢাকা চলে আসে। থাকে কাওরান বাজার বস্তিতে। এক ট্রাক চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিন ২০০ টাকা পায়। প্রায় সব টাকাই গাঁজা ও মদের পেছনে খরচা হয়ে যায়। নয়ন জানায়, 'পড়ালেখা আর ভালা লাগে না। গাঁজা আর মদই ভালা।' নয়নের মতো কবীরও মাদকে আসক্ত। কবীর (১৫) থাকে মা-বাবার সঙ্গে কাওরান বাজার বস্তিতে। এক সময় গাঁজা বহনের কাজ করতো। অন্যদের দেখাদেখি সে প্রায় তিন-চার বছর আগে গাঁজা সেবন শুরু করে। এখন মাঝেমধ্যে মদ আর ইয়াবাও গ্রহণ করে।

নয়ন ও কবীরের সঙ্গে দেখা হয় কাওরান বাজার রেলগেটের পাশে বালুর মাঠে লেকের পাশে। সেখানে এই দুই শিশুসহ বেশ কয়েকটি শিশু গোল হয়ে বসে গাঁজা সেবন করছিল। এদের মতো দেশে বহু শিশু মাদকে আসক্ত। তবে এদের সঠিক সংখ্যা অজানা। এসব শিশু গাঁজা, হেরোইন, ফেন্সিডিল, সীসা, ড্যান্ডি, ইয়াবা, পেথিড্রিন ইত্যাদি মাদকে আসক্ত। এসব মাদকদ্রব্য গ্রহণের কারণে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। ঝরে পড়ছে বিদ্যালয় থেকে।

দেখা গেছে, ড্যান্ডি নামে নতুন ও সহজলভ্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে পথশিশুরা। ড্যান্ডি এক ধরনের আঠা, যা মূলত সলিউশন নামে পরিচিত। এতে টলুইন নামে একটি উপাদান আছে। টলুইন মাদকদ্রব্যের তালিকায় আছে। এটি জুতা তৈরি ও রিকশার টায়ার-টিউব লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এটি খেলে ক্ষুধা হয় না ও ব্যথা লাগে না। দীর্ঘ মেয়াদে খেলে মস্তিষ্ক, যকৃত ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

শুধু বস্তি বা পথশিশুই নয়, মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিশুরাও। বনানী, গুলশান, ধানমন্ডির বেশ কয়েকটি খাবারের দোকানের আড়ালে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সীসা গ্রহণ করে। ছেলে শিশুদের পাশাপাশি বহু মেয়েশিশুও মাদকে আসক্ত। এদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও মোস্ট অ্যাট রিস্ক অ্যাডেলেসেন্ট (এমএআরএ) নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের ২০১২ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে চার লাখ ৪৫ হাজার পথশিশু আছে। এদের মধ্যে রাজধানীতে থাকে তিন লাখেরও বেশি পথশিশু। এদের বেশিরভাগই মাদকে আসক্ত। কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের আবাসিক মনোরোগ চিকিত্সক আখতারুজ্জামান সেলিম বলেন, মাদক গ্রহণকারীর বয়স যতো কম হবে, তার ক্ষতির পরিমাণ বেশি হবে। সে ক্ষেত্রে শিশুদের ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়। মাদক নেয়ার কারণে তাদের সুষ্ঠু বিকাশ বিঘ্নিত হয়। পরিকল্পনা গ্রহণে সমস্যা হয়। লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। সামাজিকীকরণে সমস্যা হয়। তবে মাদকাসক্ত শিশুদের ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য, সেটি সময়সাপেক্ষ। শিশুদের আলাদা স্থানে আলাদাভাবে নিরাময় করতে হবে। বড়দের সঙ্গে রাখলে উল্টো ফল হতে পারে।

চিকিত্সা বিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একবার সীসা গ্রহণে যে পরিমাণ নিকোটিন শরীরে যায়, তা ১০০টি সিগারেটের সমপরিমাণ। সীসা সিগারেটের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। মনোরোগ চিকিত্সক ও মাদকাসক্তি চিকিত্সা বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, বাংলাদেশের বহু শিশু এখন মাদকাসক্ত। সমাজের সব শ্রেণির শিশু এই ভয়াল নেশার ফাঁদে আটকা পড়েছে। এটি থেকে তারা বের হতে পারছে না। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আতোয়ার রহমান বলেন, 'বাংলাদেশে কতো শিশু মাদকাসক্ত, এর পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে পথশিশুদের মাদকাসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনতে অধিদফতরে শিশুদের আলাদা একটি ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সেখানে তাদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার কাজ চলছে। 

তিনি বলেন, শিশুরা যাতে ড্যান্ডি ব্যবহার না করে, সে জন্য একটি আইন করার প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন প্রণয়নের পর যারা এগুলো মাদক হিসেবে ব্যবহার করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া সীসাকে মাদকদ্রব্য হিসেবে গণ্য করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এখনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি বলেও জানান আতোয়ার রহমান।

No comments:

Post a Comment