৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু
'তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে'
মিল্টন বিশ্বাস
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে 'বাংলাদেশ' উত্থানের পেছনে একাত্তরের মার্চ থেকে জেগে ওঠা বিদ্রোহী বাংলার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। ৩ মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসমাবেশে 'স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ' করা হয়। সেখানে স্পষ্ট উচ্চারণে বলা হয়—'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক।' স্বাধীন বাংলার মহান নেতা হিসেবে স্বীকৃত বঙ্গবন্ধুকে এদেশের জনগোষ্ঠী কেবল নয়, বিদেশি শাসকসহ পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা উপেক্ষা করতে সাহস দেখায়নি। বরং জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন দেখে এই মহান নেতার দ্বারস্থ হয়েছে বারবার। কারণ, মার্চের প্রথম দিন থেকেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো দেশ চলতে শুরু করেছিল।
মূলত বঙ্গবন্ধুর একাত্তরের মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ই মার্চের ভাষণই মানুষকে নতুন এক স্বপ্নে আন্দোলিত করে। জাগরণ ও শিহরণে উদ্দীপিত মানুষ মুক্তির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে উত্সাহী হয়। জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান বঙ্গবন্ধু। সেই দাবি সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় তিনি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং তাঁর কথামতো চলতে নির্দেশ দেন। ফলে, সাধারণ রিকশাওয়ালা, পিওন, চাপরাশি থেকে দেশের প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত তাঁর নির্দেশ মান্য করা শুরু করেন। সেই মার্চ মাসেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি বিএ সিদ্দিকী জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকার করেন। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেতারে সম্প্রচার করতে না দেওয়ায় বেতার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনুষ্ঠান বন্ধ করে বেতার ভবন ছেড়ে চলে আসেন। পরদিন ৮ মার্চ সকালে বেতার ও টেলিভিশনে ভাষণ প্রচার করার অঙ্গীকার করার পরই পুনরায় তারা কাজে যোগদান করেন।
পহেলা মার্চে ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন—'লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।' তিনি ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল পালনের আহ্বান জানান। ২ মার্চ হরতাল পালনের সময় সেনাবাহিনীর গুলিতে ৬ জন নিহত ও অর্ধশত আহত হলে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সে রাতেই ৭ই মার্চ পর্যন্ত কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং জনগণকে কয়েকটি নির্দেশ দেন। ৫টি নির্দেশের মধ্যে ৬ মার্চ পর্যন্ত সর্বত্রই হরতাল এবং রেডিও-টেলিভিশন বা সংবাদপত্রসমূহ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য বা বিবৃতি পেশ না করলে সেইসব প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত সকল বাঙালিকে সরকারি প্রশাসনকে অসহযোগিতা করতে বলেন তিনি। ৭ই মার্চ বিকালে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথাও জানান তিনি। ৩ মার্চ স্বাধীনতার
ইশতেহার পাঠের জনসভায় বঙ্গবন্ধু ৪ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে পল্টনে সেদিন 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' সংগীতকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা রেখে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু সামরিক জান্তাকে সকল প্রকার খাজনা-কর না দেওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন—'আমার হুকুম ছাড়া কেউ কিছু করতে পারবে না।' তিনি কোর্ট-কাচারি, অফিস-আদালত, রেল, স্টিমার ও পিআইএ বিমানে কর্মরতদের কাজে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিব সেসময়ের পূর্বপাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন বসাবে বলে ৬ মার্চ ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে সকাতর মিনতি জানিয়ে ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরদিন ৭ই মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট ঘোষণা ও নির্দেশনা তাঁকে মুকুটহীন সম্রাটের উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত করে।
৭ই মার্চের ভাষণের পর সারাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে; আর ৮ মার্চ থেকে ৭টি সেনানিবাস বাদে বঙ্গবন্ধুর শাসন সমগ্র প্রদেশে বিস্তার লাভ করে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের শাসন সংহত করার জন্য ৩১টির ওপর নির্দেশ জারি করা হয়। নির্দেশাবলি সমাজের সর্বস্তরে যথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অফিস-আদালত, কলকারখানা, রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ, রেডিও-টিভি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর বাসভবন থেকে প্রাদেশিক সরকারের কাজ চলছিল। মূলত বঙ্গবন্ধু সরকারের নিয়ন্ত্রণ দখল করেছিলেন। বাস্তবে একটি সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শাসকের প্রতি একে একে আনুগত্য প্রকাশের পালা শুরু হয়। রেডিও-টিভির পর কারাগার কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ প্রধান আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে। ১২ মার্চ সকল সিএসপি ও ইপিসিএস অফিসাররা বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন ঘোষণা করেন এবং আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের কাছ থেকে নির্দেশ গ্রহণের ইচ্ছার কথা জানান। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে খাজনা-ট্যাক্স বর্জন এবং অন্যান্য কর্মসূচিসহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশব্যাপী সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত দেশের মানুষের কাছে খুবই যথার্থ ছিল। ১২ মার্চ লন্ডনের 'ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড' পত্রিকায় বলা হয়, জনগণের পূর্ণ আস্থাভাজন শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত শাসনকর্তা বলে মনে হয়। সরকারি অফিসার, রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার, শিল্পপতি এবং অন্যান্য মহলের লোকজন তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়ে ভিড় জমাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মিলিটারি ব্যারাক ও সৈন্যবেষ্টিত বিমানবন্দরের ওপর ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের কর্তৃত্ব রয়েছে বলে মনে হয়। ১৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতির মাধ্যমে হরতাল অব্যাহত রাখাসহ ৩৫টি নির্দেশ জারি করেন। এই নির্দেশের মধ্য দিয়ে তাঁর সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণের সকল দিক সম্পন্ন হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৫ মার্চ ঢাকা এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে প্রহসন চালাতে থাকে। অন্যদিকে হানাদাররা ২৫ মার্চ এদেশের মানুষের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলে। এরই মধ্যে ২১ মার্চ ভুট্টোর ঢাকায় আগমন, ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের প্রতিরোধ দিবস পালন, ২৪ মার্চ শাসনতান্ত্রিক কনভেনশনের প্রস্তাব প্রদান, ২৫ মার্চ ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগ সবই বঙ্গবন্ধুর কর্তৃত্বের বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে। ২৩ মার্চ নিজের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে প্রেসিডেন্ট হাইজে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর সেই কর্তৃত্বেরই অংশ ছিল। সেসময় মুজিবের নির্দেশ ছিল বাইবেলের বাণীর মতোই পবিত্র। পহেলা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত অসহযোগসহ অন্যান্য কর্মসূচি শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৭১-এর মার্চ মাসে এসে সেই মুকুটহীন সম্রাট জনগণের প্রিয় শাসকে পরিণত হলেন এবং দেশ চলতে আরম্ভ করল তাঁরই নির্দেশে।

No comments:
Post a Comment