শোকগ্রস্ত রবীন্দ্রনাথ
মুজতবা আলী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সরাসরি ছাত্র। পূর্ববঙ্গের অল্প যে-কজন গুণী লেখক রবীন্দ্রনাথকে কাছ থেকে দেখার এবং তার স্নেহ অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন মুজতবা আলী তাদের অন্যতম। লেখক এবং ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তিনি একাধিক লেখা লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলেছেনও তিনি বিভিন্ন সময় ভারত ও বাংলাদেশের বেতার-কথন-এ । সদালাপী, আড্ডাপ্রিয় ও সুগভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী মুজতবা আলীর ৭২/৭৩ সালে ধারণকৃত রবীন্দ্রনাথ-সম্পর্কিত একটি বেতার-কথনের অডিও সংরক্ষিত হয়েছিলো যা তার ছেলে সৈয়দ জগলূল আলী ইন্টারনেটে বছর দুয়েক আগে আপলোড করেছিলেন। খুব সম্ভবত এটি বাংলাদেশ বেতারে দেয়া একটি বেতার-কথন; রবীন্দ্রনাথের জন্ম বা মৃত্যুদিবসে প্রচারের জন্য। মুজতবা আলীর এই বেতার-কথনটি রবীন্দ্রনাথকে আরেকটু অন্তরঙ্গভাবে বুঝার জন্য খুব জরুরী। বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এর আর্টস বিভাগের পাঠকদের জন্য এই বিরল বেতার-কথনটির শ্রুতিলিপি উপস্থাপন করা হলো। মুজতবা আলীর বাচনভঙ্গীকে হুবহু অনুসরণ করার কারণে দু এক জায়গায় যোগসূত্রহীন মনে হতে পারে, তবে পরের বাক্যগুলোয় পৌঁছামাত্র পাঠক সেই সংযোগটি আবিস্কারে কোনো বাধার সম্মুখীন হবেন বলে মনে হয় না । শ্রুতিলিপির সঙ্গে মূল অডিও সংস্করণটি এখানে যুক্ত হলো পাঠকদের কৌতূহলের কথা বিবেচনা করে। লেখার শিরোনামটি আমাদের নির্বাচিত। বি. স.
মৃত্যুর স্মরণে দেশের লোক শোকাতুর হয়। তাই সেদিন তিনি(রবীন্দ্রনাথ) কী কী শোক পেয়েছিলেন, সে নিয়ে বড় একটা আলোচনা হয় না। তার জন্য অন্য কোনো একটা দিন বেছে নিতে হয়। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের ধারণা, বড় লোকের ছেলে ছিলেন, জমিদারি ছিল, টাকা-পয়সার অভাব ছিল না। কিন্তু তিনি যে কতখানি শোক পেয়েছিলেন, সেটা সাধারণে সন্ধান বড় একটা নেয় না।
বৃদ্ধ বয়সে মারা যাওয়ার কিছুদিন পূর্বে তিনি ‘সভ্যতার সঙ্কট’ নাম দিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখলেন। কোন এক ইংরেজকে, কংগ্রেসকে, গান্ধিজিকে নিয়ে কড়া কড়া মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন। এরা তখন জেলে ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তখন সেটা লিখলেন। বলা উচিত তিনি ডিকটেট করলেন। কারণ লেখবার ক্ষমতা তার বিশেষ ছিল না। তাতে তিনি সেই ইংরেজকে এমন চুটিয়ে গালাগাল দিলেন, শেষটায় একজন ভীত হয়ে বললেন, “গুরুদেব, এটা কি ছাপানো ঠিক হবে? যদি ইংরেজ গোলমাল করে?”
ওরা ধরেটরে জেলে পুরে দেয় আর কি!
রবীন্দ্রনাথ তখন বললেন, “দেখ, আমি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি। আমার পিতা ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ধর্ম সংস্কার করেছিলেন। আমি বিশ্বকবি, নোবেল প্রাইজ পেয়েছি। দেশ-বিদেশে সম্মান পেয়েছি। এখন আমাকে ইংরেজ যদি জেলে পোরে, আর আমি যদি মরে যাই–মরব নিশ্চয়– তখন কী হবে? Martyr(শহীদ) হয়ে মরব। এতগুলো সম্মানের উপরে A great poet then passed away is a martyr in a tiny sell of British prison. এই যে Luxury, সেটা কি ইংরেজ আমাকে Indulge করতে দেবে? তা দেবে না। ইংরেজ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে না। কাজেই এখানে রবীন্দ্রনাথ তার শোকের দিকটা বলতেন না। কিন্তু কবিতা পড়লে এবং একটুখানি খেয়াল রাখলে বোঝা যায়, কতখানি শোক ভদ্রলোক পেয়েছিল। আমি এগুলো বলছি না, তাঁর পিতা গত হলেন, তিনি তো বৃদ্ধ বয়সে মারা গেছেন, বড় বাবু গত হলেন,–যিনি তার কুড়ি বছরের বড়– তার মৃতু তো আগেই হবে। আমি বলছি অকাল মৃত্যু যেগুলো।
প্রথমেই একটা মৃত্যু—আমি একটু ছুঁয়ে যাচ্ছি–যেটা আত্মহত্যা ছিল। যেই মহিলা রবীন্দ্রনাথকে প্রথম বয়সে কবিতা লিখতেও অনুপ্রাণিত করেছিলেন। যার উতসাহ পেয়ে রবীন্দ্রনাথ নতুন নতুন করে চেষ্টা করেছিলেন। সেই মহিলা আত্মহত্যা করেন। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন খুব কম। এই একুশ– এ রকমই হবে।
তারপর অনেক বছর চলে গেছে। খুব বেশিদিন বলা উচিত নয়। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী অসুখে পড়লেন। রবীন্দ্রনাথ ভয়ঙ্কর সেবা করেছিলেন তাঁর। কারণ ঠাকুরবাড়ির যারা বুড়োবুড়ি, তাদের মুখে আমি শুনেছি, সেই সময় শুধু রাত জেগে পাখা করতেন। তখন শান্তিনিকেতনে ইলেকট্রিক ফ্যান ছিল না। আর উনি বারবার বলতেন, তুমি শুয়ে পড়ো, তুমি শুয়ে পড়ো। আমায় বলেছিলেন যে কোনো নারী তার স্বামীর এ রকম সেবা কখনও পায়নি।
রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৪০। তাঁর স্ত্রীর বয়স ২৯-এর মতো হবে। এরপর এক বছর যেতে না যেতে তাঁর ১৩ বছরের মেয়েটি; তাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন স্ত্রীর চাপে, রানি তার নাম। তার হল যক্ষা। রবীন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে আলমোড়ায় গেলেন।
রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৪০। তাঁর স্ত্রীর বয়স ২৯-এর মতো হবে। এরপর এক বছর যেতে না যেতে তাঁর ১৩ বছরের মেয়েটি; তাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন স্ত্রীর চাপে, রানি তার নাম। তার হল যক্ষা। রবীন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে আলমোড়ায় গেলেন।
এটা মনে রাখবেন, পরে আরেকটি মৃত্যুতে এই যক্ষাটা আসবে। যক্ষা ওই পরিবারে লেগেই আছে। সেখানে বেচারি অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। বলল, বাবা ওকে কলকাতায় নিয়ে যাও, কলকাতায় নিয়ে যাও। তাই রবীন্দ্রনাথ অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে কলকাতায় নিয়ে গেলেন। এই যে মেয়েটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ– সেই মেয়েটি কিন্তু কবিতা লিখেন। সেখানে কিন্তু স্বামী-স্ত্রী আছে, ওই বিনুর বয়স যখন, ওষুধে ডাক্তারে—“ব্যাধির চেয়ে আধিই হলো বড়ো”, সেই বিনু যাচ্ছে সোয়ামির সঙ্গে। তখন (ডাক্তার) বললেন, “হাওয়া বদল কর।” ডাক্তাররা প্রথমে বলে না হাওয়া বদলের কথা। তা বললে ওরা টাকা পাবে কোথায়। বেশকিছু রক্ত চুষে যখন আর কিছু থাকে না তখন বলে হাওয়া বদল কর।
সেই সুযোগে বিনু প্রথম চড়ল রেলগাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদিতে। এটা পলাতকায়পাবেন। পলাতকায় -র প্রায় প্রত্যেকটি কবিতাই তার আত্মীয় স্বজন, কারও না কারও, মৃত্যু নিয়ে লেখা। কলকাতায় ফিরে আসার এক মাসের মধ্যে মেয়েটি মারা গেল। তের বছর বয়সে। তার ২-৩ বছরও পেরোয়নি। তার একটা ছেলে ছিল সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সে গিফটেড ছিল।
আজকালকার দিনে আমরা বর্ষা-মঙ্গল অথবা বসন্ত উৎসব করি এগুলো সৌমেন্দ্রনাথ প্রথম করেছিল। রবীন্দ্রনাথ অনেকগুলো বর্ষার গান রচনা করেছিলেন। বর্ষার শেষে সৌমেন্দ্র তার বাবাকে বলেছিলেন এইসব গান একত্র করে একটা উৎসব করা যায় না? ঐ থেকে বর্ষা মঙ্গল ও বসন্ত উৎসব শুরু হল। এগুলোর পেছনে রয়েছে সৌমেন্দ্রনাথ।
তা গরমের ছুটি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় যাচ্ছেন। সে বলল, তার এক বন্ধুর সঙ্গে ভাগলপুর যাবে। ভাগলপুর যাওয়ার দিন সাতেক পরে রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পেলেন সৌমেনের কলেরা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছুটলেন। গিয়ে যেদিন পৌঁছালেন, সকালবেলা, শুনলেন তার দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তা গরমের ছুটি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় যাচ্ছেন। সে বলল, তার এক বন্ধুর সঙ্গে ভাগলপুর যাবে। ভাগলপুর যাওয়ার দিন সাতেক পরে রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পেলেন সৌমেনের কলেরা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছুটলেন। গিয়ে যেদিন পৌঁছালেন, সকালবেলা, শুনলেন তার দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ বিকেলের ট্রেনে শান্তিনিকেতন রওয়ানা হলেন। শান্তিনিকেতন বোলপুর স্টেশন থেকে মাইল দেড়েক। এখন অনেক বাইবদ্দর হয়ে গেছে, তখন ফাঁকা ছিলো। আমার ছেলেবেলাতে ফাঁকা ছিল। সেখানে ক্ষিতিমোহন সেন , বিধূশেখর শাস্ত্রী, তার কলিগরা এসেছেন তাকে নিয়ে যেতে। তারা ভেবেছেন, সৌমেনকে নিয়ে আসছেন। তারা জানতেন না যে সৌমেনের কলেরা হয়েছে এবং উনি কলকাতা থেকে গেছেন। একজন জিজ্ঞেস করলেন সৌমেন কোথায়?
রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিলেন না। তিনি হাঁটতে আরম্ভ করলেন। খুব জোছনা রাত্তির ছিল। হেঁটে হেঁটে শান্তিনিকেতনে এলেন। দোতলার সে বাড়িটা, তার উপরের তলায় রবীন্দ্রনাথ থাকতেন। সেটা মন্দিরের ঠিক কাছেই। তো উঠবার সময় পেছনে তাকিয়ে বললেন, সৌমেনকে রেখে এসেছি।

তখন এরা বুঝলেন। রবীন্দ্রনাথের দুই ছেলে আর তিন মেয়ে। এর কয়েক বছর পরই বড় মেয়ে মাধুরীলতা, তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল– তার হল আবার সেই যক্ষা। প্রভাত মুখুজ্যে তার বইয়ে(রবীন্দ্রজীবনী)ব্যাপারটা চেপে গেছেন: জামাইয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের খুব ভালো বনিবনা ছিল না। কাজেই জামাই যখন প্রাকটিস করতে চলে যেত হাইকোর্টে, তখন তিনি (রবীন্দ্রনাথ) পালকি গাড়িতে চড়ে মেয়ের বাড়িতে যেতেন, যাতে পাড়ার লোকে তাকে দেখতে না পায়। দুপুরবেলা বসে গায়ে পাখা করতেন, আর নানা রকম গালগল্প করতেন। এই মেয়ে মাধুরীলতা, ডাক নাম বেলা—বাঙালদের বলে দেয়া উচিৎ, আমি্ও বাঙাল, ‘বেলা’ হচ্ছে Time, আরেক ‘বেলা’– বেলাভূমি, অর্থাৎ তটভুমি, বেলফুলকেও বেলা বলে। ও গল্প শুনতে খুব ভালোবাসত। আর রবীন্দ্রনাথের এই গুণটাও ছিল যাকে বলে ফরাসীতে Raconter, মানে story tell । তখন তাকে (বেলাকে) গল্প বলে যেতেন। পরে সেগুলো কখনো গল্পগুচ্ছ-এ, আর ২-১টা বোধহয় পলাতকায় ঢুকেছে। সেগুলো আমি pin down করতে পারিনি কার উদ্দেশ্যে এগুলো লেখা।

তখন এরা বুঝলেন। রবীন্দ্রনাথের দুই ছেলে আর তিন মেয়ে। এর কয়েক বছর পরই বড় মেয়ে মাধুরীলতা, তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল– তার হল আবার সেই যক্ষা। প্রভাত মুখুজ্যে তার বইয়ে(রবীন্দ্রজীবনী)ব্যাপারটা চেপে গেছেন: জামাইয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের খুব ভালো বনিবনা ছিল না। কাজেই জামাই যখন প্রাকটিস করতে চলে যেত হাইকোর্টে, তখন তিনি (রবীন্দ্রনাথ) পালকি গাড়িতে চড়ে মেয়ের বাড়িতে যেতেন, যাতে পাড়ার লোকে তাকে দেখতে না পায়। দুপুরবেলা বসে গায়ে পাখা করতেন, আর নানা রকম গালগল্প করতেন। এই মেয়ে মাধুরীলতা, ডাক নাম বেলা—বাঙালদের বলে দেয়া উচিৎ, আমি্ও বাঙাল, ‘বেলা’ হচ্ছে Time, আরেক ‘বেলা’– বেলাভূমি, অর্থাৎ তটভুমি, বেলফুলকেও বেলা বলে। ও গল্প শুনতে খুব ভালোবাসত। আর রবীন্দ্রনাথের এই গুণটাও ছিল যাকে বলে ফরাসীতে Raconter, মানে story tell । তখন তাকে (বেলাকে) গল্প বলে যেতেন। পরে সেগুলো কখনো গল্পগুচ্ছ-এ, আর ২-১টা বোধহয় পলাতকায় ঢুকেছে। সেগুলো আমি pin down করতে পারিনি কার উদ্দেশ্যে এগুলো লেখা।
একদিন ও রকম দুপুরবেলায় গাড়ি এসে দাঁড়াতেই চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলেন। বুঝে গেলেন, মারা গেছে। (গাড়ি থেকে) নামেননি তিনি। গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি চলে এলেন। সেদিন বিকেলে, বিচিত্রা নামে তাদের একটি ক্লাব ছিল, সেখানে যথারীতি রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত হলেন। নিতান্ত আপন দুয়েকজন মাত্র জানত যে মেয়েটি মারা গেছে সকালবেলা।
তারপর আরও শোক ছিল কপালে। তো রইলেন শেষ পর্যন্ত রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তার বড় ছেলে আর মীরা দেবী। এরপর আরেকটি শোক পেলেন, সেটা মৃত্যু ঘটিত নয়, সেটা হচ্ছে, তাঁর মেয়ের সঙ্গে স্বামীর বনল না। সে (মেয়েটি) ১ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে চলে এলেন। সেই শোক তিনি গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। কিন্তু প্রকাশ করেননি।
এরপর রথীন্দ্রনাথ বিয়ে করলেন। ২-৩ বছর পর বোঝা গেল যে ওর কোনো ছেলেপুলে হবে না। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের যে বংশরক্ষা হবে না তখন তিনি জানতে পারলেন। এবং কবি বা যে কোনো হিসেবে হোক, তিনি চেয়েছিলেন যে তাঁর ছেলেপুলে অর্থাৎ তাঁর ভাইদের তার মতো তাঁরও নাতিপুতি হোক।
এরপর রথীন্দ্রনাথ বিয়ে করলেন। ২-৩ বছর পর বোঝা গেল যে ওর কোনো ছেলেপুলে হবে না। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের যে বংশরক্ষা হবে না তখন তিনি জানতে পারলেন। এবং কবি বা যে কোনো হিসেবে হোক, তিনি চেয়েছিলেন যে তাঁর ছেলেপুলে অর্থাৎ তাঁর ভাইদের তার মতো তাঁরও নাতিপুতি হোক।
শেষ পর্যন্ত প্রথম গেলেন তাঁর স্ত্রী, তার কিছুদিনের মধ্যে একটি মেয়ে তারপরে গেল একটি ছেলে, তারপরে গেল আরেকটি মেয়ে, তারপরে গেল একটি ছেলে, তারপরে গেল আরেকটি মেয়ে, সবাই অল্প বয়সে গেল। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে ছিলেন ৮১ বছর। এরা যদি ৫০ বছরেও মরত, তাহলেও একটা কথা ছিল। কিন্তু কেউ ১৩, কেউ ১৪, কেউ ১২– এ রকম পটপট পটপট করে মরে গেল। আর মীরা দেবী ফিরে এলেন ১টি ছেলে ও ১টি মেয়ে নিয়ে। আর মীরা দেবীর এই ছেলেটির মৃত্যুশোক সবচেয়ে গভীরভাবে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি আশা করেছিলেন, আমাদের হযরতের মতো, যে এই মেয়ের ছেলে– তার বংশ রক্ষা করবে।
কিন্তু সেও মারা গেল জার্মানিতে গিয়ে। তিনি ছিলেন প্রশান্ত মহালনবিশের বাড়িতে। তারা সকালে খবরের কাগজে খুলে দেখে–বয়টার্সের একটি টেলিগ্রাম– খবর বেরোল Tagore’s grandson dies in Blackforest, Germany. কী করে খবর ভাঙা যায়? রথীন্দ্রনাথ ছিলেন কাছেই গঙ্গাতে একটা বোটে, তাঁকে খবর দেওয়া হল। তিনি এলেন তাঁর স্ত্রী প্রতিমা দেবীকে নিয়ে। একসঙ্গে সবাই ঘরে ঢুকেছে, রবীন্দ্রনাথ তবু কোনো সন্দেহ করেননি। তিনি এমনিতেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন এই নাতিকে নিয়ে। এন্ড্রু সাহেব বিলেতে ছিলেন, তাকে টেলিগ্রাম করে পাঠিয়েছিলেন। জার্মানিতে বিস্তর বন্ধু-বান্ধব ছিল। ওরা ঢুকতেই জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ”হে রে রথী, নিতুর কিছু খবর পেয়েছিস?”
তখন রথী বাবু বললেন, “ভালো না।”
রথী বাবু তখন বললেন, “ভালো না।” রবীন্দ্রনাথ তখন একটু খাটো হয়ে গিয়েছিলেন কানে। ‘না’ শব্দটা শুনতে পাননি। ‘ভালো’ শুনেছেন। উৎসাহিত হয়ে বললেন, “ দেখ, এবার সে সেরে উঠলেই তাকে নিয়ে আসব দেশে। আমি তোদের কারও কোনো কথা শুনব না। আমি তাকে সোজা পাঠিয়ে দেব হিমালয়ে। এক্কেবারে শরীর না সারা পর্যন্ত আমি আনব না।” সেই রানীকে নিয়ে গিয়েছিলেন—সেটা তখনও মনের ভিতরে ঘুরছে। “খুব ভালো ডাক্তার নিয়ে, বুঝেছিস রথী, তোকেও কিন্তু যেতে হবে আমার সাথে।”
প্লান করতে আরম্ভ করেছিলেন।
রথীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত না পেরে বললেন, “খবর ভালো না। তার এসেছে।”
রবীন্দ্রনাথ চুপ করে গেলেন। তিনি দু-তিনবার কেঁদেছিলেন জীবনে । তার কান্নাটা ছিল অদ্ভুত। তিনি চুপ করে থাকতেন। হঠাৎ কলকল করে জল নেমে আসত। তিনি চেষ্টা করতেন আটকাবার।
তিনি বললেন, “বুড়ি একা রয়েছে সেখানে (নিতুর ছোটবোনকে রবীন্দ্রনাথ বুড়ি বলে ডাকতেন) । তোরা যা, আমি পড়ে যাব।” না, বোধহয় (বলেছিলেন) “বৌমা যান, আমি যাচ্ছি পরে।”
সেই রাত্রে তিনি দুটো কবিতা লিখেছিলেন।
দুই বছর পর তা ছাপিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন–
বিজু যখন চলে গেল মরণপারের দেশে
বাপের বাহুর বাঁধন কেটে।
মনে হল আমার ঘরের সকাল যেন মরেছে বুক ফেটে।
তখন রথী বাবু বললেন, “ভালো না।”
রথী বাবু তখন বললেন, “ভালো না।” রবীন্দ্রনাথ তখন একটু খাটো হয়ে গিয়েছিলেন কানে। ‘না’ শব্দটা শুনতে পাননি। ‘ভালো’ শুনেছেন। উৎসাহিত হয়ে বললেন, “ দেখ, এবার সে সেরে উঠলেই তাকে নিয়ে আসব দেশে। আমি তোদের কারও কোনো কথা শুনব না। আমি তাকে সোজা পাঠিয়ে দেব হিমালয়ে। এক্কেবারে শরীর না সারা পর্যন্ত আমি আনব না।” সেই রানীকে নিয়ে গিয়েছিলেন—সেটা তখনও মনের ভিতরে ঘুরছে। “খুব ভালো ডাক্তার নিয়ে, বুঝেছিস রথী, তোকেও কিন্তু যেতে হবে আমার সাথে।”
প্লান করতে আরম্ভ করেছিলেন।
রথীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত না পেরে বললেন, “খবর ভালো না। তার এসেছে।”
রবীন্দ্রনাথ চুপ করে গেলেন। তিনি দু-তিনবার কেঁদেছিলেন জীবনে । তার কান্নাটা ছিল অদ্ভুত। তিনি চুপ করে থাকতেন। হঠাৎ কলকল করে জল নেমে আসত। তিনি চেষ্টা করতেন আটকাবার।
তিনি বললেন, “বুড়ি একা রয়েছে সেখানে (নিতুর ছোটবোনকে রবীন্দ্রনাথ বুড়ি বলে ডাকতেন) । তোরা যা, আমি পড়ে যাব।” না, বোধহয় (বলেছিলেন) “বৌমা যান, আমি যাচ্ছি পরে।”
সেই রাত্রে তিনি দুটো কবিতা লিখেছিলেন।
দুই বছর পর তা ছাপিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন–
বিজু যখন চলে গেল মরণপারের দেশে
বাপের বাহুর বাঁধন কেটে।
মনে হল আমার ঘরের সকাল যেন মরেছে বুক ফেটে।
এই নাতি যখন গেল, তখন তিনি যে কবিতাটা লিখেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত পীড়াদায়ক। বলা যেতে পারে, ভগবানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস তখন শিথিল হয়ে আসছে।
তুমি স্থির সীমাহীন নৈরাশ্যের তীরে
নির্বাক অপার নির্বাসনে
অশ্রুহীন তোমার নয়নে
অবিশ্রাম প্রশ্ন জাগে যেন– কেন, ওগো কেন?
অর্থাৎ এত অল্প বয়সে মানুষ মরেন কেন? আর কবিত্বের বাহার দেখিয়েছিলেন, সেতো আপনারা জানেন,
যখন সত্যেন দত্ত মারা গেলেন, তখন লিখলেন–
নিয়ে যাব ইহার উত্তর
নিজ হাতে করে আমি ওই খেয়া-’পরে করি ভর–
না জানি সে কোন্ শান্ত শিউলি-ঝরার শুক্লরাতে,
দক্ষিণের দোলা-লাগা পাখি-জাগা বসন্তপ্রভাতে,
নবমল্লিকার কোন্ আমন্ত্রণ-দিনে, শ্রাবণের
ঝিল্লিমন্দ্রসঘন সন্ধ্যায়, মুখরিত প্লাবনের
অশান্ত নিশীথ রাত্রে, হেমন্তের দিনান্তবেলায়
কুহেলী গুণ্ঠনতলে।
তুমি স্থির সীমাহীন নৈরাশ্যের তীরে
নির্বাক অপার নির্বাসনে
অশ্রুহীন তোমার নয়নে
অবিশ্রাম প্রশ্ন জাগে যেন– কেন, ওগো কেন?
অর্থাৎ এত অল্প বয়সে মানুষ মরেন কেন? আর কবিত্বের বাহার দেখিয়েছিলেন, সেতো আপনারা জানেন,
যখন সত্যেন দত্ত মারা গেলেন, তখন লিখলেন–
নিয়ে যাব ইহার উত্তর
নিজ হাতে করে আমি ওই খেয়া-’পরে করি ভর–
না জানি সে কোন্ শান্ত শিউলি-ঝরার শুক্লরাতে,
দক্ষিণের দোলা-লাগা পাখি-জাগা বসন্তপ্রভাতে,
নবমল্লিকার কোন্ আমন্ত্রণ-দিনে, শ্রাবণের
ঝিল্লিমন্দ্রসঘন সন্ধ্যায়, মুখরিত প্লাবনের
অশান্ত নিশীথ রাত্রে, হেমন্তের দিনান্তবেলায়
কুহেলী গুণ্ঠনতলে।
ষড় ঋতুর বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ ওই এক জায়গায়-ই করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ অনেক রকমের কবিতা লিখেছেন, সে তো সবাই জানে। সোজা কবিতাগুনো– কথা ও কাহিনি–এসব দিয়ে ছেলেপুদের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা আছে, যেগুনোর কিছুটা ব্যাকগ্রাউন্ড জানা না থাকলে বুঝতে অসুবিধা হয়। সবসময় যে প্রয়োজন তা নয়।
আমি এক জায়গায় বলেওছি, রবীন্দ্রনাথ বসেছিলেন, চাকর সরবত নিয়ে এসেছে, আরেক ভদ্রলোককে দেখে থতমত খেয়ে গেলেন, যে আরেক গ্লাস নিয়ে আসবে না কী করবে! তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন, “ওগো বনমালী, দ্বিধা কেন?”
এই ‘দ্বিধা কেন’ কথাটি তার ভালো লাগলো মনে । ওই রাতে তিনি একটি গান রচনা করলেন–
হে মাধবী, দ্বিধা কেন, আসিবে কি ফিরিবে কি–
আঙিনাতে বাহিরিতে মন কেন গেল ঠেকি॥
আমার স্মৃতিশক্তি একটু ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
তো তার এমন কিছু গান কবিতা আছে, যেগুলোর ভাষা জানা দরকার, অ্যাস্ট্রোনমি জানা দরকার।
এই সেদিন একটি ছেলে এসেছিল আমার কাছে। বললে, “এই লাইনগুলোর মানে কী?”
সাধারণত আমাদের মাস্টারমশায়রা, I am one of them(আমিও তাদের একজন)– কবিতায় যেখানে ভালো বুঝতে পারি না, বলে, আরে এ তো কবিমানুষ লিখেছে। তাদের মধ্যে কি সবসময় তিন আর দুয়ে পাঁচ, সোমবারের পর মঙ্গলবার আসে, ওই Exactitude আশা কর কেন? কিন্তু সে রকম Obscure জিনিস খুবই কম রবীন্দ্রনাথে। আমি একটি কবিতার কথা বলছি।
যে লাইনটি নিয়ে ওই ছেলেটি এসেছিল। সেটি ছিল–
ওরে, এতক্ষণে বুঝি
তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথে পথ খুঁজি খুঁজি
গেছে সাত-ভাই চম্পা; কেতকীর রেণুতে রেণুতে
বেজেছে থিতুর গান; দিগ্বধূর বেণুতে বেণুতে।
ওই ‘তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথের পথ খুঁজি খুঁজি গেছে সাত ভাই চম্পা।’–আকাশগঙ্গা, যেটাকে বলে, ছায়াপথ, ইংরেজিতে যাকে বলে মিল্কিওয়ে। আমাদের সংস্কৃতে বলা হয়, গঙ্গা ধেয়ে গেছে আকাশের উপর দিয়ে। এটাই আকাশগঙ্গা। আপনারা যারা আবদুল জব্বার সাহেবের তারা পরিচিতি পড়েছেন– ওই রকম বই হয় না, ওয়ান্ডারফুল বই। তারাদের পুরো বর্ণনা পাবেন। সেই তারা-ঝরা নির্ঝর, তার পেছনেই রয়েছে কৃত্তিকা নক্ষত্র। ওই ছয়টি নক্ষত্র সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আকাশে। সেটিকে দিশি ভাষায় বলে সাতভাই চম্পা। আবার সাতভাইও বলে, সাত ভায়রাও বলে। ইংরিজিতে সিক্স সিস্টার্স। সংস্কৃতে কৃত্তিকা। গ্রিকে পিলেট এবং আরবিতে বলে সুরাইয়া, আমানুল্লাহ বাদশার বউয়ের নাম। ‘ওরে এতক্ষণে বুঝি তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথে পথ খুঁজি খুঁজি গেছে সাতভাই চম্পা।” ঠিক আকাশগঙ্গার পেছনেই থাকে কৃত্তিকাটা শরৎকালে। এবং সেটা তখন অাকাশগঙ্গার দিকে চলে। সেই জন্যে বলেছেন, “ ওরে এতক্ষণে বুঝি তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথ”—এটা হলো আকাশগঙ্গার poetic translation. “…তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথে পথ খুঁজি খুঁজি গেছে সাতভাই চম্পা।” ঠিক তার পেছনে দেখা যায় সাত ভাই চম্পা—কৃত্তিকা নক্ষত্র আর তার পেছনেই থাকে,–আরবীতে যেটাকে বলে আল জাব্রান, সে তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছে কৃত্তিকাকে, কৃত্তিকা তখন ছুটে যাচ্ছে ঐ আকাশগঙ্গায় আশ্রয় নেবে বলে।
ওই ‘সাতভাই চম্পা’ জানা না থাকলে, ‘নির্ঝরের স্রোতঃপথে’র মানে বোঝা যাবে না। কিন্তু তার চাইতেও
আরেকটি কবিতা আমি নিচ্ছি, সেটা গানই এবং গানটাতে আছে–
তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার কত রঙে রঙ-করা।
মোর সাথে ছিল দুখের ফলের ভার অশ্রুর রসে ভরা ॥
সহসা আসিল, কহিল সে সুন্দরী ‘এসো-না বদল করি’।
মুখপানে তার চাহিলাম, মরি মরি, নিদয়া সে মনোহরা ॥
সে লইল মোর ভরা বাদলের ডালা…”
এটা বুঝিয়ে বলছি।
আমি এক জায়গায় বলেওছি, রবীন্দ্রনাথ বসেছিলেন, চাকর সরবত নিয়ে এসেছে, আরেক ভদ্রলোককে দেখে থতমত খেয়ে গেলেন, যে আরেক গ্লাস নিয়ে আসবে না কী করবে! তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন, “ওগো বনমালী, দ্বিধা কেন?”
এই ‘দ্বিধা কেন’ কথাটি তার ভালো লাগলো মনে । ওই রাতে তিনি একটি গান রচনা করলেন–
হে মাধবী, দ্বিধা কেন, আসিবে কি ফিরিবে কি–
আঙিনাতে বাহিরিতে মন কেন গেল ঠেকি॥
আমার স্মৃতিশক্তি একটু ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
তো তার এমন কিছু গান কবিতা আছে, যেগুলোর ভাষা জানা দরকার, অ্যাস্ট্রোনমি জানা দরকার।
এই সেদিন একটি ছেলে এসেছিল আমার কাছে। বললে, “এই লাইনগুলোর মানে কী?”
সাধারণত আমাদের মাস্টারমশায়রা, I am one of them(আমিও তাদের একজন)– কবিতায় যেখানে ভালো বুঝতে পারি না, বলে, আরে এ তো কবিমানুষ লিখেছে। তাদের মধ্যে কি সবসময় তিন আর দুয়ে পাঁচ, সোমবারের পর মঙ্গলবার আসে, ওই Exactitude আশা কর কেন? কিন্তু সে রকম Obscure জিনিস খুবই কম রবীন্দ্রনাথে। আমি একটি কবিতার কথা বলছি।
যে লাইনটি নিয়ে ওই ছেলেটি এসেছিল। সেটি ছিল–
ওরে, এতক্ষণে বুঝি
তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথে পথ খুঁজি খুঁজি
গেছে সাত-ভাই চম্পা; কেতকীর রেণুতে রেণুতে
বেজেছে থিতুর গান; দিগ্বধূর বেণুতে বেণুতে।
ওই ‘তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথের পথ খুঁজি খুঁজি গেছে সাত ভাই চম্পা।’–আকাশগঙ্গা, যেটাকে বলে, ছায়াপথ, ইংরেজিতে যাকে বলে মিল্কিওয়ে। আমাদের সংস্কৃতে বলা হয়, গঙ্গা ধেয়ে গেছে আকাশের উপর দিয়ে। এটাই আকাশগঙ্গা। আপনারা যারা আবদুল জব্বার সাহেবের তারা পরিচিতি পড়েছেন– ওই রকম বই হয় না, ওয়ান্ডারফুল বই। তারাদের পুরো বর্ণনা পাবেন। সেই তারা-ঝরা নির্ঝর, তার পেছনেই রয়েছে কৃত্তিকা নক্ষত্র। ওই ছয়টি নক্ষত্র সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আকাশে। সেটিকে দিশি ভাষায় বলে সাতভাই চম্পা। আবার সাতভাইও বলে, সাত ভায়রাও বলে। ইংরিজিতে সিক্স সিস্টার্স। সংস্কৃতে কৃত্তিকা। গ্রিকে পিলেট এবং আরবিতে বলে সুরাইয়া, আমানুল্লাহ বাদশার বউয়ের নাম। ‘ওরে এতক্ষণে বুঝি তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথে পথ খুঁজি খুঁজি গেছে সাতভাই চম্পা।” ঠিক আকাশগঙ্গার পেছনেই থাকে কৃত্তিকাটা শরৎকালে। এবং সেটা তখন অাকাশগঙ্গার দিকে চলে। সেই জন্যে বলেছেন, “ ওরে এতক্ষণে বুঝি তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথ”—এটা হলো আকাশগঙ্গার poetic translation. “…তারা-ঝরা নির্ঝরের স্রোতঃপথে পথ খুঁজি খুঁজি গেছে সাতভাই চম্পা।” ঠিক তার পেছনে দেখা যায় সাত ভাই চম্পা—কৃত্তিকা নক্ষত্র আর তার পেছনেই থাকে,–আরবীতে যেটাকে বলে আল জাব্রান, সে তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছে কৃত্তিকাকে, কৃত্তিকা তখন ছুটে যাচ্ছে ঐ আকাশগঙ্গায় আশ্রয় নেবে বলে।ওই ‘সাতভাই চম্পা’ জানা না থাকলে, ‘নির্ঝরের স্রোতঃপথে’র মানে বোঝা যাবে না। কিন্তু তার চাইতেও
আরেকটি কবিতা আমি নিচ্ছি, সেটা গানই এবং গানটাতে আছে–
তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার কত রঙে রঙ-করা।
মোর সাথে ছিল দুখের ফলের ভার অশ্রুর রসে ভরা ॥
সহসা আসিল, কহিল সে সুন্দরী ‘এসো-না বদল করি’।
মুখপানে তার চাহিলাম, মরি মরি, নিদয়া সে মনোহরা ॥
সে লইল মোর ভরা বাদলের ডালা…”
এটা বুঝিয়ে বলছি।
রবীন্দ্রনাথ যখন সাউথ আমেরিকা থেকে ফিরে আসলেন, তখন স্টিমারে তাকে সি-অফ করতে এলেন বিজয়া। তার নাম ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। পূরবীবইখানা তার নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। তিনি নিয়ে এসেছিলেন ফুলের মালা। আর এসব স্টিমারে ফল কিছু রেখে যায় প্লেটে। অর্থাৎ ও বেলায় যারা স্টিমারে উঠবে, তারা ফল খাবে। এরপর লাঞ্চ হোক, ডিনার হোক তা খাবে। উনি যখন ফুলের মালা নিয়ে এলেন আর গলায় পরিয়ে দিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখন, Naturally, হন্তদন্ত হয়ে কিছু একটা দিতে চেয়েছিলেন। তখন তাকিয়ে ঐ ফল দেখতে পেয়ে তাকে একটা ফল দিলেন।
তারপর কী হয়েছিল জানা নেই। কবিতা দেখে তার বাকিটা অনুমান করা যায়।
‘তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার কত রঙে রঙ-করা’– মেয়েটি ছিলেন যুবতী। ছাব্বিশ-সাতাশ কি ও রকম বয়স তার। কাজেই ‘তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার কত রঙে রঙ-করা’ আর ‘মোর সাথে ছিল দুখের ফলের ভার অশ্রুর রসে ভরা ॥”।
তারপর কী হয়েছিল জানা নেই। কবিতা দেখে তার বাকিটা অনুমান করা যায়।
‘তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার কত রঙে রঙ-করা’– মেয়েটি ছিলেন যুবতী। ছাব্বিশ-সাতাশ কি ও রকম বয়স তার। কাজেই ‘তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার কত রঙে রঙ-করা’ আর ‘মোর সাথে ছিল দুখের ফলের ভার অশ্রুর রসে ভরা ॥”।
ওই সময় তার বয়স ষাট। কাজেই এত শোক দুঃখ পেয়েছেন, পেয়ে সমস্ত জীবন পরিপক্ক একটা ফলের মতো হযে গেছে।
সহসা আসিল, কহিল সে সুন্দরী ‘এসো-না বদল করি’।
মুখপানে তার চাহিলাম, মরি মরি, নিদয়া সে মনোহরা ॥
সে লইল মোর ভরা বাদলের ডালা, চাহিল সকৌতুকে।
আমি লয়ে তার নব ফাগুনের মালা তুলিয়া ধরিনু বুকে।
‘মোর হল জয়’ যেতে যেতে কয় হেসে, দূরে চলে গেল ত্বরা।
সন্ধ্যায় দেখি তপ্ত দিনের শেষে ফুলগুলি সব ঝরা ॥
মুখপানে তার চাহিলাম, মরি মরি, নিদয়া সে মনোহরা ॥
সে লইল মোর ভরা বাদলের ডালা, চাহিল সকৌতুকে।
আমি লয়ে তার নব ফাগুনের মালা তুলিয়া ধরিনু বুকে।
‘মোর হল জয়’ যেতে যেতে কয় হেসে, দূরে চলে গেল ত্বরা।
সন্ধ্যায় দেখি তপ্ত দিনের শেষে ফুলগুলি সব ঝরা ॥
অর্থাৎ যৌবনের যুবতী যত সৌন্দর্য নিয়ে আসুক, বৃদ্ধ বয়সে যে লোক– তার সঙ্গে যদি সৌহার্দ্য অদলবদল হয়, তাহলে যুবতীটা-ই জেতে বেশি। কারণ বৃদ্ধের যে পরিপক্ক ফল, তার যে অভিজ্ঞতা, তার দুঃখের কাহিনি– কবি যদি হয়, সে ভাষায় ভাষায় আরও আরও সুন্দর করে বলতে পারে। তখন তার ভেতরে যে বৈভব থাকে সেটা ফুলের মালাতে যতই তা তৎকালীন সৌন্দর্য হোক না কেন যতই তা তৎকালীন মাধুর্য হোক না কেন—
“হেসে, দূরে চলে গেল ত্বরা।
সন্ধ্যায় দেখি তপ্ত দিনের শেষে ফুলগুলি সব ঝরা ॥
“হেসে, দূরে চলে গেল ত্বরা।
সন্ধ্যায় দেখি তপ্ত দিনের শেষে ফুলগুলি সব ঝরা ॥
রবীন্দ্রনাথের সব কবিতা যে আমিও বুঝেছি, তা নয়। তার একটা কবিতা আছে মহুয়াতে, সেখানে আছে—“…মধ্যাহ্নে দেখলুম, দীর্ঘ লোক দীর্ঘতর ছায়া ফেলে যাচ্ছে।”
কথা হচ্ছে, মধ্যাহ্নে দীর্ঘতর ছায়া হয় কী করে! পায়ের কাছেই তা জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকে। তাহলে বলতে হয়, এ কবিতা হয়ত-বা আমিই বুঝিনি।
http://allbanglanewspapers.com/bdnews24-bangla/কথা হচ্ছে, মধ্যাহ্নে দীর্ঘতর ছায়া হয় কী করে! পায়ের কাছেই তা জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকে। তাহলে বলতে হয়, এ কবিতা হয়ত-বা আমিই বুঝিনি।
No comments:
Post a Comment