এখন শুধু লাশের অপেক্ষা
সালাহউদ্দিন ওয়াহিদ প্রীতম, মাওয়া ঘাট থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published: 2014-08-05 23:28:25.0 BdST Updated: 2014-08-05 23:29:48.0 BdST
মাওয়া ঘাটে পৌঁছাতে আর আধা ঘণ্টা লাগবে-মোবাইলে স্বামীর একথা শোনার কিছুক্ষণ পর টেলিভিশনে লঞ্চডুবির খবর। এরপর আর মেলেনি মোবাইলে সংযোগ-ছুটে আসা পদ্মা তীরে; কিন্তু আহাজারি আর বিলাপের মধ্যে দুদিন কাটলেও কোনো খোঁজ নেই প্রিয় মানুষটির।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বাসিন্দা হেমায়েত উদ্দিনের স্ত্রী হনুফা বেগমের মতো পরিস্থিতি আরো অনেকের, কোনো কিছুতেই থামছে না তাদের কান্না।
আগের দিন মাওয়া ঘাটের কাছে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চের নিখোঁজ এই স্বজনরা হয়ে পড়ছেন অসুস্থ। দুর্ঘটনার খবর শুনে কেউ ছুটে এসেছেন তাদের কেউ কেউ, কেউ নিজে তীরে আসতে পারলেও মাঝ নদীতে হারিয়েছেন স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাই বা কোনো স্বজনকে। প্রিয়জনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন তারা,মৃতদেহটাই এখন শুধু চাওয়া।
দুর্ঘটনার পরপরই মাওয়া স্পিডবোট ঘাটের কাছে প্রশাসনের অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম খোলা হয়, যেখানে নিখোঁজদের নাম লেখান তাদের স্বজনরা। সেখানে এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ১৬৯ জনের
নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন লৌহজং থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন।
মাওয়ার ঘাটের চারপাশে উদভ্রান্তের মত ছুটে বেড়াতে দেখা যায় মিলন খন্দকারকে(৩৫)। এই হাসছেন, এই কাঁদছেন, যাকে পাচ্ছেন সালাম দিচ্ছেন তিনি।
তার ভাতিজা বাদল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মিলন ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। ঈদের ছুটি কাটিয়ে স্ত্রী রেহানা (২৭)ও পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে গোপালগঞ্জের মোকসেদপুর থেকে ঢাকা ফিরছিলেন।
“এমএল পিনাক-৬ করে কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়ার পথে ছিলেন তারা। সাঁতার জানার কারণে তিনি ভেসে থাকতে পারলেও তার চোখের সামনেই স্ত্রী ও সন্তান ডুবে যায়। এরপর থেকে এই অবস্থা।”
সোমবার দুপুর থেকে বিলাপ করতে করতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন শাহনাজ বেগম(৫৫)।

ছবি:আসিফ মাহমুদ অভি /বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ছবি:আসিফ মাহমুদ অভি /বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
তার ভাগ্নে সেলিম আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ওই লঞ্চে তার একমাত্র মেয়ে রোশনা (৩০), মেয়ের স্বামী মিজানুর রহমান (৩৫) এবং নাতনি মিম (০৪)ও মিলি (০২) ছিল। লঞ্চডুবির পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের কারোরই কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। গত দুই দিন ধরে তিনি এখানেই পড়ে আছেন।
প্রথমে কোন কথা বলতে না চাইলেও পরে ধীরে ধীরে শাহনাজ বলেন, “বাবা, আমার আর কোন আশা-ভরসা নাই। এখন শুধু লাশের অপক্ষায় আছি। যদি লাশের সন্ধান পাই তাহলেই সন্তুষ্ট।”
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সৈয়দ মোহাম্মদ সাদী বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
তার ভাই নোমান জানান, স্ত্রী এবং দুই ছেলে আরব (৪) ও এনামকে (৭) নিয়ে ওই লঞ্চে করে আসছিলেন তিনি। লঞ্চ ডোবার সময় তিনজনকেই বাঁচাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সবাই স্রোতে ভেসে গেছে।
ঈদের দুদিন পর ছোট ভাইকে নিয়ে বরিশালে মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার বাসিন্দা হেমায়েত উদ্দিন (৪৯)। সোমবার পদ্মায় ডুবে যাওয়া লঞ্চে করেই কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে মাওয়ায় আসছিলেন তিনি।
স্বামী ও দেবর বাবুল মিয়কে (৩৮) খুঁজতে মাওয়ায় আসেন হেমায়েতের স্ত্রী হনুফা।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন,“সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমার স্বামী আমাকে ফোন করে জানায় মাওয়া ঘাটে নামতে আর আধা ঘন্টা লাগতে পারে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টিভিতে লঞ্চ ডুবির খবর দেখে আমার স্বামীর মোবাইলে ফোন দিয়ে বন্ধ পাই। তারপর আমরা মাওয়ায় চলে আসি। আমার স্বামী ও দেবর কোথায়?”
মাওয়া ঘাটে স্থাপিত অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পে এ পর্যন্ত আড়াইশ’র বেশি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে, যাদের প্রায় সবাই নিখোঁজদের স্বজন।

ছবি:আসিফ মাহমুদ অভি /বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ছবি:আসিফ মাহমুদ অভি /বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
লৌহজং থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, লঞ্চডুবির পরপর ১১০ জনের মতো যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে দুই নারী কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যান। মঙ্গলবার আরো একটি লাশ চাঁদপুরের হাইমচরের কাছে পাওয়া গেছে। সেটি এখন শিবচরে রয়েছে।
উদ্ধার তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিআইডব্লিউটিএ, ফায়ার ব্রিগেড, কোস্টগার্ডের ডুবুরিরা গতকাল থেকে নিখোঁজদের উদ্ধারের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমাদের সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব আমরা তার সবটুকুই করছি।”
তবে দুদিনেও ডুবে যাওয়া লঞ্চের অবস্থান সনাক্ত করতে পারেননি উদ্ধাকর্মীরা।


No comments:
Post a Comment