‘তাগোরে খুঁজি, যাগো অপেক্ষায় স্বজনরা’
গোলাম মুজতবা ধ্রুব, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published: 2014-08-08 11:38:51.0 BdST Updated: 2014-08-08 12:12:32.0 BdST
বেতন পান নামমাত্র; তারপরও দায়িত্বের খাতিরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা নেমে পড়েন পানির অতলে। টানা যুদ্ধে কখনো জয়ী হন, কখনো বৃথা যায় আপ্রাণ চেষ্টা।
নিখোঁজ পিনাক-৬ লঞ্চের সন্ধানে কাজ করা ডুবুরিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এমন ভাষ্য পাওয়া গেল।
তারা জানালেন, দেশে সর্বসাকুল্যে মোট ২০ জন ডুবুরি থাকায় কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলেই ঘুরে ফিরে তাদেরই ডাক পড়ে। নাওয়া, খাওয়া ভুলে কাজ করতে হয় বিরামহীন। বেতনটাও ‘সুবিধার’ না।
বৃহস্পতিবার ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি বিনাশ বোটে ডুবুরি মাসুদুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদকের। কথা প্রসঙ্গে তারা নানা অভিজ্ঞতা যেমন ভাগ করলেন তেমনি জানালেন নানা অতৃপ্তির কথাও।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে কাওড়াকান্দি থেকে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে মাওয়া ঘাটে যাওয়ার পথে লৌহজং ক্রসিংয়ে পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ১১০ জনকে উদ্ধার করা হয় বলে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসনের দাবি।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে তিনটি লাশ উদ্ধার করতে পেরেছে ডুবুরিদল। আরো কয়েকটি লাশ বিভিন্ন স্থানে ভেসে ওঠার পর উদ্ধার করা হয়।
মাসুদ জানালেন, স্বজনদের চিন্তা মাথা থেকে তাড়িয়েই তিনি পানিতে নামেন।
“পানিতে নামলে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন কারো কথাই মাথায় থাকে না। পানির ভিতর তাগো খুঁজি যাগো একবার দেখবার আশা নিয়া নদীর পাড়ে পরিবার অপেক্ষা করতেছে।”
প্রায় এক দশক আগে চার হাজার চারশ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করা মাসুদের বাড়ি জামালপুরে। নাফিদ (৩) ও নিহাদ (১) নামে দুই শিশুর জনক তিনি। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে থাকেন গ্রামে।
“পানিতে ডুব দেওয়ার আগে মায়ের মুখটা ভাইসা উঠে মনে। এরপর আল্লাহর নাম নিয়া চইলা যাই পানির গভীরে। পানিতে মরন হইতে পারে মাইনাই এই কামে আইসি। তাই কাজের সময় মরলেও আফসোস নাই।”
লঞ্চটির সন্ধানে এ পর্যন্ত পদ্মায় তিনবার নেমেছেন বলেও জানান তিনি।


“জীবন বাজি রেখে আমাগো কাজ করতে হয়। কোন ধরনের বিশ্রাম এখানে নাই। সবার কাজের টাইম থাকে, শিডিউল থাকে। আমাগো তাও নাই। তবে দেশ আর মানুষের জন্য কাজ করতে করি, এইটাই শান্তি।”
বড় বড় ঢেউ আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের মাঝেও তাই গান ধরেন মাসুদরা। শত হতাশার মাঝেও আশায় বুক বাঁধেন।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আবদুস সালামের নির্দেশে বুধবার বিকালে পদ্মায় নামেন হুমায়ূন কবির। প্রায় আধঘণ্টা পদ্মার ঘোলা পানির নিচে থাকার পর ফায়ার সার্ভিসের ফেলা দড়িতে টান দিয়ে উপরে উঠে আসার সংকেত দেন। সহকর্মীরা তাকে বোটে উঠে আসতে সাহায্য করেন।
উঠে এসে একটু জিরিয়ে নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেন হুমায়ুন।
বলেন, “এবার খুব বিপদের মধ্যে পানির নিচে ছিলাম। একটা বড় ইট পানির নিচে আটকে গিয়েছিল। আমি তা সরানোর পর ইটটি প্রচণ্ড গতিতে ছুটে দূরে গিয়ে পড়ে। মাথায় লাগলে মাথা ফেটে যেত। হয়তো একা আর উপরে উঠে আসতে পারতাম না।”
কথার ফাঁকেই অক্সিজেন মাস্ক ও ডুবুরির পোশাক বদলাতে থাকেন তিনি। বলেন, “একাজে অনেক ঝুঁকি আছে। কিন্তু সুযোগ সুবিধা বেতন প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম।”
মাসুদ আর কবীরের চেয়ে বয়সে বড় মো. শাহজাহান এ সময় তাদের কথা শুনে হাসেন। একটানা তিন দিন পর বুধবার গোসল করার সুযোগ পান এই শাহজাহান।
“তিনদিন কাজে ছিলাম। গোসলটাও করতে পারি নাই। বোটেই গোসল সেরে নিলাম। এখন শরীরটা কিসুটা ভাল লাগছে।”
আর দীর্ঘদেহী আলাউদ্দীন বললেন, “এখানে কাজ করতে হয় বিরামহীন। সারাদেশে রয়েছে মাত্র ২০ জন ডুবুরি।”
ডুবুরি দলের নেতা আবুল খায়ের বলেন, “আমরা জীবন বাজি রেখে দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহন ও তার যাত্রীদের উদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করি। আমাদের জন্যেই মৃতের স্বজনরা শেষবারের মতো হলেও তাদের দেখার সুযোগ পান। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করেন। সম্মান পাই সবখানেই।”


২০০৫ সালে আরিচায় একটি লঞ্চ দুর্ঘটনায় পড়লে সাহসিকতার সঙ্গে যাত্রীদের উদ্ধারে অংশ নেয়ার স্বীকৃতি হিসাবে পুরস্কারও পেয়েছিলেন খায়ের।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “দমকল বাহিনীতে ডুবুরির সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এত কম লোক হলেও কিন্তু তাদের সাফল্যের ইতিহাস আছে। তবে লোক আরো বাড়লে কাজও ভাল হবে।”
দমকল বাহিনীর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমদ খান বলেন, “দমকল বাহিনীতে সারাদেশে কেবল ২০ জন ডুবুরি রয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম একথা সত্যি।”
তিনি জানান, সারাদেশে আরো অন্তত দেড়শ ডুবুরি দরকার। বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, “আমাদের সনাতন পদ্ধতিতে এখনো দুর্ঘটনাস্থলে অভিযান চালাতে হচ্ছে। নিজস্ব ইলেকট্রিক সার্চ মেশিন, সোনার সার্চের জন্য দরকারি আধুনিক যন্ত্রপাতি ফায়ার সার্ভিসের নাই।”
উন্নত যন্ত্রপাতি পেলে এ বাহিনী আরো সক্রিয়ভাবে দেশের কাজে অংশ নিতে পারবে বলেও মনে করেন মহাপরিচালক।


No comments:
Post a Comment