Tuesday, August 5, 2014

অবৈধ লঞ্চ ও সি-বোট অবাধে চলছে

অবৈধ লঞ্চ ও সি-বোট অবাধে চলছে
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, মাওয়াঘাট থেকে
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট, ২০১৪
২১ জেলার প্রবেশদ্বার খ্যাত মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে চলছে দুই ডজনের বেশি ফিটনেসবিহীন লঞ্চ ও শতাধিক স্পিডবোট (সি-বোট)। স্থানীয় প্রভাবশালী, মাস্তান ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চলছে সে সব। আর স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এমনকি নৌপরিবহন মন্ত্রীর সম্পৃক্ততাও রয়েছে এতে। মাওয়া ও কাওড়াকান্দি ঘাটের নিয়ন্ত্রণ তারই ঘনিষ্ঠজনদের হাতে।
এ রুটে চলা ৮৬ লঞ্চের অধিকাংশই ৩০ থেকে ৪০ বছরের পুরনো। উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে বর্ষা মৌসুমে এবং নৌবন্দরে সতর্কতা সংকেত থাকা অবস্থায়ও বেপরোয়া চলে এসব লঞ্চ। ফলে সাধারণ মানুষকে নদী পাড়ি দিতে হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। এতে দুর্ঘটনা যেমন বাড়ছে, প্রাণহানিও হচ্ছে অনেক।
সোমবার লঞ্চ পিনাক-৬ পদ্মায় নিমজ্জিত হয়ে ১৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে নিয়মিত যাত্রীরা তাদের ক্ষোভের কথা জানান। তারা বলেন, পোর্ট অফিসার, নৌ-পুলিশ, স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি ও প্রভাবশালী মাস্তানদের টাকা নিয়ে চলছে এসব অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ। যার একটি ছিল পিনাক-৬। এর আগেও একটি লঞ্চ প্রায় ২০০ যাত্রী নিয়ে তলা ফেটে ডুবে যায়। ওই সময় নদীর গভীরতা কম ও পাশে চর থাকায় অধিকাংশ যাত্রী বেঁচে যান। কিন্তু এ যাত্রায় পিনাক-৬ নিমজ্জিত হলে প্রাণে বাঁচতে পারেননি অধিকাংশ যাত্রী।
মাওয়া-কাওড়াকান্দি লঞ্চ মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী এ রুটে তালিকাভুক্ত ১১৮টি লঞ্চ চলাচল করে। তবে বিআইডব্লিউটিএর হিসাবে এ সংখ্যা ৮৭। এর মধ্যে ২৫ লঞ্চের ফিটনেস নেই। তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলোর নাম পাওয়া যায়নি। ৩০ থেকে ৪০ বছরের পুরনো ফিটনেসবিহীন লঞ্চ দিয়ে এ রুটে অবাধে যাত্রী পারাপার করছেন লঞ্চ মালিকরা। লঞ্চগুলোতে নেই পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও বয়া। ফলে দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে যাত্রীদের ডুবে মরা ছাড়া উপায় নেই। যেমনি হয়েছে পিনাক ৬-এর ক্ষেত্রে।
মাওয়া থেকে কাওড়াকান্দির দূরত্ব সাড়ে ৫ কিলোমিটার। লঞ্চে ভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা। দূরত্বের তুলনায় এ ভাড়া প্রায় তিনগুণ। সরকার নির্ধারিত লঞ্চভাড়া প্রতিকিলোমিটার ১ টাকা ৭০ পয়সা। সে হিসাবে লঞ্চ ভাড়া হওয়া উচিত ছিল সাড়ে ৯ টাকা। কিন্তু ভাড়া নেয়া হয় ৩০ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে ঘাটে প্রতি ১৫ মিনিট পর পর লঞ্চ ছেড়ে যায়। আর ঈদের সময় লঞ্চ ছাড়ে ৫ থেকে ৭ মিনিট পরপর। এরপরও প্রতিটি লঞ্চে ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিনগুণ যাত্রী পরিবহন করে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে ঈদের ছুটি কিংবা আটরশির ওরসসহ কোনো উপলক্ষ থাকলে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। ফলে অতি মুনাফার আশায় লঞ্চ মালিকরা ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চ চালান।
স্থানীয় লোকজন ও সাংবাদিকরা জানান, অবৈধ লঞ্চগুলো স্থানীয় প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের অবৈধ আয়েরও অন্যতম উৎস। প্রতিটি ট্রিপে একটি লঞ্চ থেকে বিআইডব্লিউটিএর পোর্ট অফিসার (বন্দর কর্মকর্তা) ২০০ টাকা, নৌ-পুলিশ ১৫০ টাকা, দুই পাশের দুই পুলিশ ফাঁড়ি ৫০ করে ১০০ টাকা এবং যাত্রীপ্রতি মালিক সমিতি পায় নির্দিষ্ট একটি অংশ। এর বড় একটি অংশ চলে যায় দুই ঘাটের রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মাস্তানদের হাতে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, নৌপরিবহন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তিও ঘাট থেকে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা নেন। শ্রীনগরের বাসিন্দা হাবীবুর রহমান বলেন, দুই ঘাটে সব সময় পুলিশ থাকে। তারা কেন অতিরিক্ত যাত্রী বহনের সময় লঞ্চগুলোকে বাধা দেয় না। তারা টাকা না পেলেই শুধু লোক দেখানো অভিযান চালায়। আর টাকা পেলেই শান্ত।
সি-বোটে বেশি ঝুঁকি : মাওয়া ঘাটে ২০০ ও কাওড়াকান্দি ঘাটে ১৫০টিসহ মাওয়ায় স্পিডবোট চলে প্রায় ৩৫০টি। মাত্র সাড়ে ৫ কিলোমিটারের জন্য জনপ্রতি ভাড়া নেয়া হয় ১২০ টাকা। ঈদের আগের দিন সি-বোট উল্টে ৪ যাত্রী প্রাণ হারিয়েছিলেন। রাতের বেলায় সি-বোট চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু সেটি মানেন না মালিকরা। প্রতিনিয়তই রাতে চলছে সি-বোট। যাত্রীরাও দ্রুত যেতে পারেন এবং সময় বাঁচানোর জন্য সি-বোটে নদী পার হন। সি-বোট থেকেও যাত্রী প্রতি নির্ধারিত টাকা দিতে হয় দুই ঘাটে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সি-বোট চলাচলেও বাধা দিচ্ছে না কেউ। সি- বোটগুলোতে কোনো বাতি নেই। রাতের বেলায় অপরটির সঙ্গে কিংবা ফেরি ও লঞ্চের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় প্রায়ই। অনেক সময় সি-বোট দুর্ঘটনার শিকারদের লাশও পাওয়া যায় না। চলতি বছরের ২৪ মার্চ পদ্মার মাঝ নদী হাজরা পয়েন্টে রাতে দুই সি-বোডের সংঘর্ষের পর নিখোঁজ ১০ জনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ মিললেও বাকিদের খোঁজ মেলেনি। বিআইডব্লিউটিএর ট্রাফিক ইন্সপেক্টর যুগান্তরকে জানান, মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে ৮৭টি লঞ্চ নিয়মিত চলাচল করে। যাতে লঞ্চ মালিকরা অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে না পারেন সেদিকে তারা নজর রাখেন। ঈদসহ কিছু কিছু সময় দুই-তিনটি পরিবহনের যাত্রীরা একত্রে এসে গেলে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে যায়। বিআইডব্লিউটিএর মাওয়া জোনের উপ-পরিচালক জানান, যাতে কোনো ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করতে না পারে সেদিকে আমাদের কঠোর নজরদারি আছে। কিন্তু অনেক লঞ্চ মালিক ঘাট ছেড়ে এসে আবার পথে জাজিরা থেকে যাত্রী তোলে। ফলে সেগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ে।
লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি হুমায়ুন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে লঞ্চে যাত্রী বেশি হয় না। তখন লোকসান গুনতে হয়। ঈদের সময় কিছু যাত্রী বেশি হয়। তখন কেউ কেউ ধারণক্ষমতার কিছু বেশি যাত্রী নেন।
- See more at: http://www.jugantor.com/first-page/2014/08/06/131044#sthash.eL5vQwsK.dpuf

No comments:

Post a Comment