Saturday, March 22, 2014

‘পঞ্চদশ সংশোধনী জাতির সর্বনাশ করেছে’-মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

‘পঞ্চদশ সংশোধনী জাতির সর্বনাশ করেছে’-মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম 

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সভাপতি, বাংলাদেশের কমিনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সম্প্রতি মুখোমুখি হন সাপ্তাহিক-এর। কথা হয় ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, চলমান রাজনীতি, উপজেলা নির্বাচন, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে। সরকারের নীতির পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সাম্প্রদায়িক শক্তি ভয়নক আকার ধারণ করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

সাপ্তাহিক : ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে অংশ নিলেন না। সরকার গঠন হয়েছে। এখন কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সংবিধান অনুযায়ী একটি নির্বাচন হয়েছে এটুকু বলা যেতেই পারে। কিন্তু জনগণ দ্বারাই এই সরকার নির্বাচিত, তা ষোলোআনা বলা যাবে না।
সাপ্তাহিক : কিন্তু জনগণের একটি অংশ তো ভোট দিয়েছে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ৩০০ প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। কিন্তু ১৫৩ আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন।
সাপ্তাহিক : প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে নির্বাচন কমিশনের কী করার ছিল?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সকলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যে বাধাগুলো ছিল তা দূর করতে নির্বাচন কমিশন আন্তরিক ছিল না। সরকারও বলেছিল, এটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। এ কারণে এই নির্বাচন নিয়ে জনমনে কোনো উৎসাহ ছিল না। জনগণ ভোটকেন্দ্রেই যায়নি।
সাপ্তাহিক : সরকার বলছে, বিরোধী জোটের বাধার কারণে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেনি?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও ভোট দিতে যায়নি। অনেক কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। তার মানে কি সেই জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কি ছিল না। অবশ্যই ছিল। কিন্তু তারাও জানত যে, নির্বাচন নিয়ে কী হচ্ছে। এই কারণে এই সরকারকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার বলার সুযোগ নেই।
সাপ্তাহিক : আপনি শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এমন নির্বাচন হলে ডানপন্থীরাই লাভবান হবে। এখন কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমার আশঙ্কাই সত্যি হচ্ছে। উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক ভালো করছে। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হচ্ছে, প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করছে জামায়াতে ইসলামী। এটিই প্রমাণ করে যে, পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করে একতরফা নির্বাচনে সরকার গঠন করলে জনগণ তা মেনে নেয় না।
সাপ্তাহিক : জামায়াত প্রশ্নে গত পাঁচ বছরে সরকার এবং আপনাদের যে অবস্থান তাতে দলটি অনেকটাই কোণঠাসা। এরপরও কেন জামায়াতের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমার মনে হয়, সরকার জনমত ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। পাঁচ বছর আগে দুই-তৃতীয়াংশ জনসমর্থন নিয়ে এসে এখন কেন মহাজোটের এই করুণ অবস্থা, তার কারণ খুঁজে বের করতে না পারলে গণতান্ত্রিক ধারা রক্ষা পাবে না।
সাপ্তাহিক : এ নিয়ে আপনার কী পর্যবেক্ষণ?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সরকার জনস্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি। অনিয়ম-দুর্নীতির মাত্রা বাড়িয়ে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে। সর্বত্রই দুর্নীতি এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই যে এর সঙ্গে জড়িত, তা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দাখিলকৃত হলফনামা থেকেই প্রমাণিত। এখন হলফনামা প্রকাশেই সরকার আপত্তি জানাচ্ছে। দুর্নীতিকে আড়াল করতেই এই অপচেষ্টা।
সাপ্তাহিক : তাই বলে দুর্নীতির প্রতিবাদে জনগণ জামায়াতের ওপর আস্থা রাখবে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এটিই রাজনীতির মূল সমস্যা। মানুষ আওয়ামী লীগ থেকে পোড় খেয়ে বিএনপি-জামায়াতে এবং বিএনপি-জামায়াত থেকে পোড় খেয়ে আওয়ামী লীগে আস্থা রাখছে। জনগণ দ্বি-দলীয় জোট থেকে বের হতে পারছে না। এ কারণেই এখন বিকল্প বলয়ের বিষয়টি প্রকটভাবে সামনে আসছে।
সাপ্তাহিক : এতকিছুর পরেও দুই জোটেই মানুষ ভরসা পায়। বিকল্প শক্তি মানুষ অনুভব করছে না। এটি আপনাদের ব্যর্থতা কিনা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতার কারণেই জনগণকে আজও বিকল্প শক্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা যায়নি। এটি বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। এখানে কোনো অজুহাত দেয়া যায় না। কিন্তু এরশাদের পতনের পর দুটি জোটকে আন্তর্জাতিকভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এখানে যারা ক্ষমতায় আসে তারাও আন্তর্জাতিক কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করে থাকে, আবার বিরোধী দলও একই স্বার্থ রক্ষা করে। যখনই বামদের মধ্য থেকে শক্তি দেখা দিয়েছে তখনই অর্থ বা অন্য লোভ দেখিয়ে বাম নেতাদের ওই দুই জোটের মধ্যে টানা হয়েছে। তারা কখনও বিকল্প শক্তিকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেবে না।
সাপ্তাহিক : ১/১১ তো একটি ভালো সুযোগ ছিল?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সুযোগ হয়েছিল বটে। কিন্তু সেই বিকল্প কোনো রাজনৈতিক বিকল্প নয়। তাদেরই স্বার্থ রক্ষার্থে সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই বিকল্প তৈরি করা হয়। সুতরাং সেই বিকল্পও জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এই কাঠামোর বাইরে অন্য কোনো শক্তি না এলে মন্দের ভালো মন্দ নিয়েই থাকতে হবে। একদিকে আপদ অন্যদিকে বিপদই আমাদের সঙ্গী হবে।
সাপ্তাহিক : এই আপদ-বিপদের মধ্যেও মানুষ কেন বাম বলয়কে মূল্যায়ন করছে না?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : চুড়ান্ত মূল্যায়নের সময় আসেনি। পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের দুই দশকের প্রস্তুতি ছিল। ধীরে ধীরে সব অর্জন হয়েছে। সুতরাং সঙ্কটের মধ্য থেকেই মুক্তির পথ আসবে।
সাপ্তাহিক : আর কত অপেক্ষা? এখন তো চরম অবস্থা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ভাষা আন্দোলনের পর মুসলিম লীগই ক্ষমতায় এসেছে। তাই বলে কী ভাষা শহীদদের ব্যর্থ বলা যাবে। ক্ষুদিরাম, সূর্য সেনকে আমরা ব্যর্থ বলতে পারি না। দ্বি-দলীয় জোটের বাইরে আমরা আজ অবস্থান গড়ে তুলতে পারিনি ঠিক কিন্তু কাল তো গড়ে তুলতে পারি।
সাপ্তাহিক : আপনাদের পারা না পারার মধ্য দিয়ে অন্য শক্তি তো...
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বিপজ্জনক মৌলবাদী শক্তি মাথা চাড়া দিতেই পারে। কিন্তু আমরা সেই শক্তিকে মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাব।
সাপ্তাহিক : সেই প্রস্তুতি আছে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সময়ই প্রস্তুতির কথা বলে দেবে। আইয়ুব খান যখন মার্শাল ল জারি করল তখন বাঙালির প্রস্তুতি ছিল না। পরে কিন্তু মার্শাল ল টেকেনি। রাজনীতির এখনকার হাওয়া কৃষ্ণপক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এক সময় শুল্কপক্ষের দিকে ঠেলে দেবে। রেডিমেট পরিবর্তন প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। এই রুগ্ন অবস্থাকে দূর করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে অনেক বেশি প্রচেষ্টা দরকার। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বামপন্থীদেরই রাস্তায় নামতে হবে।
সাপ্তাহিক : এ ক্ষেত্রে বামদের দুর্বলতা নিয়ে কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বামপন্থীদের প্রথম দুর্বলতা হচ্ছে একটি অংশ হতাশা প্রকাশ করে বুর্জোয়া দলের সঙ্গে মিলে যায়। দ্বিতীয়ত, একটি অংশ বিশুদ্ধবাদী, যারা বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেন না। তৃতীয়ত, আরেকটি অংশ হচ্ছে সংকীর্ণমনা। ক্ষুদ্র স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে তারা বৃহৎ স্বার্থে যুগপৎ আন্দোলন করতে চায় না।
সাপ্তাহিক : রাজনৈতিক মঞ্চে এই বিভাজন নিয়ে তাহলে ভরসা পান কোথায়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার আমেরিকান মারা যায়। এরপরেও কি তারা ভরসা হারিয়েছে। মানুষের জাগরণ যখন সমস্ত বামপন্থী দলগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে, তখনই মুক্তি। ভরসা সাধারণ মানুষ। এত বিভাজনের পরেও তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঐক্য আছে।
সাপ্তাহিক : এই ঐক্য দৃশ্যত মৌলবাদী শক্তিকে মোকাবেলা করতে পারছে না।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : মৌলবাদী শক্তির এখন যে মহড়া তা খুবই বিপজ্জনক। আমরা এই শক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট রয়েছি। একই সঙ্গে সরকারকে বলেছি, অবিলম্বে মৌলবাদী শক্তি জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে হবে। জামায়াতের সঙ্গে যে দল সম্পর্ক রাখবে, তাদের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। বিএনপিকে আমরা বলেছি, জামায়াতকে পরিত্যাগ করতে। এই আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গেই জামায়াতের অর্থনৈতিক এবং যোগাযোগ কাঠামো ভেঙ্গে দিতে হবে।
সাপ্তাহিক : নিষিদ্ধ করলেই সমাধান?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : নিষিদ্ধের পাশাপাশি জামায়াতের অর্থনৈতিক কাঠামো নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। এটি করতে পারলেই মানুষকে নিয়ে একটি আদর্শিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব ত্বরান্বিত হবে।
সাপ্তাহিক : আপাতদৃষ্টিতে জামায়াত নিষিদ্ধের পথেই। সরকারও তাই দাবি করে। কিন্তু এই পন্থা কাজে আসেনি তা উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করছে...
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সরকার এই দাবি করে না, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হোক। সরকার আদালতের ওপর দায় দিয়ে কথা বলছে। আদালতে জামায়াতের নিবন্ধনের বিষয়টি বিচারাধীন। সেখানে তো নিষিদ্ধের কোনো প্রসঙ্গ নেই। এটি সরকারকেই করতে হয়।
সাপ্তাহিক : নিষিদ্ধ সংগঠনের মতোই জামায়াত-শিবির কর্মসূচি পালন করছে...
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এগুলো দৃশ্যমান বটে কিন্তু কোনো সমাধান নয়। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতা বলেছেন, ’৭১এর পর জন্ম নিয়ে যারা জামায়াত-শিবির করছে তাদের জন্য আওয়ামী লীগের দরজা খোলা আছে। ফুলের মালা দিয়ে জামায়াত নেতাকে বরণ করতে দেখেছি। উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-জামায়াত আঁতাত করছে।
সাপ্তাহিক : কেন আপনার এই উপলব্ধি?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ভোটের ফলাফল তাই প্রমাণ করে। অনেক জায়গায় যেখানে জামায়াতের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সেখানে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। আঁতাত না হলে এমন ফলাফল হতে পারে না। এই আঁতাত নতুন না। আঁতাত করেই আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছে। পঞ্চদশ সংশোধনী জাতির সর্বনাশ করেছে। জিয়া এবং এরশাদের সংশোধনী বহাল রেখে একটি ভ্রান্ত সিগনাল দিয়ে জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে। এই কথা ভোলার নয়। কাদের মোল্লার রায় নিয়েও সরকার একই ধরনের আঁতাত করেছে।
সাপ্তাহিক : এতে আওয়ামী লীগের কী লাভ?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ক্ষমতা। বিএনপির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ এখন সা¤্রাজ্যবাদীর কাছেও আত্মসমর্পণ করে আবার সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছেও আত্মসমর্পণ করে। এখানে নীতি আদর্শ কাজ করে না। আর বিএনপি তো নিজেই প্রতিক্রিয়াশীল দল। সুতরাং আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভর করে আপনি মৌলবাদীর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন না।
সাপ্তাহিক : আবারো সংলাপ-সমাঝোতার কথা আসছে? আপনি কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : কেবল ক্ষমতা বা একে অপরকে টেক্কা মারার জন্যই নয়, গণতন্ত্রের স্বার্থেই সংলাপ হতে হবে। আমেরিকা বা ভারতকে খুশি করার জন্য সংলাপ গুরুত্ব পেলে আমাদের মুক্তি মিলবে না। যদি সংলাপ-সমাঝোতা না হয়, তাহলে বিএনপি আরও অধিক মাত্রায় জামায়াতের ওপর নির্ভর করবে এবং তা মোকবেলা করার জন্য আওয়ামী লীগ পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করে নির্যাতন চালাবে। এতে আওয়ামী লীগ আরও স্বৈরাচারী হবে এবং গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে।
সাপ্তাহিক : গণতন্ত্র এখন কি হুমকিতে নয়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : অবশ্যই এখন গণতন্ত্র হুমকির মুখে। কিন্তু এটিই চুড়ান্ত বিপদ নয়।
সাপ্তাহিক : মুক্তির উপায় কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে জামায়াত প্রশ্নে সমাঝোতা করতে হবে। জামায়াত ঠেকাতে না পারলে গণতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না। একদিকে আওয়ামী লীগে নামের আপদ আরও ভর করবে অন্যদিকে জামায়াত নামের বিপদ আরও ভয়ানক হয়ে উঠবে।
সাপ্তাহিক : আপনি কী সমঝোতার আভাস পাচ্ছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : না। আমি খুশি হতাম নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পর সরকার যদি গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সমঝোতার কথা বলত। কিন্তু এরকম কোনো আলামত চোখে পড়ছে না।
সাপ্তাহিক : এই অবস্থায় সরকারের ভবিষ্যৎ কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এই অবস্থা আওয়ামী লীগেরই বিপদ ডেকে আনবে। কারণ, তারা মনে করবে জনগণের সমর্থন নয়, গায়ের জোরে, লাঠির জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়। এতে করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা কোনো আইনের তোয়াক্কা করবে না। তারা আরও স্বৈরাচারী হবে। আর স্বৈরাচারী হলেই তাদের পায়ের নিচে মাটি থাকবে না। এই সুযোগ গ্রহণ করবে জামায়াত।
সাপ্তাহিক : আইনশৃঙ্খলার অবনতি, হত্যা, গুম বাড়ছেই। এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে কী ভাবছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ইতিমধ্যেই অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। শুধু সামাজিক অস্থিরতাই নয়, এখানে সবচেয়ে অস্থির পরিবেশ তৈরি করবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। মানুষ অর্থনীতির চাকা থেকে সটকে পড়বে। বিকল্প শক্তির উত্থান না হলে দেশ অন্ধকারে ডুবে যাবে।
সাপ্তাহিক : অনেকেই অভিযোগ করে, বিএনপি-জামায়াতের বেলায় বামপন্থীরা যত সোচ্চার, আওয়ামী লীগের বেলায় ততটা সোচ্চার নয়।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মনে করেন আমরা বিএনপির পক্ষে কথা বলি। কার কথা বিশ্বাস করবেন? মূলত আমরা উভয় দলের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি। শুধু বিএনপি আমলের ক্রসফায়ার নিয়ে কথা বলেছি, এখন বলি না, এটি সত্য নয়।
আমরা সব সময় বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরোধিতা করে আসছি। কারণ এইভাবে চলতে থাকলে  এক সময় সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। তখন আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এ কারণে আমরা এমন বিপদের কথা চিন্তা করে এই ধরনের হত্যা, গুমের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছি। বিচারবহির্ভূত হত্যার পক্ষে থাকলে তো যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইতাম না। আমরা চাই বিচারের মধ্য দিয়েই অপরাধীর শাস্তি হোক।
সাপ্তাহিক : মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এতে বিচার প্রক্রিয়া কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এই বিচার নিয়ে সরকার প্রথমেই হোঁচট খেয়েছে। বিচারক নিয়োগ, প্রসিকিউটর নিয়োগ এবং আদালত ভবন সিলেকশন নিয়েই সরকার অনেক সময় পার করেছে। ট্রাইব্যুনালে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকেও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। আমরা তো এগুলো ভুলিনি। কাদের মোল্লার রায়ের আগে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জামায়াত-শিবিরকে সভা করতে সরকারই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। জামায়াত-শিবিরের হুমকির কারণেই কাদের মোল্লাকে ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন দেয়। এগুলো সবাই জানে।
সাপ্তাহিক : এই বিচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এই বিচার নিয়ে সরকার কোনো কৌশল নিলে ফলাফল ভালো হবে না। গণজাগরণ মঞ্চ সরকারের ভুল নীতির জবাব দিয়েছে। ভবিষ্যতেও তাই দেবে। কারণ জনগণ এই বিচারের পক্ষে। জামায়াত নিয়ে সরকারের মধ্যে যে স্ববিরোধিতা, তাতে হালে পানি পাবে না। আওয়ামী লীগ মনে করে জামায়াতকে ঠেকাতে হলে ক্ষমতায় যেতে হবে, আর ক্ষমতায় থাকতে হলে জামায়াতকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এই কৌশল এখন মানুষ বুঝে গেছে। এতে আওয়ামী লীগের শেষ রক্ষা হবে না।
সাপ্তাহিক : কৌশলের শেষ কোথায়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে এখন নীতির বাস্তবায়ন করছে না। লুটপাটের রাজনীতি করতে হচ্ছে। এই রাজনীতি করতে গেলে এমন হেন কাজ নেই যা আওয়ামী লীগ করবে না। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারে আওয়ামী লীগ বেশি খেললে চূড়ান্ত পতন হবে। জনগণ ছাড়বে না।
সাপ্তাহিক : সরকার আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়াল। এর প্রভাব নিয়ে কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সরকারের এই সিদ্ধান্ত গণবিরোধী। জনগণের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়বে। জনগণ একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়বে। কৃষি, বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। গোটা অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসবে।
সাপ্তাহিক : উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে বলেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের আর কী উপায় ছিল?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : প্রশ্ন সেখানেই। কেন উৎপাদন ব্যয় বাড়ল। কম মূল্যে উৎপাদন করার সুযোগ থাকলেও কেন সরকার তেলনির্ভর রেন্টাল-কুইক রেন্টালের ওপর জোর দিল। সরকার বলেছিল, এটি জরুরি ব্যবস্থা। এখনও কেন তা বহাল রয়েছে। জরুরি ব্যবস্থা কী বছরের পর বছর ধরে চলে। টি টুয়েন্টি জনগণকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু একই দিনে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও জনগণকে বিশেষ উপহার দিয়েছেন।
সাপ্তাহিক : আপনারা প্রতিবাদ জানানের মধ্যেই সরকার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। এই প্রতিবাদ আর কত?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম :  সরকারের ১০০ দিনের হানিমুন পর্ব চলছে। একটি গণতান্ত্রিক দলের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারকে সময় দেয়া। আমরা সময় দিচ্ছি। কিন্তু সরকার কেন জনগণকে কষ্ট দিচ্ছে?
সাপ্তাহিক : আপনার কী ধারণা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : রেন্টালের ভুলের খেসারত সরকার জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আমরা এই পদ্ধতির অনেক আগে থেকেই বিরোধিতা করে আসছিলাম। এখন সরকার কূল পাচ্ছে না। একটি বড় প্রকল্প সরকার তৈরি করতে পারেনি। আগামী পাঁচ বছরেও সরকার পারবে বলে মনে হয় না।
সাপ্তাহিক : তাহলে বিদ্যুতের সমাধান কোথায়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, সরকারি প্লান্টগুলো অবিলম্বে মেরামত করতে হবে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে গ্যাস এবং কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
সাপ্তাহিক : সরকারেরও তো এটি উপলব্ধি করার কথা?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সরকার মনে করছে জনগণের মতের ভিত্তিতে নয়, পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেই টিকে থাকা যাবে।
সাপ্তাহিক : এইভাবে টিকে থাকা যায়?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। এই ভুল করে বলেই পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সাপ্তাহিক : আপনারাও জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলো নিয়ে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ বলে অনেকে মনে করেন। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত একটি মিছিলেই যেন আপনারা সীমাবদ্ধ। এর জবাবে কী বলবেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এটি অসত্য কথা। আমরা বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবিতে ৬৪টি জেলায় কর্মসূচি পালন করেছি। আপনারা মিডিয়াকর্মীরা তা লেখেন না। বুর্জোয়ারা কী করল সেটা নিয়েই আপনারা বেশি ব্যস্ত।
সাপ্তাহিক : কিন্তু আন্দোলনে জনগণকে সঙ্গে পাচ্ছেন না কেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমরা তো জোর করতে পারি না। আমরা ফ্যাসিস্ট দল নই যে গুলি করে দলে ভিড়াতে হবে। সুশীল সমাজের একটি অংশ এই অভিযোগে বামপন্থীদের বিষোদ্গার করেন। এটি শুধু সমালোচনা করার স্বার্থেই সমালোচনা।
সাপ্তাহিক : সমালোচনা তো শুধরানোর জায়গা থেকেও হতে পারে?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ভুল তথ্য দিয়ে শুধরানো যায় না। সঠিক তথ্য দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে এবং সঙ্গে থেকে যুগপৎ আন্দোলন করলেই ভালো কিছু অর্জন হয়।

http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=9025
__._,_.___

No comments:

Post a Comment