আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী
তুহিন ওয়াদুদ
১৯৭১ সালের মার্চ মাসকে ধারাবাহিক আন্দোলন থেকে খণ্ডিত করে আলোচনা করা কিংবা আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সকল স্তরের মানুষ থেকে আলাদা করে মূল্যায়ন করা কঠিন। মার্চ মাসের ১ তারিখ থেকেই উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলা। স্বাধিকার নয়, ছয় দফা নয়, এগারো দফা নয়; দফা তখন একটাই—স্বাধীনতা। ১৯৬২ সালে ছাত্রনেতাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ' নামের একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একাত্তরের মার্চ মাসে সেই স্বাধীনতার সরব ঘোষণা সকলের মুখে মুখে। সাধারণ অর্থে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব বললে আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনকেই বোঝায়। যদি সূক্ষ অর্থে বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব। মার্চ মাসের বেশ কিছু ঘটনায় শিক্ষকদের ভূমিকা আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। আর শিক্ষার্থীদের ভূমিকাও অহঙ্কার করার মতো।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুরে ইয়াহিয়া খান যখন ৩ মার্চের অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবস্থান করছিলেন হোটেল পূর্বাণীতে। দুপুরে রেডিওতে এই ঘোষণার পরপরই মুক্তিকামী মানুষের ঢল নামে হোটেল পূর্বাণীতে। সকলেই জানতে চান বঙ্গবন্ধু কী নির্দেশনা দেন। সেদিনই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বাধীনতার জন্য শ্লোগান দেওয়া হয়। 'বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর'—শ্লোগানে মুখরিত তখন ঢাকার রাজপথ। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর সাথে বসে আলোচনা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাত্ক্ষণিক স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে ৭ মার্চ জনসভার ডাক দেন। ২ ও ৩ মার্চ ঘোষণা করেন হরতালের। ১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ পাড়ায় মহল্লায় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার নির্দেশ প্রদান করেন। এ দিনেই 'স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় মিছিল হতে থাকে। ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বেও মিছিল চলতে থাকে। ২ মার্চ ছাত্রলীগের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। লাখো জনতার উপস্থিতিতে সেদিন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলন করেন ছাত্ররাই। ২ মার্চ ছাত্র ইউনিয়নও অভিন্ন দাবিতে বিশাল জনসভা করে। এভাবে প্রতিদিন ছাত্ররা বিশাল বিশাল কর্মসূচি দিয়ে সারা দেশের জনগণকে পািকস্তানের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে উদ্বুদ্ধ করে। ছাত্রলীগ পূর্ব পাকিস্তানের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা বন্ধ রাখার আহ্বান জানায়। ৩ মার্চের পর ৪, ৫ ও ৬ মার্চ সকাল ৮ টা থেকে ২ টা পর্যন্ত হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চের জনসভার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর কোনো জনসভায় বক্তব্য দিতে পারবেন কিনা এই সন্দেহে তিনি বলেন—' হয়তো এটাই আমার শেষ ভাষণ। আমি যদি নাও থাকি আন্দোলন যেন থেমে না থাকে। বাঙালীর স্বাধীনতার আন্দোলন যাতে না থামে।' এদিন ছাত্রলীগ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করে।
৭ মার্চ ছাত্র ইউনিয়ন যুদ্ধ করার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করে। ১৯ মার্চ তারা স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রচারপত্র বিতরণ শুরু করে। ২০ মার্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র উইনিয়নের শত শত গণবাহিনী ডামি রাইফেল হাতে নিয়ে মার্চপাস্ট করে।
যতই দিন গড়াতে থাকে ততই বাড়তে থাকে আন্দোলনকারীদের মৃতের সংখ্যা। দেশের এ অবস্থাদৃষ্টে শিক্ষকগণও আন্দোলনের মাঠে নেমে আসেন। প্রথমে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সমালোচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪৮ জন শিক্ষক যুক্ত বিবৃতি দেন। পাকিস্তান অবজারভারের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রমের বিরোধিতা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫ জন শিক্ষক বিবৃতি দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৯ জন শিক্ষক সেনাবাহিনীর ঘৃণ্য কর্মের জন্য নিন্দা জ্ঞাপন করে বিবৃতি দেন। অনেক শিক্ষক বঙ্গবন্ধুর ওপর আস্থা রেখে মিছিল করেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৮ সালে যখন সামরিক শাসন রাজনীতির গতি রোধ করেছিল তখন শিক্ষার্থীরা আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। '৬২-তে যে আন্দোলন হয়, সে আন্দোলনকে বলাই হয় ছাত্র আন্দোলন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা উপস্থাপন করার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ছাত্রদের ডেকে তাদের ওপর ছয় দফা প্রচারের ভার দিয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পাশাপাশি নয় দফা যুক্ত করে যে গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি করেছিল সেই আন্দোলনেরও প্রাণবিন্দু ছিল শিক্ষার্থী সমাজ। যে কয়েকটি মৃত্যু ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্যে বেশি কাজ করেছিল তার মধ্যে একটি হচ্ছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যু। মৃত্যুর মিছিলেও ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থী। ১৯৪৭ থেকে '৭১ পর্যন্ত যে আন্দোলন, সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অস্বাীকার করার কোনো উপায় নেই। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় আন্দোলনের সূতিকাগার। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অকুতোভয় পদক্ষেপ দেশজুড়ে প্রভাব ফেলেছিল। তবে শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতিপর্বে বেশি ভূমিকা রেখেছেন। সাংগঠনিকভাবে রাজনীতিতে শিক্ষার্থীদের যুক্ত হওয়ার সুযোগের কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছে। বাঙালির শোষণমুক্তির পথে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাগ্র প্রচেষ্টাই বাংলাদেশকে মুক্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। নয় মাসব্যাপী যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই মুক্তিযুদ্ধেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ছিলেন অগ্রভাগে।
(ড. তুহিন ওয়াদুদ, শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়)

No comments:
Post a Comment