Sunday, March 23, 2014

শহরের বিষণ্নতা ও স্মৃতি সেলিনা হোসেন |

শহরের বিষণ্নতা ও স্মৃতি

সেলিনা হোসেন |
অলংকরণ: মাসুক হেলালঅলংকরণ: মাসুক হেলালছেলেটির নাম পলাশ। বয়স বত্রিশ।
মাস দুয়েক আগে সিডনি থেকে এসেছে নিজের তোলা ছবির এক্সিবিশন করার জন্য। সেই প্রদর্শনী হচ্ছে বেঙ্গল গ্যালারিতে। ফটোগ্রাফি ওর নেশা। গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে যখন দাঁড়ায়, তখন ওর ভঙ্গি অন্য রকম হয়ে যায়। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে পপি অনুভব করে, ওর ছোট ক্যামেরায় পুরো পৃথিবী ঢুকে আছে। তার পরও ওর চোখে আনন্দ নেই কেন? আয়ত চোখজুড়ে বিষণ্নতা বর্ষার কালো মেঘের মতো গাঢ় হয়ে থাকে। গাছের বা মানুষের ছায়ার মতো বিষণ্নতা ওর পুরো অবয়বের অংশ। পপি ভেবে দেখেছে, তার পরও ছেলেটির প্রতি ওর মুগ্ধতা গাঢ় হয়। ও দারুণ প্রদর্শনীর আয়োজন করছে। প্রদর্শনীর নাম ‘ঝরাপাতা’। শুধু ঝরাপাতার ছবি তুলেছে ও। দর্শনার্থীরা কমবেশি সবাই প্রদর্শনীটি দেখে উচ্ছ্বসিত। নানা প্রশংসার গুঞ্জনেও ছেলেটির চোখে বিষণ্নতা কাটে না। মুখজুড়ে হাসির আনন্দ-উদ্ভাস নেই। পপির ভাবনা হয়। পরমুহূর্তে মুগ্ধতার তোড়ে অকারণ ভাবনা উড়িয়ে দেয়। ভাবে, ও এমনই ছেলে। নিজের ভেতরে গুটিয়ে থাকে। ১৫ দিনের এক দিনও পপি এক্সিবিশন দেখতে যাওয়া ছাড়েনি। প্রতিদিন যেত—অনেকক্ষণ ধরে একটি ছবি দেখত। ওর এই ভালোবাসায় ছেলেটি আকৃষ্ট হয়েছিল। বলেছিল, ‘এমন করে কেউ ছবি দেখে, তা আমি জানতাম না।’
পপি মৃদু হেসে বলেছিল, ‘দেখতে তো হবেই। এ যে সব অন্য রকম ছবি। এমন করে ঝরাপাতার এত দিক ধরা যায়, তা আমার জানা ছিল না। এর পেছনে ক্যামেরা-শিল্পীর অনেক সাধনা আছে। মগ্নতাও আছে বলা যায়। আবার বিমূর্ততাও আছে নিঃসন্দেহে।’
পলাশ আকস্মিকভাবে চমকে উঠে বলেছিল, ‘বাবা! এতকিছু? তারপর থিতিয়ে চুপ থেকে বলেছিল, ছবির অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মই আমার প্রিয়।’
পপি কথা বাড়ায়নি। চুপ করে ছিল ওর কাছ থেকে আরও কিছু শোনার আশায়। ও তখন গলার ধ্বনি উচ্চকিত করেছিল নিজের ভাবনার সূত্র মেলে ধরার জন্য। বলেছিল, ‘ঝরাপাতার ছবি তোলার আইডিয়া আমার বাবা দিয়েছেন। বলেছেন, পাতা শুধু গাছ থেকে ঝরে না। মানুষের জীবন থেকেও নানা কিছু ঝরে। ভাবনা, ভালোবাসা, সময়, বয়স, দিন—এমন অনেক কিছু ঝরে। তুমি ঝরাপাতার মধ্যে মানুষের জীবনকে ধরে রাখো। বিভিন্ন ফর্ম ব্যবহার করে ছবি তোলো। আমি সেভাবে চেষ্টা করেছি।’
‘চেষ্টা দারুণ সফল হয়েছে। ঝরাপাতার কত বিচিত্র দিক ধরা পড়েছে। কোনোটা গাছের ডালে আটকে আছে, কোনোটা গাছ থেকে পড়তে পড়তে ক্যামেরাবন্দী হয়েছে—কোথাও গাছের নিচে পাঁচ-দশটা পাতা এলোমেলো পড়ে আছে—কোথাও পাতার গাদা-স্তূপ—নাহ্, আর বর্ণনা করতে পারব না।’
‘আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ছাব্বিশে মার্চের পরে ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় অনেক কিছু দেখেছিলেন। সেখান থেকে তাঁর এই আইডিয়া আসে। তিনি আমাকে ছাব্বিশের সকালের ঢাকার বর্ণনার কয়েকটি লাইন মুখস্থ করিয়েছিলেন।’
‘কার লেখা?’
‘সাংবাদিক সায়মন ড্রিং।’
‘ওহ্ আচ্ছা। তিনি আমারও খুব প্রিয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।’
পলাশ চুপ করে থাকে। তারপর আলতো করে পপির হাত ধরেছিল। এভাবে শুরু। তারপর সম্পর্ক আর একটু গড়িয়ে যায়। পপির মনে হয়, ওকে পেয়ে পলাশের একটি আশ্রয় হলো, এমন ভঙ্গি ওর মধ্যে ফুটে থাকে, উজ্জ্বলতাও থাকে। দিন গড়ালে সম্পর্ক আরেকটু বাড়ে। একদিন ছেলেটি মেয়েটিকে বলে, ‘চলো যাই।’
মেয়েটি ভুরু কুঁচকে ইশারা করে। মুখে কিছু না বলে জানতে চায়, ‘কোথায়?’ ছেলেটি চুপ করে থাকে। নিজেকেই প্রশ্ন করে, ‘তাই তো। কোথায়?’ ছেলেটি জানে এই শহরে মনমতো জায়গা নেই, যেখানে ওরা যেতে পারে। প্রবল বিষণ্নতায় কুঁকড়ে আছে এই শহর।
মেয়েটি মৃদুস্বরে বলে, ‘আমাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তো কী হয়েছে! একদিন আমাদের ঘর হবে।’
‘ঘর?’ ছেলেটি প্রবলভাবে চমকে ওঠে।
‘এই ছোট্ট শব্দটি শুনে তুমি এভাবে চমকে উঠলে যে?’
ছেলেটি ঢোঁক গেলে এবং দম নেয়। মেয়েটির দিকে বস্ফািরিত চোখে তাকিয়ে থাকে। ওর আয়ত চোখের পাতায় কালো মেঘ জমাট হয়ে থাকে। মেয়েটির মুগ্ধতা প্রবলভাবে গাঢ় হয়। ও নিজের আয়ত চোখ নিজের চোখের ওপর রেখে বলে, ‘পলাশ, তুমি আমার হাত ধরে রেখেছ।’
‘পপি একটি ফুলের নাম। পলাশও তা-ই। আমি ফুলের ছবি তুলতে ভালোবাসি, পপি। আমি তোমাকে আমার কালেকশন দেখাব। পোকামাকড়ও আমার প্রিয়। অনেক ছবি তুলেছি। নিজেকে ভেবেছি পোকার মতো। আমার জন্মের আগে আমার বাবা এই শহরকে খুব বিষণ্ন দেখেছিলেন একদিন। শুধু সায়মন ড্রিং দেখেননি। বাবাও দেখেছিলেন। তখন আমার জন্ম হয়নি। বাবা যে আমাকে কয়েকটি লাইন মুখস্থ করিয়েছিলেন, সেই শব্দের ভেতর আমি আমার এই সময়ের শহরকে খুবই বিষণ্ন দেখি।’
‘তুমি আমার হাত ধরে রেখেছ পলাশ।’
‘তুমি যদি বসন্তের কোনো ফুল হও, তবে আমি সেই ফুলের ওপর মৌমাছি। আমি এক বিশাল মধুর চাক বানাব, যেখানে হাজার হাজার মৌমাছির সঙ্গে আমি নিজেও একটি পোকা হব।’
‘পলাশ, আমার হাত তুমি ছেড়ে দাও। এবার তোমার...’
পলাশ হাত ছেড়ে দিয়ে বাবার শেখানো লাইনগুলো আবৃত্তি করতে থাকে। সায়মন ড্রিং লিখেছেন, ‘ভোরের কিছু আগে গুলিবর্ষণ থেমে গেল এবং সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এক ভীতিজনক নিঃশব্দতা শহরের ওপর চেপে বসল, ফিরে আসা দু-তিনটি ট্যাংকের শব্দ, মাঝে মাঝে কনভয়ের শব্দ ও কাকের চিৎকার ছাড়া সম্পূর্ণ শহর মনে হচ্ছিল পরিত্যক্ত এবং মৃত।’
পপি জোরের সঙ্গে বলে, ‘তোমার বাবার মতো মুক্তিযোদ্ধারা এই শহরটাকে ওই অবস্থা থেকে বের করে এনেছিলেন। যুদ্ধ করে। কঠিন যুদ্ধ। এখন যুদ্ধ নেই শহরে।’ 
‘আছে। অন্য রকম যুদ্ধ।’
‘অন্য রকম যুদ্ধ তো মানুষের জীবনে সারা জীবন থাকে।’
পলাশ ওর কথার উত্তর দেয় না। অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকায়। পপি ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারে না। অনুভব করে, পলাশ এক নয়, দুই। ওর ভেতরে আরেকজন কেউ আছে। শুনতে পায় ও বিড়বিড় করে বলছে, ‘এই শহরটা এত বিষণ্ন কেন?’ মনে হয় বিষণ্নতার দেয়ালে ও আটকে আছে। কখনো আর বের হতে পারবে না। 
‘তুমি জানো না পপি, আমি মিউজিকেও বিষণ্নতা পাই।’
‘তোমার কি একজন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যাওয়া দরকার পলাশ?’
‘ছেলেটি রেগে গিয়ে বলে, তুমি আমাকে ইনসাল্ট করছ।’
‘মোটেই সে জন্য বলিনি। তুমি কয়েক মাসের জন্য সিডনি থেকে এসেছ। তোমার তোলা ফটোর এক্সিবিশন হয়েছে। তুমি আবার ছবি তুলবে। ক্যামেরা তোমার উইপন। তোমার ছবি কথা বলে, আমি তোমাকে এভাবেই বলেছি।’ 
‘ঠিকই বলেছ। ইউ আর এ প্রিটি ওম্যান।’
‘আমি তোমাকে ইনসাল্ট করতে চাই না। বিষণ্নতার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব নেই।’
‘ওকে। চলো, কোথাও যাই।’
‘লালবাগ কেল্লায় চলো যাই। একসময় ওখানে শত শত কবুতর থাকত। কবুতরের বাকুম বাকুম তোমাকে...’
‘থাক, পপি।’
মেয়েটির কথা শেষ করতে না দিয়ে ছেলেটি ওর হাতে যেন অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য মাত্র। আবার ছেড়ে দেয় হাত। পপির প্রবল ইচ্ছে সত্ত্বেও ওর নিজের হাত আর বাড়াতে পারে না ছেলেটির হাতের দিকে। বুঝতে পারে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে চলে গেছে ছেলেটি। সেখানে ওর হাত পৌঁছাবে না। ওর বুকের ভেতরে কট করে শব্দ হয়। ও অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরায়। দেখতে পায়, বকুলতলার সামনের বুনোগাছের ওপর আশ্চর্য সুন্দর দুটো প্রজাপতি বসে আছে। পপি ঘুরে পলাশের দিকে তাকালে দেখতে পায়, ওর দৃষ্টি প্রজাপতির ওপর নেই। ও অন্য কোনো দিকে তাকিয়ে আছে। কোন দিকে তাকিয়ে আছে বোঝা যায় না। ওকে খুবই অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। পপির মন খারাপ হয়। 
পলাশের বাবার বাড়ি গেন্ডারিয়ায়। একদিন পপিকে দীননাথ সেনের বাড়িতে নিয়ে যায় পলাশ। ওর সিডনিতে ফেরার সময় হয়েছে। সামনে পাঁচ দিন বাকি। ও ঠিক করেছে পপিকে বাবার সামনে নিয়ে যাবে। বাবার কাছ থেকেই বিষণ্ন শহরের গল্প শুনবে পপি। 
গেন্ডারিয়ার বাড়িতে গিয়ে বয়সী মানুষটিকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে পপি। বলে, ‘আমি জানি, আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।’ 
‘হ্যাঁ, পলাশকে আমি ২৬ মার্চের ওপর লেখা কয়েকটি লাইন আমি মুখস্থ করিয়েছিলাম। ওর বয়স তখন আট বছর।’ 
‘ওই লাইন কয়টি কেন আপনার মনে ছিল?’
‘ওকে বুঝতে দিতে চেয়েছিলাম যে কোনো বিপর্যয়ের পরে মানুষকে উঠে দাঁড়াতে হয়। তার সামনে লড়াই থাকে।’
‘পলাশ কতটুকু বুঝতে পেরেছে?’
‘সবটুকু বুঝেছে। ও নির্ভয়ে বুঝেছে।’
‘নির্ভয়ে?’ পপির বুকের ভেতর কট করে শব্দ হয়। ভাবে, পলাশ এ ঘরে আসে না কেন। ওকে বসিয়ে রেখে গেল তো গেলই। ওর মনে হয়, ওর ভয় করছে। 
বয়সী মানুষটি বলেন, ‘৭ মার্চ ওর ফ্লাইট। এই শহরে ও আর ফিরতে পারবে কি না আমি জানি না।’ 
চমকে উঠে পপি বলে, ‘কেন? ফিরতে পারবে না কেন?’
‘ও এখন লড়াই করছে। লড়াই করতে করতে ওর দিন ফুরিয়ে যাবে।’ 
‘মানে? আমি বুঝতে পারছি না।’
‘ঝরাপাতা নামের এক্সিবিশন ওর লড়াই। তোমার সঙ্গে কতগুলো অন্তরঙ্গ দিনের স্মৃতি ওর লড়াই।’
পপি নিশ্চুপ থাকে। ভাবে, কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার শক্তি ওর ফুরিয়ে গেছে। এখন ও শুধুই শুনবে। তার পরও আকস্মিকভাবে জিজ্ঞেস করে, ‘পলাশ চলে গেলে এই শহর কি পরিত্যক্ত এবং মৃত হয়ে থাকবে?’
‘না। একদমই না। কারণ, লড়াই করে ও জিতেছে। সজীব শহরের স্মৃতি নিয়ে ও ফিরে যাবে।’ 
‘কীভাবে জিতল? ওর লড়াই কার সঙ্গে?’
‘ও ক্যানসারে আক্রান্ত। হিজ ডেইজ আর নাম্বারড।’
‘উহ্।’ পপির কণ্ঠে অস্ফুট ধ্বনি। মাথা ঝুঁকে যায় বুকের ওপরে। 
‘ও কীভাবে জিতেছে শোনো। মানুষের মুখে মুখে ওর এক্সিবিশনের কথা রয়ে যাবে। আর ওর স্মৃতি জমা রেখেছে তোমার কাছে। এসবের মধ্যেই ওর জেগে ওঠা।’ 
ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে পপি। 
বয়সী মানুষটির হাত ওর মাথার ওপর। 
মানুষটির গাল বেয়ে গড়ায় অশ্রুধারা। গড়াতেই থাকে।
Prothom Alo

No comments:

Post a Comment