Thursday, March 20, 2014

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা


এই উপন্যাসটি ইদানীং কালের বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সংযোজান। আমার তো মনে হয়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংযোজন। না, কথাটা বলার সময় আমার বুক কাঁপলো না। কয়েক বছর (অন্তত ২১ বছর) ভেবে কথাটা বলেই ফেললাম। আর কেউ কথাটা আগেই বলেছেন কি না আমার জানা নেই। না বললেও আখতারুজ্জামানের (ওরফে মঞ্জু'র) কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু মন্তব্যটি বাগাড়ম্বর নয়। উপন্যাসটা মনোযোগ দিয়ে পড়ার পর আপনাকেও বোধকরি কথাটা স্বীকার করতে হবে। এমন জীবন্ত আর অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে গেঁথে তোলা মহাকাব্যিক পরিসরে লিখিত আর কোনো উপন্যাসের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আমার কথা মানতে না চান তো বইটা দয়া করে পড়ে দেখুন। এই উপমহাদেশের যে-কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বংলাভাষা পড়ানো হয়, সেগুলির সব কটিতে খোয়াবনাম পাঠ্য ছিলো বা আছে। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হবার পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত বইটির চোদ্দবার পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। বাংলা কথা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব মাহাশ্বেতা দেবী বইটি সম্পর্কে বলেছেন, "কি পশ্চিমবাংলা কি বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি (ইলিয়াস) শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখক। ইলিয়াসের পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।" মন্তব্যটি একজন মহান সাহিত্য স্রষ্টার বিনয়জাত অতিশয়োক্তি হয়তো, তবু সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের এক শীর্ষ ব্যক্তিত্বের এই সশ্রদ্ধ উদার স্বীকৃতি ঔপন্যাসিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অবস্থানটিকে সুচিহ্নিত করে দিয়েছে।
"খোয়াবনামা" সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত গৌরববোধের জায়গাটা হচ্ছে উপন্যাসটির গবেষণা ও নির্মাণ পর্বে আমি মঞ্জুর কাছাকাছি থেকে সঙ্গ দিতে পেরেছিলাম। ওঁর সাথে দুর্গাহাটা, গাবতলী, গোলাবাড়ি, সিমাবাড়ি, সারিয়াকান্দি, যমুনার চরাঞ্চল, বাঙালি নদীর আশেপাশের অসংখ্য গ্রাম-গঞ্জ, বিল, হাট-বাট-মাঠে ঘুরে বেরিয়েছি। রাতে মসজিদে থেকেছি। অসংখ্য মানুষের সাথে সে কথাবার্তা বলেছে নানা বিষয়ে। কত রকমের ধান জন্মে, সেগুলোর নাম কি, চাষের পদ্ধতি কি, চাষের প্রক্রিয়া, চাষের মৌসুম, ধান কাটাই-মাড়াই, ধান ঝাড়াই, ধান সংরক্ষণ, দর ইত্যাদি সবিস্তার গবেষণা। এই কারণেই গ্রাম্য জীবনের বিবরণগুলি এত নিখুঁত আর সপ্রাণ।
সমগ্র খোয়াবনামা জুড়ে শুধু মানুষ ---মানুষের ভীড়। মানুষের কথা। তাদর জীবন প্রণালী, সমাজজীবন, আশা-আকাঙ্খা, জীবনের যন্ত্রণা, প্রেম, বিশ্বাস, ইতিহাসলগ্নতা, ঐতিহ্য, মিথষ্ক্রিয়া--জীবনকে প্রতিফলিত করতে যা কিছু প্রয়োজন --সবকিছু এতে বর্ণীত হয়েছে। জীবনে মিথের শক্তি স্বীকার করতে হাবে, মিথ ছাড়া জীবন চলতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ট্যাবুতে পরিণত হচ্ছে। মিথের সঙ্গে জীবনকে গেঁথে দেওয়া একমাত্র খোয়াবনামা ছাড়া অন্য কোনো বাংলা উপন্যাসে নেই।
"মেলা দিন আগেকার কথা। কাৎলাহার বিলের ধারে ঘন জঙ্গল সাফ করে সোভান ধুমা আবাদ শুরু করে বাঘের ঘাড়ে জোয়াল চাপিয়ে। ওইসব দিনের এক বিকালবেলা মজনু শাহের অগুনতি ফকিরের সংগে মহাস্থান গড়ের দিকে যাবার সময় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সেপাই সর্দার টেলরের গুলিতে মারা পড়ে মুনসি বায়তুল্লা শাহ। কাৎলাহার বিলের দুই ধারের মানুষ সবাই জানে, বিলের উত্তরে পাকুড়গাছে আসন নিয়ে রাতভর বিল শাসন করে মুনসি। দূরে কোথাও ভূমিকম্প হলে যমুনা বদলে যায়। বন্যায় ভেঙে পড়ে কাৎলাহারের তীর। মুনসির নিষ্কন্টক অসিয়তে চাষীরা হয় কাৎলাহার বিলের মাঝি।"
খোয়ানামার শুরু। মিথের সাথে জীবনকে কী আসাধারণ নৈপুণ্যে গেঁথে দিলেন ইলিয়াস।
উপন্যাসে নায়ক আছে, নাম নেই। গোটা খোয়াবনামায় সে শুধুই তমিজের বাপ। " মুনসির শোলোকে শোলোকে মানুষের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বেড়ায় চেরাগ আলী ফকির। তমিজের বাপ শোলোক শোনে আর ঘুমের মধ্যে বিলে গিয়ে কাদায় পা ডুবিয়ে দেখতে চায় পাকুড় গাছের মুনসিকে। ভবানী পাঠকের সঙ্গে পূর্বপুরুষের জের টেনে বৈকুন্ঠনাথ গিরি প্রতীক্ষা করে ভবানীর শুভ আবির্ভাবের। তমিজ দেখে জমির স্বপ্ন। আর চেরাগ আলির নাতনি কুলসুম খোয়াবে কার কায়া যে দেখতে পায় তার দিশা পায় না। তেভাগার কবি কেরামত শেষ পর্যন্ত আটকে পড়ে শুধুই নিজের কোটরে, সে নাম চায় বৌ চায় ঘর চায়।"
ইলিয়াস অত্যন্ত স্বল্পপ্রজ লেখক। দশ বছরের ব্যবধানে দুটি মাত্র উপন্যাস, সমগ্র লেখক জীবনে পাঁচটি গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ সঙ্কলন ছাড়া তাঁর লেখা নেই।
আমার মনে হয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের কয়েকটি মাত্র উপন্যাস পড়লে গোটা বাংলা উপন্যাসে স্বাদ নেয়া হয়ে যায়। বঙ্কিমের দুর্গেশনন্দিনী; টেকচাঁদ ঠাকুরের আলালের ঘরের দুলাল; তারাশঙ্করের গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম, হাসুলি বাঁকের উপকথা; বিভূতিভূষণের অপরাজিত, পথের পাঁচালী; মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা; সতীনাথ ভাদুড়ির ঢোঁড়াই চরিত মানস; শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসি; অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে; শহীদুল্লাহ কায়সারের সংশপ্তক; হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি, সাবিত্রী উপাখ্যান; সৈয়দ শামসুল হকের নাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নুরলদীনের সারাজীবন; শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন; হূমায়ুন আহমদের জ্যোৎস্না জননীর গল্প এবং অবশ্যই ইলিয়াসের চিলেকোঠার সিপাই, খোয়াবনামা।
আগের কথায় ফিরে আসি। ইলিয়াসের রচনাশৈলী (personal ideosyncrasy of expression) এক কথায় অননুকরণীয়। এখানে খোয়াবনামা থেকে দুটি অংশ উদ্ধৃত করছি। বাংলা বাক্যে ক্রমাগত অসমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহার করে ইচ্ছেমত লম্বা করা যে যায়, এগুলি তার নিদর্শনঃ
"পায়ের পাতা কাদায় একটুখানি গেঁথে যেখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গলার রগ টান্টান করে যতোটা পারে উঁচুতে তাকিয়ে গাঢ় ছাই রঙের মেঘ তাড়াতে তমিজের বাপ কালো কুচকুচে হাত দুটো নাড়ছিলো, ঐ জায়গাটা ভালো করে খেয়াল করা দরকার।"
"--- মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে লম্বা তালগাছের তলায় পুরনো উঁইঢিপির সামনে খটখটে শক্ত মাটিতে পাজোড়া জোরে চেপে রেখে ঘাড়ের রগ টানটান করে মাথা যতোটা পারে উঁচু করে চোখের নজর শানাতে শানাতে সখিনা তাকিয়ে থাকে কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে জখম চাঁদের নিচে জ্বলতে-থাকা জোনাকির হেঁসেলের দিকে।"
ক্যানসারের হাতে পরাস্ত না হলে আমরা তাঁর হাত থেকে আর একটি উপন্যাস পেতাম মহাস্থান গড় থেকে মজনু শাহের ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পরিচালনার বিষয় নিয়ে। মহাশ্বেতা দেবীকে তাই লিখেছিলেন।


  • ক্যাটেগরি: 
    • বই
      • https://www.amarblog.com/index.php?q=Narahari-Kabiraj/posts/169441

No comments:

Post a Comment