Saturday, August 2, 2014

রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী বিচার

রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে
যুদ্ধাপরাধী বিচার
বিকাশ দত্ত ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। দেশের আইনজীবী ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ রায় ঘোষণার দেরিতে ক্ষুব্ধ হলেও তাঁরা আশা করছেন আগস্টে নিজামীসহ একাধিক মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে। আপীল বিভাগ ও দুটি ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৫টি মামলা রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। চলতি মাসে ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি মামলা বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি (অপেক্ষমাণ) রাখা হতে পারে। সেদিক দিয়ে অপেক্ষমাণের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক জনকণ্ঠকে বলেছেন, অন্যান্য মামলার চেয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা সম্পূর্র্ণ ভিন্নধর্মী। এখানে প্রতিটি মামলার জন্য অনেক সাক্ষী রয়েছেন। মামলার ডকুমেন্টের সংখ্যাও প্রচুর। পাশাপাশি অভিযোগের সংখ্যা বেশি। আর এ সমস্ত অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য প্রসিকিউশন পক্ষকে অনেক খাটতে হয়। নানাভাবে মামলার সপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনসহ ডকুমেন্ট উপস্থাপন করতে হয়। ফলে একটি মামলার শুনানিসহ যুক্তিতর্ক করতে অনেক সময় প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই এ সমস্ত মামলায় দীর্ঘসময় পর রায় হয়ে থাকে। কিন্ত তা সত্ত্বেও সাধারণভাবে এ সব জিনিসগুলো সম্পর্কে সবার ওয়াকিফহাল না থাকার কারণে রায়ের দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিভিন্ন জল্পনাকল্পনার সৃষ্টি করছে। ড. শাহদীন মালিক আরও বলেন, এ অবস্থায় অপেক্ষমাণ থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায়গুলো যাতে তাড়াতাড়ি ঘোষিত হয়- সেটাই কাম্য। আশা থাকবে যে সমস্ত মামলা সিএভি আছে সেগুলোর রায় আগস্ট মাসের মধ্যেই পেয়ে যাব।
এর আগে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি রাখার পর ২৪ থেকে ২৭ দিনের মধ্যে মামলাগুলোর রায় ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া মুত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা আপীল বিভাগে নিষ্পত্তি হয়েছে। ১৬ এপ্রিল রায় ঘোষণার জন্য আপীল বিভাগে অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। সিএভি রাখার পর আজ সাঈদীর মামলার ১১০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এর পর জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মামলা চার দফায় সিএভি রাখা হয়েছে। সর্বশেষ সিএভি রাখা হয় ২৪ জুন। জামায়াতের নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য মীর কাশেম আলীর মামলায় সিএভি রাখা হয় ৪ মে। বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয় ১৭ এপ্রিল। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেনের মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি রাখা হয় ২ জুন। সেদিক দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি রাখার পর আজ পর্যন্ত মতিউর রহমান নিজামীর মামলা ৪১ দিন, মীর কাশেম আলীর ৯২ দিন, জাহিদ হোসেন খোকনের ৭৯ দিন ও মোঃ মোবারক হোসেনের ৬৩ দিন হয়েছে। কিন্তু কোন মামলার রায় ঘোষণা করা হয়নি।
এ বিষয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির জনকণ্ঠকে বলেছেন, আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হয়েছে কিন্তু রায় ঘোষণা করতে দেরি হচ্ছে। এ বিষয়ে বোধগম্যের কারণ নেই। একমাত্র ট্রাইব্যুনাল ও আইনমন্ত্রীই বিষয়টি বলতে পারেন। এত দিন কেন লাগবে রায় দিতে? সরকারে যাঁরা আছেন তাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে। বাজারে অনেক কিছু কানাঘোষা শোনা যাচ্ছে। এই গড়িমসি গুজবকেও শক্তিশালী করবে। যদি গুজবটি সত্য হয় তাহলে আত্মঘাতী হবে। জনগণ আশা করেন যারা দায়ী তাদের প্রত্যেককেই জবাবদিহি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত জনকণ্ঠকে বলেছেন, জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী অসুস্থ হওয়ার কারণে তার মামলার রায় ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। আশা করি আগস্ট মাসের মধ্যে নিজামীসহ অন্যান্য যে সমস্ত মামলা সিএভি আছে সেগুলোর রায় ঘোষণা করা হতে পারে। জনগণের যে আকাক্সক্ষা সে আকাক্সক্ষা পূর্ণ হবে। এটা আশা করতেই পারি জনগণের অংশ হিসেবে।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইবু্যুনালকর্তৃক মুত্যুদ-প্রাপ্ত জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপীল বিভাগে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি শেষে রায় ঘোষণার জন্য ১৫ এপ্রিল অপেক্ষমাণ রাখেন প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। বেঞ্চের অপর সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। সিএভি ঘোষণার পর আজ এ মামলার ১১০ দিন পূর্র্ণ হলো। উল্লেখ্য, সুপ্রীমকোর্টে বর্তমানে অবকাশকালীন ছুটি চলছে। ছুটি শেষে ৩১ আগস্ট সুপ্রীমকোর্ট খুলবে।

মতিউর রহমান নিজামী
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের আমির বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি মতিউর রহমান নিজামীর মামলার রায় ঘোষণার জন্য চার দফা সিএভি রাখা হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ জুন মতিউর রহমান নিজামী অসুস্থ হয়ে পড়লে রায় ঘোষণা না করে আবার সিএভি রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এখন যে কোন দিন এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২৪ জুন এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের ২৮ মে বিচার শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৬ নবেম্বর প্রসিকিউশন পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। ৭ নবেম্বর আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। ১৩ নবেম্বর আসামি পক্ষের সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। একই দিন ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। উল্লেখ্য, গত বছরের ১৩ নবেম্বর মাওলানা নিজামীর পক্ষের সিনিয়র আইনজীবীরা আদালতে না আসায় মামলার রায় যে কোন দিন দেয়া হবে মর্মে অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখে দেয় ট্রাইব্যুনাল। এরপর ১৪ নবেম্বর আসামি পক্ষের আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ফের যুক্তি উপস্থাপনের সময় দেন। ১৯ নবেম্বর নিজামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। ২০ নবেম্বর আসামি পক্ষের আইনজীবী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এর পর ট্রাইব্যুনাল ২০ নবেম্বর আদেশে ১৩ নবেম্বরের সিএভি আদেশই বহাল রাখে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসা বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে গেলে এই ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২৪ মার্চ যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। অবশেষে রায় ঘোষণার জন্য ২৪ জুন দিন নির্ধারণ করা হয়। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও ওই দিন জানা যায় মতিউর রহমান অসুস্থ। ট্রাইব্যুনাল সে দিন রায় ঘোষণা না করে আবারও চতুর্থ দফায় সিএভি রাখেন।
খোকন রাজাকার
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা পলাতক নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র এম এ জাহিদ হোসেন খোকনের মামলাটি ১৭ এপ্রিল রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। মামলাটি রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ।
মীর কাসেম আলী
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য মীর কাসেম আলীর মামলার কার্যক্রম শেষ হয় ৪ মে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলাটি রয়েছে।
মোবারক হোসেন
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত রাজাকার কমান্ডার মোবারক হোসেনের মামলাটি ২ জুন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে ট্রাইব্যুনাল-১ এ।
চার বছরে নয় মামলা
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এ পর্যন্ত নয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালে দেয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামি আব্দুল কাদের মোল্লার আপীল বিভাগে চূড়ান্ত বিচারে মুত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। তার রায়ও কার্যকর করা হয়েছে। এখন আপীল বিভাগে রায় ঘোষণার জন্য জামায়াতের অপর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলাটি সিএভি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলাটি আপীল বিভাগে শুনানি চলছে। দুটি ট্রাইব্যুনালে যে সমস্ত মামলার রায় ঘোষণা করেছে তার মধ্যে রয়েছে- বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, গোলাম আযম, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আব্দুল আলীম, চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আলী আশরাফ।
দুই ট্রাইব্যুনালে চার মামলা
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এ মোট চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম, আব্দুস সুবহান ও ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার। এর মধ্যে সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন পক্ষ যুক্ততর্ক শুরু করেছেন। অন্যদিকে এটিএম আজহারুল ইসলামের পক্ষে সাফাই সাক্ষী শুরু হয়েছে। আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে এখন সাক্ষী চলছে। আর জব্বারের বিরুদ্ধে মামলাটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
যাদের তদন্ত চলছে
অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা বেশ কয়েকটি মামলা তদন্ত করছে। তার মধ্যে রয়েছে- বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, রুস্তম আলী, আমজাদ মিনা, যশোরের মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, আলবদর বাহিনীর উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, মোঃ নাসির ও আতাউর রহমান। একই সঙ্গে ক্রিমিনাল সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থা চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করলেও সেটির কাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment