Saturday, August 2, 2014

গাজা উচ্ছেদে ইসরাইলী মরণ আক্রমণ

গাজা উচ্ছেদে ইসরাইলী মরণ আক্রমণ
নাদিরা মজুমদার
২০১৩ সালের নবেম্বর মাস তখন! অনেক টানাহেঁচড়া করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯১টি সদস্য দেশের মধ্যে মাত্র ১১০টি দেশ ২০১৪ সালকে ‘ফিলিস্তিনীদের সঙ্গে সহমর্মিতার বছর’ ঘোষণার বিলটি শেষ পর্যন্ত পাস করিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। বিলের বিপক্ষে ছিল ইসরাইল এবং ইংরেজী ভাষাভাষি ‘পাঁচ-ই’ দেশ (অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড) আর যে ৫৬টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে, তাদের অধিকাংশের ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপে এবং পৃথিবীর হরেক জায়গার হরেকরকমের কয়েকটি দেশ। অপরদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফিলিস্তিন নীতির প্রশ্নে জাতিসংঘ গৃহীত নীতির সমর্থক বলে দাবিটাবি করলেও, ইইউর সদস্য দেশগুলো সাধারণ পরিষদের এই ভোটাভুটির সময় কিন্তু ইসরাইলের পক্ষেই থেকে যায়। ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রচেষ্টার একচ্ছত্র গ্লোবাল মুরব্বি যুক্তরাষ্ট্র, সঙ্গে ছায়ার মতো রয়েছে যুক্তরাজ্যসহ ইইউ। মধ্যপ্রাচ্যে, অনেককাল ধরেই, ‘এন্ডগেমের মহড়া চলে আসছে, শেষ কবে হবে কে জানে!!’ বা তাড়াহুড়োর কি দরকার রয়েছে? না, নেই। ফলে, ওয়াশিংটনে পালা করে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আসে, রিপাবলিকান চলে যায়, আসে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট, ডেমোক্র্যাটকে সরিয়ে আসে রিপাবলিকান, ডেমোক্র্যাটÑ অর্থাৎ দল বদলে যে-ই প্রেসিডেন্ট হোন না কেন, তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্য এজেন্ডার পবিত্র দায়-দায়িত্ব নিয়ে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ‘শান্তি আলোচনা’ নিয়ে ছোটাছুটি করেন! ইসরাইল- ফিলিস্তিন এজেন্ডা আসলে ‘নেভার এন্ডিং এজেন্ডা’; এর শুরু একদিন একটা ছিল, শেষ কবে- দিনক্ষণ নেই।
ওসমানিয়া সাম্রাজ্যকে খ- বিখ- করে মধ্যপ্রাচ্যে যে কয়টি দেশের জন্ম দেয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিষধর বিষফোঁড়াটি হলো ফিলিস্তিন। আসলে, দেশ নামক আইডেনটিটি পাওয়ার সৌভাগ্য ফিলিস্তিনের হয়নি কোনদিনই; বরং কালক্রমে সে এক ইমাজিনারি ‘ফিলিস্তিনী’ ভূ-খণ্ডে পরিণত হয়েছে। সবটুকু জমি অধিকৃত ভূ-খ- হয়ে রয়েছে।
সামান্য পূর্ব ইতিহাসের কথা বলা যাক। জাতিসংঘের পার্টিশন প্ল্যানমাফিক ১৯৪৮ সালের ১৫ মে যখন ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘোষিত হয়, ঠিক একই সময়ে প্রথমেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আইনগত প্রতিষ্ঠা ঘোষণার বদলে মিসর, ইরাক, ট্রান্স-জর্দান (আধুনিক জর্দান) ও সিরিয়া ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইসরাইলের তাতে লাভই হয়। জেরুজালেমের পশ্চিমাংশ ও পশ্চিম তীরের খানিকটাসহ ফিলিস্তিনের প্রাপ্য ভূ-খ-ের ৬০ শতাংশ সে সংযুক্ত করে নেয় এবং দখলিকৃত পশ্চিম জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে বসে। ফলে, সবার শহর ‘জেরুজালেম,’ জাতিসংঘের সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন চিরকালের জন্য বিস্মৃতিতে হারিয়ে যায়। রাষ্ট্রবিহীন ফিলিস্তিনীদের নতুন মুরব্বি দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আসে; ফলস্বরূপ ট্রান্সজর্দান পশ্চিম তীরের বাকি অংশ ও পূর্ব জেরুজালেম এবং মিসর গাজা স্ট্রিপকে নিজের দখলে নিয়ে নেয়। তবে অতি চালাকের গলায় দড়ি বলে প্রবাদ রয়েছে বৈকি! ১৯৬৭ সালের ইয়োম কিপুরের ছয়দিনের যুদ্ধে ফিলিস্তিনীদের বাকি জমিজমা ও পূর্ব জেরুজালেম ইসরাইল দখল করে নেয় এবং জেরুজালেমের ‘কর্পুস সেপারাতুম’ স্ট্যাটাস ঘুচিয়ে তাবত জেরুজালেমকে নিজের রাজধানী ঘোষণা করে বসে। অদ্যাবধি ইসরাইল অনড় অটল; জেরুজালেম থেকে নড়বে না সে। ইত্যবসরে আবার গাজার উপকূল বরাবর রয়েছে ১.৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের ভণ্ডার!
সেই ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, আরব-ইসরাইল যুদ্ধের শেষের দিকে সাত সদস্যের আরব লীগের ছয়টি দেশ (জর্দানকে বাইরে রাখা হয়) Ñমিসর, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, সৌদি আরব ও ইয়েমেন মিসর অধিকৃত গাজায় সর্ব-ফিলিস্তিন সরকার গঠন ও স্বীকৃতি দেয়ার মহড়া করে বলা যায়। কারণ অন্য কোন দেশ সর্ব-ফিলিস্তিন সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান থেকে বিরত থাকে।
গাজা স্ট্রিপ ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬ থেকে ১২ কিলোমিটার চওড়া এক চিলতে জমি মাত্র; সাকল্যে ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভূ-খ-ে প্রায় দুই মিলিয়ন লোক গাদাগাদি করে বসবাস করছে। জনতার বিশাল বিরাট অংশই ফিলিস্তিন উদ্বাস্তুর দল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইলের কাছে গাজা খোয়ানোর আগ পর্যন্ত প্রশাসন ব্যবস্থা মিসরের হাতেই থাকে এবং অধিবাসীদের গাজার বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হতো না।
১৯৯৩ সালে ওসলো চুক্তির অধীনে ইসরাইল গাজার আকাশসীমা, ভূ-খণ্ডীয় জল-সম্পদ ও সীমান্ত চলাচল নিজের কর্তৃত্বাধীনে রেখে কেবল প্রশাসন ব্যবস্থাটি ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দেয়। এই ব্যবস্থায় ইসরাইল একতরফাভাবে আকাশপথ নিয়ন্ত্রণের সর্বময় ক্ষমতাধারী হয়। এক অর্থে তাই গাজা ও অন্যান্য অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনীরা আসলে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের জীবনযাপনে বাধ্য হয়। ভূ-খ-ীয় জল-সম্পদ ইসরাইলী কর্তৃত্বাধীন হওয়াতে বা সীমান্ত ক্রসিং একাধিক চেক-পয়েন্টের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় বলে, মানুষের স্বাধীন চলাচল ও ভ্রমণ নামক বিষয়টি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে একেবারেই বস্তিতর অবস্থায় নিয়ে আসে।
২০০০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০১ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে গাজা ও ইসরাইলের মধ্যে প্রতিবন্ধক দেয়াল তোলা হয়; ২০০৪ সালে গাজা স্ট্রিপ-মিসর সীমান্তের মধ্যেও কাঁটাতারের প্রতিবন্ধক দেয়াল গড়ে ওঠে। ফলে, গাজার অধিবাসীরা ইসরাইলী ও মিসরীয় প্রতিবন্ধক দেয়ালের পরিসরের মধ্যে দৈনন্দিন জীবনের ঘানি টানতে বাধ্য থাকে। অবশ্য জেরুজালেমের কেন্দ্রকে ভেদ করে পূর্ব-পশ্চিমকে বিভক্ত করে কাঁটাতারের বেড়া ও কংক্রিটের প্রতিবন্ধক তোলার এবং যাতায়াতের জন্য একটিমাত্র ক্রসিং পয়েন্টের ইসরাইলী ব্যবস্থা রাখার উদাহরণ অনেক আগে থেকেই ছিল। বলাই বাহুল্য যে ক্রসিং পয়েন্টগুলো সামরিক প্রহরাধীন বলে সবসময়ই চাপা উত্তেজনা, খ--যুদ্ধ কিংবা হাতাহাতি নিত্যদিনের ঘটনার মধ্যে পড়ে।
২০০৬ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে হামাস গাজা স্ট্রিপের ডি-ফ্যাক্টো প্রশাসকের ভূমিকা নেয়। ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে হামাস সন্ত্রাসী সংস্থা অথচ হামাস সুন্নি মুসলিম প্রধান সংস্থা; আবার, হামাস ও ফাতাহ নিজেদের মধ্যে একটা সমঝোতায়ও এসেছে। তা সত্ত্বেও গাজার অধিবাসীদের চলাচলের পথঘাটগুলো ইসরাইল ও মিসর বেশ করে সিল মেরে বন্ধ করে রেখেছে। চীন, রাশিয়া, লাতিন আমেরিকাসহ অন্য কিছু কিছু দেশ হামাসকে সন্ত্রাসী সংস্থা মনে করে না। তাতে অবশ্য পরিস্থিতির কোন রকমফের হচ্ছে না। তবে এভাবে সিল মারা অবস্থার সমাধান হিসেবে গাজা কর্তৃপক্ষ হিসেবে হামাস যদি ভূ-গর্ভস্থ টানেল নির্মাণ করে থাকে তো অবাক হওয়া কেন? ইসরাইল বা মিসর যদি সিলবন্দী অবস্থায় থাকত তো কী করত তারা?
যা হোক, হামাসের টানেল ধ্বংস এবং নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার অজুহাতে একতরফা ইসরাইলী ওজর-আপত্তির সৃষ্টি, বোমাবর্ষণ অবশ্য নতুন কোন ঘটনা নয়। হামাস বা গাজা বা যে কোথাও বোমাবর্ষণ করতে চাইলে, কারণ পেতে তো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়! হয় না। ফলে, বোমাবর্ষণ হয়েছে, হচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে আরও হবে ...। মিসরও তার সিনাই অঞ্চলকে সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর থাকবে।
কিন্তু ইরেজ ক্রসিং, রাফাহ ক্রসিং এবং পুবদিকের মালামাল পরিবহনের কারনি ক্রসিং বন্ধ রাখলে, কারও কিছুই যায় আসে না, দেখলে- স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আন্তর্জাতিক নৈতিকতাবোধ আর নেই; আর যখন কখনওবা ছিটেফোঁটা দেখা যায় তাও সংরক্ষিত থাকে কেবল সিলেকটিভ কেসের জন্য অথচ বার্লিন দেয়ালকে বিলি ব্র্যান্ট ‘ওয়াল অব শেম’ বলেছিলেন, এবং প্রেসিডেন্ট কেনেডি যখন বলেছিলেন ‘ইখ বিন আইন বের্লিনের’- আমরা কতই আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম! আর প্রেসিডেন্ট রিগান কয়েক বছর বাদে গর্বাচেভকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘টিয়ার ডাউন উইথ দি ওয়াল...!’ কিন্তু উপরোক্ত ক্রসিং পয়েন্টগুলোকে কেউ বলে না- ক্রসিংস অব শেম; বা ‘ইখ বিন আইন ফিলিস্তিনী’, বলার মতোও কেউ নেই যে!

হধফরৎধযসধলঁসফধৎ@মসধরষ.পড়স
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment