Tuesday, June 24, 2014

সুড়ঙ্গে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার...

সুড়ঙ্গে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার...

park
কৌশিক সরকার ও অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়

ময়দান ছাড়িয়ে পার্ক স্ট্রিটের দিকে সামান্য এগিয়েই অন্ধকার সুড়ঙ্গে থেমে গেল মেট্রো৷ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগের তিন ছাত্রী প্রথমে ভেবেছিলেন, রোজকার ব্যাপার৷ ঠিক ছাড়বে কিছুক্ষণের মধ্যেই৷

কিন্ত্ত ছাড়ল না৷ সুচিতা ঘোষ, রিয়া বণিক ও পিয়ালি সিংহ-- তিন সহপাঠীর কেউ কল্পনাই করতে পারেননি, ট্রেন ছাড়তে লেগে যাবে পৌনে দু' ঘণ্টারও বেশি! অনন্ত সে অপেক্ষায় ক্রমেই বেড়েছে উদ্বেগ, বিরক্তি, রাগ আর হতাশা৷ সর্বোপরি প্রাণসংশয়৷ আস্ত একটা ট্রেনের সব ক'টা লাইট-ফ্যান বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ অন্ধকার সুড়ঙ্গে অগুনতি যাত্রী ভয়ে-শ্বাসকষ্টে ক্রমেই কুঁকড়ে গিয়েছেন৷ তারই মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে চালকের মন্তব্যে৷ প্রশ্ন উঠেছে, কী ভাবে চালক অবলীলায় বলতে পারেন, 'ও কিচ্ছু না, ট্রেনটা শুধু খারাপ হয়ে গিয়েছে'? পৌনে দু' ঘণ্টার আতঙ্কের প্রহর শেষে যে উদ্ধার পাবেন, সে আশাও এক সময় ছেড়ে দিয়েছিলেন তিন বান্ধবী৷

শ্যামবাজার যাবেন বলে মাস্টারদা সূর্য সেন থেকে ট্রেনে উঠেছিলেন সুচিতা, রিয়া ও পিয়ালি৷ স্নাতকোত্তর প্রথম বর্ষের ছাত্রী পিয়ালির কথায়, 'ময়দান ও পার্ক স্ট্রিটের মাঝে ১৫ মিনিট আটকে থাকার পরেও যখন ট্রেনটা ছাড়ল না, তখনই কেমন সন্দেহ হল৷ উল্টো দিক থেকে দু'টো ট্রেন টালিগঞ্জের দিকে চলে যেতে দেখে সন্দেহটা আরও বাড়ে৷'

এরই মধ্যে একে-একে হঠাত্‍ নিভে গেল ফ্যান-লাইটগুলো৷ 'ব্যস৷ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল কামরার পরিবেশ৷ কী হল? আবার কেউ ঝাঁপ দিল নাকি?--কয়েক মিনিট এই প্রশ্নটাই ঘুরেফিরে আসছিল,' স্মৃতি হাতড়াতে গিয়েও কেঁপে উঠছিলেন সুচিতা৷ একে ভ্যাপসা-গুমোট, তার উপর ঘুটঘুটে অন্ধকার পাতালে থমকে থাকা একটা ট্রেন--ধীরে-ধীরে দুশ্চিন্তা বাড়ছিল যাত্রীদের৷ অফিসযাত্রী, স্কুল-কলেজযাত্রী থেকে শুরু করে শিশু অথবা বয়স্ক--একে-একে কামরার সকলকেই ততক্ষণে গ্রাস করেছে ভয়৷ 'আগুন-টাগুন লাগেনি তো?', 'কেউ কিছু ঘোষণা করছে না কেন?', 'বিনা টিকিটে উঠেছি নাকি?'--আতঙ্কের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে বিরক্তিও বাড়তে থাকে যাত্রীদের মধ্যে৷ দরজা-জানলায় ধাক্কা দিয়ে কিচ্ছু হবে না জেনেও সেই বৃথা চেষ্টাই করছিলেন কেউ-কেউ৷ 'বাচ্চাদের চিত্‍কার, বয়স্কদের অভিযোগ--স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, কেউ সাহায্য না-করলে মারাত্মক কিছু ঘটে যাবে৷ দরদর করে ঘামতে-ঘামতে মনে হচ্ছিল, স্রেফ দমবন্ধ হয়েই মরে যাব৷ দু'-এক জন যদি কামরায় মাথা ঘুরে পড়েও যান, কারও কিচ্ছু করার নেই', বলছিলেন রিয়া৷

কিন্ত্ত সাহায্যের জন্য এত চিত্‍কারের পরেও কোথায় কে? মোবাইলের আলো জ্বেলে এক ভেস্টিবিউল থেকে অন্য ভেস্টিবিউলে গিয়েও লাভ হয়নি৷ সুচিতার কথায়, 'প্রায় আধ ঘণ্টা পর পিছনের দিকের চালককে আসতে দেখলাম৷ 'কী হয়েছে?', 'কী হয়েছে?'--সবার একটাই প্রশ্ন৷' অগণিত যাত্রীর এই প্রশ্নের উত্তরে চালক যা বলেন, তাতে বিস্মিত, ক্ষুব্ধ সকলেই৷ রিয়ার বিস্ময়, 'কী অবলীলায় ওই ভদ্রলোক বললেন, 'ও কিচ্ছু না, ট্রেনটা খারাপ হয়ে গিয়েছে!' এমন সময়ই মাইকে ঘোষণা হয়: সামনের চালকের কেবিন দিয়ে এক-এক করে নামানো হবে যাত্রীদের৷ ঘোষণার পর মুহূর্তেই রাগে-বিরক্তিতে-ক্ষোভে ফেটে পড়েন সবাই৷ 'এতক্ষণ তা হলে কী করছিলেন ওঁরা?' প্রশ্ন পিয়ালির৷

এরপর শুরু হয় নামার পালা৷ 'একের পর এক কামরা টপকে চালকের কামরায় যখন পৌঁছলাম, তখন অবস্থা আরও খারাপ৷ রেলকর্মীদের এক জন বললেন, 'ম্যাডাম, তাড়াতাড়ি নামুন না৷' স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, অসহায় যাত্রীদের সাহায্য করতে আসা রেলকর্মীদের এই মনোভাবে', অভিযোগ সুচিতার৷ কাতারে-কাতারে আতঙ্কিত, বিধ্বস্ত মানুষ--কেউ বাচ্চাকে কোলে তুলে, কেউ বৃদ্ধ মা-বাবা বা সহযাত্রীর হাত ধরে--জল, কাদামাখা লাইনের ধার ধরে হাঁটতে-হাঁটতে এগিয়ে যেতে থাকেন পার্ক স্ট্রিট প্ল্যাটফর্মের দিকে৷ রিয়ার আতঙ্ক তখনও কাটেনি, 'এতটাই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে আটকে থাকার সময় যে, রেলকর্মীরা আশ্বাস দেওয়ার পরেও বিশ্বাস হচ্ছিল না, লাইনে বিদ্যুত্‍ সংযোগ সত্যিই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে কি না৷' অভিযোগ, ক্লান্ত শরীরে যখন যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মে উঠছেন, তখন আরপিএফ-এর কর্মীদের গলাতেও ছিল ঔদাসীন্য৷ 'আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবতী হঠাত্‍ই মাথা ঘুরে পড়ে যান প্ল্যাটফর্মে', উদ্ধার পাওয়ার পরেও সুচেতা কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না ভয়াবহ সেই দমবন্ধ স্মৃতি৷

শেষমেশ একটা নাগাদ স্টেশন থেকে বেরোন সুচিতা, রিয়া ও পিয়ালি৷ বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার তাড়ার মধ্যেও শেষ অভিযোগটা ছুড়ে দেন ওঁরা, 'এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কোনও কর্তৃপক্ষ হতে পারে? আগামী দিনে মেট্রোয় চড়তে হবেই৷ কিন্ত্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে মনে৷ সামান্য একটা ঘোষণা করতে আধ ঘণ্টা লেগে গেল ওঁদের?'
http://eisamay.indiatimes.com/city/kolkata/metro-terror-follow-up-story/articleshow/37095651.cms

No comments:

Post a Comment