Tuesday, June 24, 2014

অনন্য চলচ্চিত্র ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’

অনন্য চলচ্চিত্র ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’
গৌতম পাণ্ডে ॥ বাংলা সিনেমার উপকরণের অফুরন্ত ভাণ্ডার ও এর দর্শকপ্রিয়তা যে এখনও বাংলাদেশে বিদ্যমান তার বাস্তব প্রমাণ ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ চলচ্চিত্র। অনুকরণ ও অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সীমিত বাজেটে নগর ও গ্রাম বাংলার প্রতিচ্ছবিকে শিল্পায়িত ও দর্শকনন্দিত করে তুলেছেন ছবিটির নির্মাতা মাসুদ পথিক। তরুণ এ কবির মধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম এ ধাক্কাটি উত্তরণের পথে বলা যায়। কারণ সত্যি সতিই সপরিবারে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে উপভোগ করার মতো এ চলচ্চিত্র। এ যেন শুধু চলচ্চিত্র নয়, গ্রাম্য ও নগর জীবনের স্মৃতির জানালা। ছবিটি মুক্তি পেয়েছে গত ২০ জুন। দেশের মাত্র ৫টি সিনেমা হলে চলছে ছবিটি। অঝোর ধারায় বৃষ্টি উপেক্ষা করেও রাজধানীর বলাকা প্রেক্ষাগৃহে উপচেপড়া দর্শকের ভিড়। জানা যায় ছবিটি মুক্তি দেয়া দেশের অন্য চারটি প্রেক্ষাগৃহেও একই অবস্থা। বাস্তব কাহিনীকে কবিতার ফ্রেমে আবদ্ধ করা কঠিন। কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ কবিতা লিখে এই কঠিন কাজটিকে পাঠককুলে সহজ করে দিয়েছেন। সে কারণেই হয়ত কবিতাটি পাঠক নন্দিত হয়েছে। আর সে জন্যই কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘নেকাব্বর’ বাঙালী শিক্ষিত সমাজের প্রিয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে। কবি মাসুদ পথিক প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্র নির্মান করতে গিয়ে কবি গুণের সেই ঐতিহাসিক কবিতা ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণকে’ উপজীব্য মনে করেছেন। রুচিশীল সিনে প্রেমিক দর্শকের পাশাপাশি কবি নির্মলেন্দু গুণকেও অনাবিল আনন্দ দিয়েছে ছবিটি। রাজধানীর বলাকা-২ সিনেমা হল থেকে বের হওয়ার পর চোখের জল মুছতে মুছতে এমন অভিমতই ব্যাক্ত করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। বন্ধু নেকাব্বরের সঙ্গে তার স্মৃতিময় মুহূর্তগুলোকে একই ফ্রেমে দেখে আবেগকে সামলাতে পারেননি, কেঁদে ফেলেন। চলচ্চিত্রটিতে কী এমন বিষয় আছে যে দেশের প্রথম সারির একজন কবিকে কাঁদাতে পারে? একজন লেখকের ইমোশনের জায়গাকে তাহলে মাসুদ পথিক কি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পেরেছেন? বিষয়টাকে পরিষ্কার করার জন্য সিনেমা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। প্রথমেই একটি ক্লোজ শট শিশির ভেজা ঘাসের এক মনোরম চিত্র। একের পর এক বৈচিত্র্যপূর্ণ চিত্রগ্রহণ। কবি নিজের বাড়ি যাবেন বলে রেলস্টেশন থেকে নেমে খানিক হেঁটে সামনে দেখতে পান মানুষের ভিড়। ভিড় ঠেলে দেখেন কৈশোরের সতীর্থ নেকাব্বরের লাশ শিশির ভেজা ঘাসে বড় অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। বেদনায় অন্তহীন ভাবনা নিয়ে রেলস্টেশনের পাশে বসে ডায়েরিতে আবদ্ধ করতে থাকেন বন্ধু নেকাব্বরের জীবনগাথা। কবি মুহূর্তের ভাবনায় নেকাব্বরের সঙ্গে অতীতের স্মৃতিময়তায় ফিরে যান। এরপরের কাহিনী দেখে মনে হতে পারে গ্রামের একজন কৃষকের সঙ্গে মাতব্বর কিংবা জমিদারের বিরোধ নতুন তেমন কোন ঘটনা নয়। কিন্তু ঘটনা এক হলেও এখানে দর্শন ভিন্ন। এখানে কৃষকরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে বিশ্বাসী। স্বজনহারা কৃষক নেকাব্বর বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন প্রাণী ও প্রকৃতিপ্রেমিক একজন মানুষ। এর প্রমাণ ফাতেমার ছোট ভাই ও বোন যখন পাখি শিকার করে, কে নিবে এই নিয়ে টানাটানি করে তখন নেকাব্বর লুঙ্গির ভেতরে গোঁজা কয়েক পয়সা তাদের দিয়ে পাখিকে মুক্ত আকাশে ছেড়ে দেয়, যা লং শট ও ক্লোজ শটে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। আবার বাড়ির আঙ্গিনায় কখনও লেবুর পাতার ঘ্রাণ এবং সে পাতায় মাকড়সার আঁশের সৌন্দর্য অনুভব করে। মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্বেও কেন স্কুলে যায় না শিক্ষকের এমন প্রশ্নের উত্তরে নেকাব্বরের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর ‘শিক্ষার জন্যে কী স্কুলে যাওয়া লাগে? এই মাঠ আর বিস্তীর্ণ আকাশ থেকে কত শেখার আছে আমাদের!’ একজন হত দরিদ্র মানুষ হিসেবে অন্যের দারিদ্র্য সঙ্কট নিরসনে এগিয়ে আসা তার স্বভাবজাত। ঘরের বাঁশের পালায় ঢুকিয়ে রাখা পয়সাগুলো দিয়ে গরিব বৃদ্ধাকে সাহায্য করে নেকাব্বর। আবার প্রতিনিয়ত কমরেড মনি সিং-এর চিন্তাভাবনার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখে। নিয়মিত সেসব মিটিংয়ে অংশ নেয়। এক সময় বিদ্রোহ করে। তার এ চেতনা নিজের অবস্থার পরিবর্তন নয়, সমাজ পরিবর্তনের।
অন্য দশ জনের মতো জৈবিক চাহিদাকেও উপেক্ষা করতে পারেনি নেকাব্বর। সে গ্রামের আইনুদ্দিনের মা মরা মেয়ে ফাতেমার প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। বিয়ের আগে তাদের একাধিকবার সঙ্গমও হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেনি। কারণ, মাতব্বরের ছেলের ড্রাইভারের সঙ্গে তার বিয়ে নিয়ে কথা বার্তা আর মাতবরের সঙ্গে কৃষকদের হাতাহাতিতে পুলিশী ঝামেলায় জড়িয়ে যায় নেকাব্বর। তার নামে হুলিয়া জারি হয়। এটা জানতে পেরে সে কবি নির্মলের স্মরণাপন্ন হয়। নির্মল তাকে পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিংয়ের বিপ্লবী মামুনের কাছে তুলে দেয়। মামুন নেকাব্বরের কথা এর আগেই নির্মলের মুখে শুনেছে। নেকাব্বরের অনুপস্থিতিতে গ্রামে চলে অন্য কাহিনী। মাতব্বর ফাতেমাকে বিয়ে করতে চায়। কু-নজরে পড়ে মাতব্বরের পোষ্য মুন্সীর। কিন্তু মাতব্বর তাকে থামিয়ে দেয়। ফাতেমা বেঁেচ নেই, নেই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগুতে থাকে সে। মারা যায় নেকাব্বর। তারপর আবার নির্মল অর্থাৎ নির্মলেন্দু গুণ ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ফিরে আসে এবং দেখে নেকাব্বরের লাশ পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে। গুণ পিছে পিছে যায়। যে নেকাব্বর যুদ্ধ করেছে। সে হয়ত প্রয়োজন মনে করেনি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম লেখানোর। ফলে মৃত্যুপরবর্তী সময়েও মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা পায়নি নেকাব্বর। তার সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ছবিটিতে অভিনয় করেছেন মামুনুর রশীদ, কবি নির্মলেন্দু গুণ, শিমলা, জুয়েল জহুর, মিতুল, প্রবীর মিত্র, রেহেনা জলি, রানী সরকার, এহসানুর রহমান, অসীম সাহা, শেখ শাহেদ আলী, দুখু সুমন, সৈয়দ যোবায়ের প্রমুখ। পরিচালক মাসুদ পথিক হয়ত নানা চিত্রগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি অনেক অব্যক্ত কথা ব্যক্ত করতে পারতেন কিন্তু তা না করে তিনি আবহমান বাংলার লোকজ উপাদান লরেন্স অপুর রোজারিও ও বায়েজিদ কামালের ধারণকৃত দৃশ্যে দৃশ্যে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। যাকে আরও গভীরভাবে দেশজ সঙ্গীত আবহের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন সিনেমাটির সঙ্গীত পরিচালক ড. সাইম রানা। কবি নির্মলেন্দু গুণ, অসীম সাহা, সাইম রানা ও মাসুদ পথিকের লেখা গানে কণ্ঠ দিয়ে শিল্পী বারী সিদ্দিকী, মমতাজ, বাপ্পী রাজ, বেলাল খান, প্রিয়াংকা গোপ সিনেমাটির এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। সরকারী অনুদানের এ সিনেমাটি উৎসর্গ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ধারক ও বাহকদের।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment