ঔপনিবেশিকোত্তর ঔপনিবেশিক মন ॥ পতাকা বহিবার শক্তিটা যেন পাই
মুনতাসীর মামুন
সংবাদপত্রের ছবিটা ভারি সুন্দর। একটি নদী বোঝা যাচ্ছে তা বুড়িগঙ্গা। নদীর তীরে এক সারি বাড়ি। প্রত্যেকটি বাড়ির ছাদে মহাসমারোহে উড়ছে আর্জেনটিনার সাদা-নীল বড় পতাকা। বুড়িগঙ্গার ওপার বোধহয় আর্জেনটিনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে। নাকি আর্জেনটিনা জায়গাটি দখল করে নিয়েছে যখন ঢাকাবাসী গভীর ঘুমে ছিল অচেতন। সার্বভৌমত্ব জারির প্রথম নিদর্শন হলো পতাকা উত্তোলন। আইয়োজিমার বিখ্যাত সেই ছবিটির কথা মনে পড়ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছোট এই দ্বীপখ-টি মার্কিন সেনারা দখল নিচ্ছে। চারদিকে গুলিবৃষ্টি। তার মধ্যে ছোট এক পাথুরে টিলার চুড়োয় মার্কিন পতাকা ওড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সৈন্যরা। ফকল্যান্ডে আর্জেনটিনার পতাকা উড়বে, না ব্রিটেনের, এই নিয়ে তো যুদ্ধই হয়ে গেল।
তারপর দিন ঢাকার উপকণ্ঠের একটি পাড়া। দেখলাম প্রত্যেকটি বাড়ির ছাদে ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ পতাকা উড়ছে। একই চিন্তা হলো। তারপর থেকে সংবাদপত্র- টিভিতে খালি পতাকা ওড়াবার কিচ্ছা। এইসব কাহিনী মানুষজনকে আরও উজ্জীবিত করছে পতাকা ওড়াবার। মনে হয় সারা বাংলাদেশ দু’টি দেশ ভাগ করে নিয়েছে। আমাদের না হোক, অন্তত হঠাৎ করে বহিরাগত কেউ এ শহরে, এদেশে এলে তাই মনে হবে।
উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত চীনকে এভাবে ভাগ করে নিয়েছিল সে সময়কার ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো। চীনের কিছু অঞ্চলে বিশেষ করে সাংহাইয়ে গেলে দেখা যেত ঠিক এ ভাবেই বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে বিভিন্ন জায়গায়। মনে আছে, বছর পঁচিশেক আগে সাংহাইয়ের একটি পাড়ায় চীনা লেখকদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনা শেষে একজন জানালেন, কিছুদিন আগেও এখানে উড়ত ফরাসীদের ত্রিরঙ্গা পাতাকা। ফরাসীদের দখলে ছিল জায়গাটা। তার পরের পাড়াটা ছিল জার্মানির। আরও কিছু দূরে ব্রিটেনের। পতাকা দেখেই সবাই বুঝতে পারতেন কার দখলে কোন এলাকা।
না, এখানেই শেষ নয় এ দেশের মানুষের কাহিনী। পত্রিকায় দেখলাম একদিন আর্জেননিটার ভক্তরা আধমাইল লম্বা পতাকা নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর দিন, তাদের টেক্কা দেয়ার জন্য ব্রাজিল সমর্থকরা দাঁড়িয়ে গেল আরেকটি লম্বা পতাকা নিয়ে। রাস্তায় রাস্তায় বিদেশী পতাকা বিক্রি করছে হকাররা। আচ্ছা কখনও কি মনে পড়ে ১৯৭১ সালের ঘাতকদের বিচারের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাতীয় পতাকা নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল মানুষ? এই যে কিছুদিন আগে রাস্তায় বিএনপির সমর্থকরা ঘরবাড়ি পুড়িয়ে, গাছপালা কেটে, মানুষ হত্যা করে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলছিল, তখন বাংলাদেশ রক্ষার জন্য কি মানুষ এভাবে পতাকা নিয়ে মিছিল করেছে? সরকার যখন লড়ছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় তখন কি ছাদে ছাদে উড়িয়েছে আওয়ামী লীগের পতাকা? অনেকে বলবেন কয়েক দিন আগে তো বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানব তৈরি পতাকা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঠিক, কিন্তু তার পেছনে কত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তো কেউ এগিয়ে আসেনি। বিদেশী পতাকার জন্য তো টাকা যোগাতে হচ্ছে না। কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে না।
পতাকার সঙ্গে ভাবাবেগের সম্পর্ক আছে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ যখন কলাভবনে পতাকা উত্তোলিত হলো বা যেদিন বঙ্গবন্ধু নিজ বাসগৃহের সামনে পতাকা ওড়ালেন মানুষের মনে তখন স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, বাংলাদেশ হবেই। পতাকার স্বপ্ন আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ২৩ মার্চ সব ভবনে যাতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর ডাক দেয়া হয় তখন পাকিস্তান উপনিবেশের পতাকা নামিয়ে ফেলেছিল মানুষ। ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানী সেনারা গণহত্যার সঙ্গে সঙ্গে যে কাজটি করেছিল তা’ হলো পতাকা নামানো। বাংলাদেশের পতাকা নামানোর অর্থ বাংলাদেশের প্রশ্ন নাকচ করা, অপমান। সেই ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল নিজের পতাকা সগৌরবে ওড়ানোর জন্য।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হলেই গত কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশে এ কাজটি করছে কিছু ভক্ত। অনেকে এটিকে সস্নেহে দেখছেন, গৌরব মানছেন ভিনদেশী পতাকা ওড়ানোর মচ্ছবে। এর পেছনে যুক্তিটি হলো, ভক্তরা এমনটি করেই থাকে। আমি শুনেছি, প্রধানমন্ত্রী নাকি এই পতাকা ওড়ানোকে সস্নেহ প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাতে উজ্জীবিত হয়ে সুনামগঞ্জ ও যশোরে ফের পাতাকা ওড়াবার মোচ্ছব শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনেক কাজ সমর্থন করলেও, তার এই স্নেহ প্রদর্শন সমর্থন করা গেল না।
ধরা যাক, এখন ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাকিস্তান ভারত খেলবে। পাড়ায় পাড়ায় তথাকথিত ভক্তরা পাকিস্তান- ভারতের পতাকা ওড়ানো শুরু করলে কি সমর্থন করবেন? কয়েকদিন আগে, পাকিস্তান-বাংলাদেশ খেলার সময় যখন পাকিস্তানী এবং বাঙালী পাকিস্তানীরা, পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে গ্যালারিতে নাচানাচি শুরু করল তখন কি কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করেন নি? তা’হলে সে নিষেধাজ্ঞাটি কেন দেয়া হয়েছিল? পাকিস্তানী দিবসে পাকিস্তানী পতাকা উড়িয়ে যদি কেউ বলে, আমি পাকিস্তানের ভক্ত, আমি ভাবাবেগে আকুল, আমার গণতান্ত্রিক অধিকার আছে ঐ পতাকা ওড়ানোর, সমর্থন করবেন? এ ধরনের ভাবাবেগ সহ্য করা যাবে না দেখেই ১৯৭২ সালে পতাকা আইন করা হয়েছিল। যা মেনে চলতে হয় সবাইকে। না মানাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমেরিকায় তো বিদেশী রাষ্ট্রদূতরাও গাড়িতে নিজের পতাকা উড়িয়ে রাস্তায় বেরুতে পারেন না।
বলছিলাম খেলাভক্তদের কথা। খেলা ভক্তরা উন্মাদের মতো আচরণ করে অনেক দেশেই। বছর ৩৫ আগে লন্ডনে টয়েনবি হলে গেছি কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা করতে। আড্ডা দিতে গিয়ে খেয়াল নেই। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। লন্ডনে তখন বর্ণবিদ্বেষ চাড়া দিয়ে উঠছে। খালি রাস্তায় পেলে ছোট ছোট বাচ্চারা ‘পাকি’‘পাকি’ বলে কোকের কৌটা ঢিল ছুড়ে মারে। টিউবে এক শ্রেণীর তরুণরা এমন সব কথা বলে মনে হয় প্রত্যেকের জিভ কেটে দিই। ভয়ে ভয়েই তাই চলাফেরা করি। বিদায় দেয়ার জন্য বারান্দা পর্যন্ত এসে কবি বললেন,‘আজ না টোটেনহামের খেলা। সর্বনাশ। হেঁটে টিউবে যেতে পারবে না। তোমাকে ক্যাব ডেকে দিচ্ছি।’ পরিচিত বাঙালী এক ক্যাব চালককে ডেকে আমাকে তুলে দিয়ে, ক্যাব চালককে পই পই করে সাবধান করে যেন তিনি শান্তি পেলেন। এবং ঘণ্টাখানেক পর ফোন করে জানলেন আমি পৌঁছেছি কিনা। টেক্সিতে যেতে যতে মনে হলো, আসলেই তো ঠিক। বিকেলে টিউবে আসার সময় দেখেছি, টিউব ভর্তি তরুণরা বিয়ার খাচ্ছে, হই হল্লা করছে, আমাকে নিয়ে টিটকারি মারছে। স্টেশনগুলো জনশূন্য।
ফুটবল নিয়ে কয়েক বছর আগে লাতিন আমেরিকার দু’দেশের ভক্তদের মধ্যে এক বন্দুক লড়াইয়ে ৭০ জন মারা গিয়েছিল। ইউরোপে এখন ফুটবল বা রাগবি খেলার সময় ইংল্যান্ড যদি কোন দেশের প্রতিপক্ষ হয় তখন ইংল্যান্ড থেকে ভক্তদের আসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়। রাস্তায় রাস্তায় টহল দেয় বাড়তি পুলিশ। প্রতি দেশেই খেলার বিশেষ করে ফুটবলের এমন দর্শক আছে কিন্তু, তারা নিজ দেশে নিজেদের পছন্দ কোন ক্লাব এবং আন্তর্জাতিক খেলায় নিজেদের প্রতিই অনুরক্ত থাকে।
এক দশক আগে থেকে পাকিস্তান বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ত খেলতে আসছে। প্রথম প্রথম দেখা গেল উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণীরা গালে পাকিস্তানী পাতাকা এঁকে ‘ম্যারি মি আফ্রিদি’ বা ‘আই লাভ ইউ আফ্রিদি’ বলে যখন চিৎকার করছিল তখন তাদের পরিবার বা বাঙালী পাকিস্তানীরা ছাড়া সবাই তা অশালীন মনে করেছে। এমনও বলা হয়েছে সেই পরিবারের অর্থের ভিত্তি পরিবারের মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা করানো। অনেক তরুণও পতাকা হাতে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
অনেকে তখন বলতেন, স্পোর্টসে এরকম হতেই পারে। এর সঙ্গে কৃষ্টি-কালচার, দেশপ্রেমের কি সম্পক? কিন্তু ভারতে অবাঙালীরা ছাড়া এবং বাংলাদেশে বাঙালী পাকিস্তানীরা ছাড়া কোন দেশের খেলাভক্ত নিজ দেশে বসে ঐ দেশের পতাকা ওড়াবে না বা দেহ দান করতে চাইবে না। এরকম উদাহরণ দেয়া দূরূহ। যখন পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের কোলে বসার জন্য তরুণীরা ব্যস্ত এবং তরুণরা পাকিস্তানী খেলোয়াড় দেখলে কেঁদে ফেলছে আবেগে, তখন এক রিক্সাওয়ালা বলছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে, পাকিস্তানীরা ১৯৭১ সালে কি অত্যাচার করেছে তা গাছের পাতাও জানে। তারপর এরকম হুজ্জত করে কিভাবে? অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এই কাহিনী আমাকে বলেছিলেন। তার মানে এ নয় যে, বাংলাদেশে ভারত-পাকিস্তান খেলা হলেও পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন করা যাবে না, অবশ্যই যাবে। তখন স্পোর্টস ফ্যানদের যুক্তিও চলবে মাইনাস কিছু তরুণীর অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও বক্তব্য। আরো আছে। এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশ গত ৫০ বছরে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। আমরা একবার প্রায় ৭০ বছর আগে, আরেকবার ৪৩ বছর আগে স্বাধীন হয়েছি। আফ্রিকা বা এশিয়ার কোন দেশে ভক্তরা এরকম করে না, করে শুধু বাংলাদেশে। শুধু তাই নয়, এই ঝোঁক রিচ্যুয়ালে পরিণত হওয়ার বয়স এক দশকের বেশি নয়। একদশক আগে, বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া পরাজিত পাকিস্তানীদের বশংবদ পরাজিত বাঙালী পাকিস্তানীদের ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। এতবড় বেঈমানী ও অপমান বাঙালীকে আর কেউ করেনি। প্রশ্ন উঠতে পারে, সেই বেঈমানী ও অপমান যদি দেশের মানুষ মানতে পারে তা’হলে পতাকা ওড়ানোর অপমান এমন কি। নাকি বিষয়টা এভাবে দেখব, ঐ অপমান মানুষের মানসিকতায় অভিঘাত হেনেছে। ঔপনিবেশিক মানসিকতার ধ্বংসাবশেষ ও ঐ অপমান সব মিলিয়ে এমন এক হাইব্রিড অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যেখানে মান অপমান, কর্তব্য অকর্তব্য, কোন কিছুতেই কিছু আসে যায় না। যাক এ প্রসঙ্গ আবার আলোচনা করা যাবে। পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এক সময় বাংদেশে ফুটবলই ছিল প্রধান খেলা। মোহামেডান ক্লাব ও আব্বাস উদ্দিনের গযল ও ইসলামি গান বাঙালী মসুলমানের মধ্যে ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ তৈরি করেছিল। কলকাতায় ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার এখনও অভিবাসী বাঙালরা। সেই ফুটবলের জৌলুস এখন আর নেই। সালাহউদ্দিন প্রচুর আগ্রহ আর চেষ্টা করেও স্টেডিয়ামে দর্শক আনতে পারছেন না। বিশ্ব ফুটবল তালিকায় বাংলাদেশের স্থান সবার নিচে। ক্রিকেটে এখন পয়সার ছড়াছড়ি, ক্রিকেটের জন্য গ্যালারি পূর্ণ থাকে, যদিও ক্রিকেট তালিকায় বাংলাদেশের স্থান সবার নিচে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড় এখন বিশ্ব ক্রিকেটে পরিচিত। বাংলাদেশ প্রায় খেলাতেই হারে, কিন্তু কখনও বড় দলের সঙ্গে জিতলে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে কাঁসর বাদ্যি বাজিয়ে মিছিল বের হয়। আমাদের চোখেও পানি আসে। অন্য কোন দেশে এরকম হয় না।
ফুটবল বিশ্বকাপে খেলছে ৩২টি দল। যারা অংশ নিয়েছে সে সব দেশের মানুষজন নিজ দেশেরই বন্দনা করবে। যে সব দেশ অংশ নেয়নি সে সব দেশের ফুটবল ভক্তরা নিশ্চয় ব্রাজিল, আর্জেনটিনা বা জার্মানির ভক্ত হতে পারে। কিন্তু তারা কি এরকম হৈ চৈ রৈ রৈ কা- করছে বাংলাদেশের মানুষের মতো নিজ দেশে? বাংলাদেশের যে কজন ক্রীড়া সাংবাদিক গেছেন ব্রাজিলে তাদের পাঠানো প্রতিবেদন পড়েছি। ঢাকা থেকে সাও পাওলো নামার আগে মনে হয়েছিল দেখবেন এক ধুন্দুমার কা-। কিন্তু দেখলেন এখানে যে বিশ্বকাপ চলছে তা যদি না জানা থাকত তা’হলে এসে পড়তেন। ক্বচিৎ কখনও পতাকা দেখা যাচ্ছে ভবন শীর্ষে। তবে, হ্যা হকাররা জার্সি আর ছোট পতাকা বিক্রি করছে। উন্মত্ত ভক্তও যে থাকবে না তা তো নয়, কিন্তু আতিশয্য নেই কোন। ব্রাজিলে কেন এমনটি হবে? এ প্রশ্নের উত্তর কি হবে?
আসলে বিষয় বোধহয় মানসিক গড়ন। আমরা বহু বছর পরাধীন থেকেছি, ব্রাজিল বা অন্যান্য দেশও থেকেছে। আমরা আমাদের প্রভুদের জবান নিইনি, ব্রাজিল নিয়েছে। তাদের ভাষা পর্তুগিজ। কিন্তু, তফাৎটা হয়ে গেছে বোধহয় স্বাধীনতার পর। তারা বা অন্যরা ঔপনিবেশিকোত্তর মন গঠন করতে পেরেছে, ঔপনিবেশিকোত্তর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছে যা তাদের দেবে পরিপক্বতা বা ম্যাচুরিটি। আমরা তা পারি নি।
ব্রিটিশ আমলে তোষামোদী এক মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে তোলায় সাহায্য করা হয় প্রধানত ভাবনার জগতে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য। বুদ্ধিজীবীরা ঔপনিবেশিক প্রভুদের চিন্তা চেতনাই বিস্তৃত করেছেন, তা তিনি বঙ্কিমচন্দ্রই হন বা মীর মশাররফ হোসেনই হন। যদিও তখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ হচ্ছে।
(বাকি অংশ আগামী বৃহস্পতিবার)
তারপর দিন ঢাকার উপকণ্ঠের একটি পাড়া। দেখলাম প্রত্যেকটি বাড়ির ছাদে ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ পতাকা উড়ছে। একই চিন্তা হলো। তারপর থেকে সংবাদপত্র- টিভিতে খালি পতাকা ওড়াবার কিচ্ছা। এইসব কাহিনী মানুষজনকে আরও উজ্জীবিত করছে পতাকা ওড়াবার। মনে হয় সারা বাংলাদেশ দু’টি দেশ ভাগ করে নিয়েছে। আমাদের না হোক, অন্তত হঠাৎ করে বহিরাগত কেউ এ শহরে, এদেশে এলে তাই মনে হবে।
উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত চীনকে এভাবে ভাগ করে নিয়েছিল সে সময়কার ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো। চীনের কিছু অঞ্চলে বিশেষ করে সাংহাইয়ে গেলে দেখা যেত ঠিক এ ভাবেই বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে বিভিন্ন জায়গায়। মনে আছে, বছর পঁচিশেক আগে সাংহাইয়ের একটি পাড়ায় চীনা লেখকদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনা শেষে একজন জানালেন, কিছুদিন আগেও এখানে উড়ত ফরাসীদের ত্রিরঙ্গা পাতাকা। ফরাসীদের দখলে ছিল জায়গাটা। তার পরের পাড়াটা ছিল জার্মানির। আরও কিছু দূরে ব্রিটেনের। পতাকা দেখেই সবাই বুঝতে পারতেন কার দখলে কোন এলাকা।
না, এখানেই শেষ নয় এ দেশের মানুষের কাহিনী। পত্রিকায় দেখলাম একদিন আর্জেননিটার ভক্তরা আধমাইল লম্বা পতাকা নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর দিন, তাদের টেক্কা দেয়ার জন্য ব্রাজিল সমর্থকরা দাঁড়িয়ে গেল আরেকটি লম্বা পতাকা নিয়ে। রাস্তায় রাস্তায় বিদেশী পতাকা বিক্রি করছে হকাররা। আচ্ছা কখনও কি মনে পড়ে ১৯৭১ সালের ঘাতকদের বিচারের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাতীয় পতাকা নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল মানুষ? এই যে কিছুদিন আগে রাস্তায় বিএনপির সমর্থকরা ঘরবাড়ি পুড়িয়ে, গাছপালা কেটে, মানুষ হত্যা করে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলছিল, তখন বাংলাদেশ রক্ষার জন্য কি মানুষ এভাবে পতাকা নিয়ে মিছিল করেছে? সরকার যখন লড়ছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় তখন কি ছাদে ছাদে উড়িয়েছে আওয়ামী লীগের পতাকা? অনেকে বলবেন কয়েক দিন আগে তো বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানব তৈরি পতাকা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঠিক, কিন্তু তার পেছনে কত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তো কেউ এগিয়ে আসেনি। বিদেশী পতাকার জন্য তো টাকা যোগাতে হচ্ছে না। কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে না।
পতাকার সঙ্গে ভাবাবেগের সম্পর্ক আছে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ যখন কলাভবনে পতাকা উত্তোলিত হলো বা যেদিন বঙ্গবন্ধু নিজ বাসগৃহের সামনে পতাকা ওড়ালেন মানুষের মনে তখন স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, বাংলাদেশ হবেই। পতাকার স্বপ্ন আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ২৩ মার্চ সব ভবনে যাতে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর ডাক দেয়া হয় তখন পাকিস্তান উপনিবেশের পতাকা নামিয়ে ফেলেছিল মানুষ। ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানী সেনারা গণহত্যার সঙ্গে সঙ্গে যে কাজটি করেছিল তা’ হলো পতাকা নামানো। বাংলাদেশের পতাকা নামানোর অর্থ বাংলাদেশের প্রশ্ন নাকচ করা, অপমান। সেই ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল নিজের পতাকা সগৌরবে ওড়ানোর জন্য।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হলেই গত কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশে এ কাজটি করছে কিছু ভক্ত। অনেকে এটিকে সস্নেহে দেখছেন, গৌরব মানছেন ভিনদেশী পতাকা ওড়ানোর মচ্ছবে। এর পেছনে যুক্তিটি হলো, ভক্তরা এমনটি করেই থাকে। আমি শুনেছি, প্রধানমন্ত্রী নাকি এই পতাকা ওড়ানোকে সস্নেহ প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাতে উজ্জীবিত হয়ে সুনামগঞ্জ ও যশোরে ফের পাতাকা ওড়াবার মোচ্ছব শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনেক কাজ সমর্থন করলেও, তার এই স্নেহ প্রদর্শন সমর্থন করা গেল না।
ধরা যাক, এখন ক্রিকেট বিশ্বকাপে পাকিস্তান ভারত খেলবে। পাড়ায় পাড়ায় তথাকথিত ভক্তরা পাকিস্তান- ভারতের পতাকা ওড়ানো শুরু করলে কি সমর্থন করবেন? কয়েকদিন আগে, পাকিস্তান-বাংলাদেশ খেলার সময় যখন পাকিস্তানী এবং বাঙালী পাকিস্তানীরা, পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে গ্যালারিতে নাচানাচি শুরু করল তখন কি কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করেন নি? তা’হলে সে নিষেধাজ্ঞাটি কেন দেয়া হয়েছিল? পাকিস্তানী দিবসে পাকিস্তানী পতাকা উড়িয়ে যদি কেউ বলে, আমি পাকিস্তানের ভক্ত, আমি ভাবাবেগে আকুল, আমার গণতান্ত্রিক অধিকার আছে ঐ পতাকা ওড়ানোর, সমর্থন করবেন? এ ধরনের ভাবাবেগ সহ্য করা যাবে না দেখেই ১৯৭২ সালে পতাকা আইন করা হয়েছিল। যা মেনে চলতে হয় সবাইকে। না মানাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমেরিকায় তো বিদেশী রাষ্ট্রদূতরাও গাড়িতে নিজের পতাকা উড়িয়ে রাস্তায় বেরুতে পারেন না।
বলছিলাম খেলাভক্তদের কথা। খেলা ভক্তরা উন্মাদের মতো আচরণ করে অনেক দেশেই। বছর ৩৫ আগে লন্ডনে টয়েনবি হলে গেছি কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা করতে। আড্ডা দিতে গিয়ে খেয়াল নেই। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। লন্ডনে তখন বর্ণবিদ্বেষ চাড়া দিয়ে উঠছে। খালি রাস্তায় পেলে ছোট ছোট বাচ্চারা ‘পাকি’‘পাকি’ বলে কোকের কৌটা ঢিল ছুড়ে মারে। টিউবে এক শ্রেণীর তরুণরা এমন সব কথা বলে মনে হয় প্রত্যেকের জিভ কেটে দিই। ভয়ে ভয়েই তাই চলাফেরা করি। বিদায় দেয়ার জন্য বারান্দা পর্যন্ত এসে কবি বললেন,‘আজ না টোটেনহামের খেলা। সর্বনাশ। হেঁটে টিউবে যেতে পারবে না। তোমাকে ক্যাব ডেকে দিচ্ছি।’ পরিচিত বাঙালী এক ক্যাব চালককে ডেকে আমাকে তুলে দিয়ে, ক্যাব চালককে পই পই করে সাবধান করে যেন তিনি শান্তি পেলেন। এবং ঘণ্টাখানেক পর ফোন করে জানলেন আমি পৌঁছেছি কিনা। টেক্সিতে যেতে যতে মনে হলো, আসলেই তো ঠিক। বিকেলে টিউবে আসার সময় দেখেছি, টিউব ভর্তি তরুণরা বিয়ার খাচ্ছে, হই হল্লা করছে, আমাকে নিয়ে টিটকারি মারছে। স্টেশনগুলো জনশূন্য।
ফুটবল নিয়ে কয়েক বছর আগে লাতিন আমেরিকার দু’দেশের ভক্তদের মধ্যে এক বন্দুক লড়াইয়ে ৭০ জন মারা গিয়েছিল। ইউরোপে এখন ফুটবল বা রাগবি খেলার সময় ইংল্যান্ড যদি কোন দেশের প্রতিপক্ষ হয় তখন ইংল্যান্ড থেকে ভক্তদের আসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়। রাস্তায় রাস্তায় টহল দেয় বাড়তি পুলিশ। প্রতি দেশেই খেলার বিশেষ করে ফুটবলের এমন দর্শক আছে কিন্তু, তারা নিজ দেশে নিজেদের পছন্দ কোন ক্লাব এবং আন্তর্জাতিক খেলায় নিজেদের প্রতিই অনুরক্ত থাকে।
এক দশক আগে থেকে পাকিস্তান বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ত খেলতে আসছে। প্রথম প্রথম দেখা গেল উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণীরা গালে পাকিস্তানী পাতাকা এঁকে ‘ম্যারি মি আফ্রিদি’ বা ‘আই লাভ ইউ আফ্রিদি’ বলে যখন চিৎকার করছিল তখন তাদের পরিবার বা বাঙালী পাকিস্তানীরা ছাড়া সবাই তা অশালীন মনে করেছে। এমনও বলা হয়েছে সেই পরিবারের অর্থের ভিত্তি পরিবারের মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা করানো। অনেক তরুণও পতাকা হাতে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
অনেকে তখন বলতেন, স্পোর্টসে এরকম হতেই পারে। এর সঙ্গে কৃষ্টি-কালচার, দেশপ্রেমের কি সম্পক? কিন্তু ভারতে অবাঙালীরা ছাড়া এবং বাংলাদেশে বাঙালী পাকিস্তানীরা ছাড়া কোন দেশের খেলাভক্ত নিজ দেশে বসে ঐ দেশের পতাকা ওড়াবে না বা দেহ দান করতে চাইবে না। এরকম উদাহরণ দেয়া দূরূহ। যখন পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের কোলে বসার জন্য তরুণীরা ব্যস্ত এবং তরুণরা পাকিস্তানী খেলোয়াড় দেখলে কেঁদে ফেলছে আবেগে, তখন এক রিক্সাওয়ালা বলছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে, পাকিস্তানীরা ১৯৭১ সালে কি অত্যাচার করেছে তা গাছের পাতাও জানে। তারপর এরকম হুজ্জত করে কিভাবে? অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এই কাহিনী আমাকে বলেছিলেন। তার মানে এ নয় যে, বাংলাদেশে ভারত-পাকিস্তান খেলা হলেও পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন করা যাবে না, অবশ্যই যাবে। তখন স্পোর্টস ফ্যানদের যুক্তিও চলবে মাইনাস কিছু তরুণীর অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও বক্তব্য। আরো আছে। এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দেশ গত ৫০ বছরে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। আমরা একবার প্রায় ৭০ বছর আগে, আরেকবার ৪৩ বছর আগে স্বাধীন হয়েছি। আফ্রিকা বা এশিয়ার কোন দেশে ভক্তরা এরকম করে না, করে শুধু বাংলাদেশে। শুধু তাই নয়, এই ঝোঁক রিচ্যুয়ালে পরিণত হওয়ার বয়স এক দশকের বেশি নয়। একদশক আগে, বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া পরাজিত পাকিস্তানীদের বশংবদ পরাজিত বাঙালী পাকিস্তানীদের ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। এতবড় বেঈমানী ও অপমান বাঙালীকে আর কেউ করেনি। প্রশ্ন উঠতে পারে, সেই বেঈমানী ও অপমান যদি দেশের মানুষ মানতে পারে তা’হলে পতাকা ওড়ানোর অপমান এমন কি। নাকি বিষয়টা এভাবে দেখব, ঐ অপমান মানুষের মানসিকতায় অভিঘাত হেনেছে। ঔপনিবেশিক মানসিকতার ধ্বংসাবশেষ ও ঐ অপমান সব মিলিয়ে এমন এক হাইব্রিড অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যেখানে মান অপমান, কর্তব্য অকর্তব্য, কোন কিছুতেই কিছু আসে যায় না। যাক এ প্রসঙ্গ আবার আলোচনা করা যাবে। পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এক সময় বাংদেশে ফুটবলই ছিল প্রধান খেলা। মোহামেডান ক্লাব ও আব্বাস উদ্দিনের গযল ও ইসলামি গান বাঙালী মসুলমানের মধ্যে ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ তৈরি করেছিল। কলকাতায় ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার এখনও অভিবাসী বাঙালরা। সেই ফুটবলের জৌলুস এখন আর নেই। সালাহউদ্দিন প্রচুর আগ্রহ আর চেষ্টা করেও স্টেডিয়ামে দর্শক আনতে পারছেন না। বিশ্ব ফুটবল তালিকায় বাংলাদেশের স্থান সবার নিচে। ক্রিকেটে এখন পয়সার ছড়াছড়ি, ক্রিকেটের জন্য গ্যালারি পূর্ণ থাকে, যদিও ক্রিকেট তালিকায় বাংলাদেশের স্থান সবার নিচে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড় এখন বিশ্ব ক্রিকেটে পরিচিত। বাংলাদেশ প্রায় খেলাতেই হারে, কিন্তু কখনও বড় দলের সঙ্গে জিতলে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে কাঁসর বাদ্যি বাজিয়ে মিছিল বের হয়। আমাদের চোখেও পানি আসে। অন্য কোন দেশে এরকম হয় না।
ফুটবল বিশ্বকাপে খেলছে ৩২টি দল। যারা অংশ নিয়েছে সে সব দেশের মানুষজন নিজ দেশেরই বন্দনা করবে। যে সব দেশ অংশ নেয়নি সে সব দেশের ফুটবল ভক্তরা নিশ্চয় ব্রাজিল, আর্জেনটিনা বা জার্মানির ভক্ত হতে পারে। কিন্তু তারা কি এরকম হৈ চৈ রৈ রৈ কা- করছে বাংলাদেশের মানুষের মতো নিজ দেশে? বাংলাদেশের যে কজন ক্রীড়া সাংবাদিক গেছেন ব্রাজিলে তাদের পাঠানো প্রতিবেদন পড়েছি। ঢাকা থেকে সাও পাওলো নামার আগে মনে হয়েছিল দেখবেন এক ধুন্দুমার কা-। কিন্তু দেখলেন এখানে যে বিশ্বকাপ চলছে তা যদি না জানা থাকত তা’হলে এসে পড়তেন। ক্বচিৎ কখনও পতাকা দেখা যাচ্ছে ভবন শীর্ষে। তবে, হ্যা হকাররা জার্সি আর ছোট পতাকা বিক্রি করছে। উন্মত্ত ভক্তও যে থাকবে না তা তো নয়, কিন্তু আতিশয্য নেই কোন। ব্রাজিলে কেন এমনটি হবে? এ প্রশ্নের উত্তর কি হবে?
আসলে বিষয় বোধহয় মানসিক গড়ন। আমরা বহু বছর পরাধীন থেকেছি, ব্রাজিল বা অন্যান্য দেশও থেকেছে। আমরা আমাদের প্রভুদের জবান নিইনি, ব্রাজিল নিয়েছে। তাদের ভাষা পর্তুগিজ। কিন্তু, তফাৎটা হয়ে গেছে বোধহয় স্বাধীনতার পর। তারা বা অন্যরা ঔপনিবেশিকোত্তর মন গঠন করতে পেরেছে, ঔপনিবেশিকোত্তর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছে যা তাদের দেবে পরিপক্বতা বা ম্যাচুরিটি। আমরা তা পারি নি।
ব্রিটিশ আমলে তোষামোদী এক মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে তোলায় সাহায্য করা হয় প্রধানত ভাবনার জগতে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য। বুদ্ধিজীবীরা ঔপনিবেশিক প্রভুদের চিন্তা চেতনাই বিস্তৃত করেছেন, তা তিনি বঙ্কিমচন্দ্রই হন বা মীর মশাররফ হোসেনই হন। যদিও তখন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ হচ্ছে।
(বাকি অংশ আগামী বৃহস্পতিবার)
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/
No comments:
Post a Comment