Wednesday, June 25, 2014

এম আর আখতার মুকুল সৈয়দ জিয়াউল হক

এম আর আখতার মুকুল
সৈয়দ জিয়াউল হক
বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষার দোহাই দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকরা এ দেশের নিরস্ত্র জনগণের ওপর শুরু করে পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংসতম গণহত্যা। সাড়ে সাত কোটি মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধের রণাঙ্গনের পাশাপাশি এই যুদ্ধের দ্বিতীয় রণাঙ্গন ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত নিচু ভলিউমে এই বেতারের অনুষ্ঠানমালা শুনতেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল ‘চরমপত্র’। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক এম আর আখতার মুকুল ছিলেন চরমপত্রের লেখক এবং পাঠক। চরমপত্রের লেখা ছিল অত্যন্ত চমৎকার। তার চেয়েও আকর্ষণীয় ছিল মুকুল ভাইয়ের পাঠের ঢং। মূলত ঢাকাইয়া ভাষায় রচিত হলেও মুকুল ভাই চরমপত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা এবং উর্দু ভাষাও ব্যবহার করতেন। বিচ্ছু, গাবুর মাইর, ক্যাচকা মাইর, চান্দি গরম, ছ্যারাব্যারা, বাম্বু, ভোমা ভোমা মছুয়া সোলজার, ছক্কু মিয়া, র্মেহামত মিয়া- এসব শব্দ তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরত। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে যখন প্রতিটি বাঙালীকে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু ভয় তাড়া করত তখনও এই চরমপত্র শুনে হাসতে হাসতে তাদের পেটে খিল ধরে যেত। রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারাও অস্ত্র হাতে চারিদিকে গোল হয়ে বসে শুনতেন চরমপত্র।
১৯৭১-এর অক্টোবর মাসে ঢাকা শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা অপারেশনে দখলদার পাকিস্তানী সৈন্যরা নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। পাকিস্তানীরা তাদের প্রচার মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলে অনবরত মিথ্যা প্রচার চালাত। তখন প্রচার মাধ্যম এখনকার মতো এত শক্তিশালী ছিল না। বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যদের দৃষ্টি এড়িয়ে অনেক গোপনে দেশী বিদেশী সাংবাদিকরা অধিকৃত বাংলাদেশে গণহত্যা ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোচিত যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতেন। এরই এক পর্যায়ে লন্ডনের বিখ্যাত সানডে টাইমসের রিপোর্টার ঢাকায় গেরিলা অপারেশনসহ তৎকালীন ঢাকা শহরের অবস্থার সচিত্র বিবরণ প্রকাশ করেন তাদের পত্রিকায়। ১৮২১ সাল থেকে প্রকাশিত লন্ডনের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা এটি। এই রিপোর্ট ছাপা হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার বিচলিত হয়ে পড়ে। এই ঘটনাটি অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে মুকুল ভাই এভাবে প্রচার করেন তাঁর চরমপত্রে, ‘‘হ-অ-অ-অ এই দিক্কার কারবার হুনছেন নি? লন্ডনের সানডে টাইম্স মতিঝিলে বিচ্চুগুলা যে বোমাবাজি করছে তার ফডো ছাপাইয়া দিছে। ছদর ইয়াহিয়া কি রাগ! ঢাকার গবর্নমেন্ট হাউসের পোয়া মাইলের মাইদ্দে এই রকম কারবার কেমতে হইা? জেনারেল পিঁয়াজি, ঠ্যাটা মালেক্যায় কি বইস্যা বইস্যা গাব দিতাছে নাকি? সানডে টাইম্স-এর এক সাদা চামড়ার আংরেজ রিপোর্টার বঙ্গাল মুলুকের হগ্গল রিপোর্ট আর পিকচার বগলদাবা কইর‌্যা অক্করে লন্ডনে যাইয়া হাজির। ব্যাডায় লিখছে, খোদ ঢাকা টাউন আর তার আশপাশে বিচ্চুগুলার বেশুমার কারবার চলতাছে। পরায় আটশ’ বিচ্চু এই কামের মধ্যে লাইগ্যা পড়ছে। দিন্কা দিন হেইগুলার লম্বর বাইড়্যা যাইতাছে।’’ যুদ্ধের সময় এই চরমপত্রের প্রভাব যে কতটা শক্তিশালী ছিল তা বর্তমান প্রজন্মের সন্তানদের ধারণায় আনাও কঠিন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ১১ জন সেক্টর কমান্ডার তাঁদের নিজ নিজ সেক্টরে চরম বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। আর এম আর আখতার মুকুল যুদ্ধ করেছেন ১১টি সেক্টরের প্রত্যেকটিতে।
কে এই এম আর আখতার মুকুল? ঘটনাক্রমে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেননি। তিনি ছিলেন আজীবনের একজন স্বাধীনচেতা ও সংগ্রামী মানুষ। বাঙালীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে তিনি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সংগঠক। তিনি সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)-এ থাকতেন। ২০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা হলের পুকুরের পূর্ব পার্শ্বের সিঁড়িতে এক জরুরী গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাঙালীর জাতীয় ইতিহাসে এই সভার গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানেও এম আর আখতার মুকুলের ভূমিকা ঐতিহাসিক। তিনি ছাড়াও এই সভায় উপস্থিত ছিলেন হাবিবুর রহমান শেলী (পরবর্তীকালে প্রধান বিচারপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা), জিল্লুর রহমান (সাবেক রাষ্ট্রপতি), আবদুল মোমেন (আওয়ামী লীগের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী), কমরুদ্দীন শহুদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক), মোহাম্মদ সুলতান (ভাসানী ন্যাপের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক), এস এ বারী এটি (সাবেক বিএনপি নেতা এবং প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী), আনোয়ারুল হক খান (মুজিবনগর সরকারের তথ্য সচিব), মনজুর হোসেন ও আনোয়ার হোসেন। ঐতিহাসিক এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে পরদিন যে কোন মূল্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে। বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়, গাজীউল হক ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করবেন। সভার পূর্বেই যদি তিনি গ্রেফতার হয়ে যান তবে এম আর আখতার মুকুল সভাপতিত্ব করবেন। তিনিও যদি গ্রেফতার হয়ে যান তবে কমরুদ্দীন শহুদ সভায় সভাপতিত্ব করবেন। এর থেকেই বুঝা যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এম আর আখতার মুকুলের ভূমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯৫২ সালের ডিসেম্বর মাসে দৈনিক সংবাদের বিজ্ঞাপন বিভাগে যোগদানের মাধ্যমে তিনি সাংবাদিক জীবনের সূচনা করেন। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ ও দৈনিক পূর্বদেশেও চাকরি করেন। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপের বিভিন্ন সময়ে তিনি ইত্তেফাকে চাকরির কথা গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করতেন। ইত্তেফাক ছিল এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। দৈনিক ইত্তেফাকে তিনি ৭ বছর চাকরি করেন। তিনি সেখানে চীফ রিপোর্টার পদে নিয়োজিত ছিলেন। সংবাদপত্র জগতের কিংবদন্তি তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছাড়াও মুকুল ভাই ইত্তেফাকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন, আবদুল ওয়াদুদ পাটোয়ারী, আবদুল হাফিজ, নূরুল ইসলাম প্রমুখকে। দৈনিক আজাদে তিনি সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন সাংবাদিক জগতের আর এক পথিকৃৎ মওলানা আকরম খাঁ এবং দৈনিক পূর্বদেশে পেয়েছিলেন সাংবাদিক মহলের দিকপাল আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী প্রমুখকে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় সাংবাদিক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে মূলত সাংবাদিক হলেও এম আর আখতার মুকুল অসংখ্য ইতিহাস ও গবেষণামূলক গ্রন্থ এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর এক একটি বই আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।
এম আর আখতার মুকুল ১৯২৯ সালের ৯ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০০৪ সালের ২৬ জুন পরলোকগমন করেন। তার এই ৭৫ বছরের জীবন ছিল কর্মময়, ঘটনাবহুল এবং সম্পূর্ণভাবে জনগণ আর তাদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্য নিবেদিত। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের আকাশ বাতাস, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের মতোই চিরজীবী থাকবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আর চরপত্রের এম আর আখতার মুকুল। তাই মুকুল ভাইয়ের মৃত্যুদিন বলে কিছু নেই। জয় বাংলা।
লেখক : প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment