Thursday, June 26, 2014

প্রতি ম্যাচেই নতুন মেসি!

প্রতি ম্যাচেই নতুন মেসি!
খাইরুল আমিন তুহিন
প্রকাশ : ২৭ জুন, ২০১৪

ব্রাজিলের পথে পথে গান গেয়ে ফিরছে আর্জেন্টিনার ফুটবল পাগল মানুষগুলো, ‘দিয়েগো দিয়েছিল বহুকাল হল; তারপর ইতালি থেকে কান্নাই শুধু সঙ্গী। দোহাই মেসি, এবার কাপটা এনে দাও না আমাদের।’ স্প্যানিশ সেই সুর ধ্বনি প্রতিধ্বনি তোলে স্টেডিয়ামে। লিওনেল মেসির বুকটাও নিশ্চয়ই ছুঁয়ে যায়। কাপ না পাওয়ার সেই চুয়ে পড়া কষ্টটা তাকেও ভিজিয়ে যায়। ভিনগ্রহের খেলোয়াড় মেসির পারফরম্যান্সও বলে দিচ্ছে, তার বুকেও জমে আছে সেই কান্না। সত্যি আর্জেন্টিনার মেসি এখন তিনি!
ব্রাজিলিয়ানরা বলবে, এটা নেইমারের বিশ্বকাপ। ৩ ম্যাচে তার ৪ গোল, এবারের আসরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্কোরার। কিন্তু ব্যক্তি জাদুর মোহে যদি এবারের বিশ্বকাপ আটকে গিয়ে থাকে, তাহলে সেই জাদুকরের নাম তো মেসি। গ্র“পপর্বের প্রতিটা ম্যাচে মেসিকে ফুটবল রোমান্টিকরা আবিষ্কার করেছে নতুন চেহারায়। তিন ম্যাচ, ১+১+২=৪ গোল। তিনটি ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার। আর্জেন্টিনার তিনটা জয়, শতভাগ সাফল্যে গ্র“প চ্যাম্পিয়ন হওয়া, সবকিছুর মধ্যে কেবল মেসি। এতটা মেসিময় আর্জেন্টিনা তো আলবেসিলেস্তারা কখনোই ছিল না! একজনের জাদুতে একটি দলের শ্রেষ্ঠত্বের এমন গল্প এবারের বিশ্বকাপের অন্য কোনো দেশের নেই।
প্রথম ম্যাচের প্রথমার্ধে বসনিয়া হার্জেগোভেনিয়ার বিপক্ষে বড় অস্বস্তিতে ছিলেন মেসি। কোচের আক্রমণের ছক ছিল দুই ফরোয়ার্ড দিয়ে সাজানো। সেখানে বাঁ-পায়ের জাদুকর মেসির বাঁ-প্রান্ত থেকে আঘাত হানতে কষ্টই হচ্ছিল। বিরতিতে দুই পাশে দুই ফরোয়ার্ড, মাঝে মেসি থাকলেন। বদলানো কৌশলে স্বস্তিতে ফেরা মেসি ট্রেডমার্ক শটেই আর্জেন্টিনাকে জেতানো গোলটা করেছিলেন। ২০০৬ বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে বদলি হিসেবে গোল করেছিলেন মেসি। তারপর আবার বিশ্বকাপ গোল আট বছর পর। মাঝের ২০১০ বিশ্বকাপে জাতির স্বপ্ন কাঁধে নিয়েও ভেঙে পড়েছিলেন। গোলের মাস্টার গোল পাননি একটাও। এবারের বিশ্বকাপ শুরুই হয়েছে তার গোল দিয়ে। তাও দলকে জেতানো গোল।
দ্বিতীয় ম্যাচে মেসি পড়লেন নতুন ঝামেলায়। ওখানে সব খেলোয়াড়ের ডিফেন্স ইরানের। মেসি বলেছিলেন, তার দুই পাশে হিগুয়াইন ও আগুয়েরোকে রেখে খেলা দলের সবার জন্যও স্বস্তিকর। তাই হল। কিন্তু আত্মরক্ষার পারস্য দেয়ালে ওই মতবাদ ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। অন্যরাও পারলেন না গোলের খেলায় গোল এনে দিতে। ওই ম্যাচের নিশ্চিত পরিণতি তো গোলশূন্য ড্র! ইতিহাসে যা ইরানের সফল দেয়াল গড়ার গল্প হিসেবে লেখা থাকত। সবাই যখন হাল ছেড়ে দেয়, ভাবনা যেখানে গিয়ে শেষ হয় সেখান থেকে নতুন শুরুর জন্ম দিতে জানেন মেসি। ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে বাঁ-পায়ের আরেকটি জাদু দেখিয়েছিলেন। সেই গোলে নিশ্চিত পয়েন্ট হারানো ম্যাচে জয় আর্জেন্টিনারই।
দুই ম্যাচে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত হয়ে গেলে তৃতীয় ম্যাচে তেমন জোর দেয় না বিশ্বকাপের দলগুলো। কিন্তু এটা ১৯৭৮ ও ১৯৮৬’র পর তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার খোঁজে আসা আর্জেন্টিনা। এটি বিশ্বকাপে নিজেকে আদর্শরূপে খুঁজে পাওয়া মেসি। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে শেষ বিশ্বকাপের ৯০ মিনিট মাথা কুটে মরেছিলেন মেসি। গোল পাননি। সেবারও এই গোলরক্ষক ইনিয়েমা ছিলেন। মেসির অন্তত ৪টি শট ঠেকিয়ে ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন। কিন্তু এবার আড়াই মিনিটের সময়ই মেসি নিয়েছেন প্রতিশোধ! গেল বিশ্বকাপে অন্তত চারবার তাকে গোলবঞ্চিত করার প্রতিশোধ নিয়েছেন ক্যারিয়ারের দ্রুততম গোল করে! কাছ থেকে মেসির বাঁ-পায়ের প্রবল শটও যেন ওই কথা বলছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যে সমতা এনেছিল নাইজেরিয়া। কিন্তু আবার লিড এনেছেন মেসি। এবং তা এমন এক গোলে যেমনটি করার স্বপ্ন সব সেট পিস বিশেষজ্ঞই দেখেন। বাঁ-পায়ের নিপুণতায় ফ্রিকিকে মেসি লেখেন নতুন এক কাব্য। কেন তিনি ফুটবল জাদুকর, ফিফার চারবারের বিশ্বসেরা, কেনইবা ভিনগ্রহের ফুটবলার তা প্রতি ম্যাচে ব্যাখ্যা করে চলেছেন মেসি। ৩ ম্যাচে আর্জেন্টিনার গোল ৬টি, ৪টি মেসির, ১টি আÍঘাতী, ১টি রোজোর।
বরাবর মেসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ক্লাব বার্সেলোনার খেলোয়াড়। যেখানে প্রায় সাড়ে তিনশ’ গোলের অবিশ্বাস্য কাণ্ড। ক্লাবের জন্য আরাধ্য সবকিছু আকাশ থেকে নামিয়ে আনেন মাটিতে। আর্জেন্টিনা দলে খুঁজে ফেরা সেই মেসি এখন ব্রাজিলে। বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণের জাতীয় দায়িত্ব ২৭ বছরের কাঁধে নিয়ে চলছে লড়াই। কোন মেসির? আর্জেন্টিনার। জুপিটার থেকে আসা আর্জেন্টিনার ফুটবলার! নাইজেরিয়ার কোচ কেশি তো বলেই দিয়েছেন, এই মেসিকে থামায় সাধ্য কার! এ তো জুপিটারের খেলোয়াড়! ভিনগ্রহ বললে সবচেয়ে বড়টাই কেন নয়!
- See more at: http://www.jugantor.com/last-page/2014/06/27/116045#sthash.ItqBWRWO.dpuf

No comments:

Post a Comment