Tuesday, June 24, 2014

সুড়ঙ্গে মেট্রোর রেক বিগড়ে তীব্র আতঙ্ক

সুড়ঙ্গে মেট্রোর রেক বিগড়ে তীব্র আতঙ্ক

METRO
সুড়ঙ্গে আটকে পড়ে অসুস্থ যাত্রী। ছবি সৌজন্য: ই টিভি নিউজ বাংলা।
অনির্বাণ ঘোষ ও সংবিদা লাহিড়ী

বড়সড় বিপর্যয় থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন কয়েক হাজার মেট্রোযাত্রী৷ পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা আর সুরক্ষা--কলকাতার গর্ব মেট্রো রেলের তিনটি পালকের মধ্যে প্রথম দু'টি আগেই খসে পড়েছিল৷ সোমবার ফের একবার সুড়ঙ্গের মধ্যে দীর্ঘ ক্ষণ ট্রেন আটকে যাওয়ায় ঘটনায় যাত্রীসুরক্ষা তো বটেই, তার জেরে সময়ানুবর্তিতাও ধাক্কা খেল ভয়াবহ ভাবে৷ এক দিকে দমবন্ধ হয়ে মেট্রোযাত্রীদের অসুস্থ হয়ে পড়া আর অন্য দিকে ব্যস্ত সময়ে ঘণ্টা দুয়েক মেট্রো চলাচল বন্ধ থাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ সইতে হয় নিত্যযাত্রীদের৷ মহানগরীর লাইফ-লাইন বিকল হয়ে পড়ার আঁচ পাতাল থেকে উপরে পৌঁছতে সময় লাগেনি৷ ভিড় আছড়ে পড়ে বাসে-ট্রামে৷

মেট্রো কর্তৃপক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়ে দায় সারলেও এই বিভ্রাটের ঘটনায় ফের অভিযোগ উঠেছে, উদ্ধারকাজের ক্ষেত্রেও কেন বরাবর ঢিলেমির পরিচয় দেয় মেট্রো? আধিকারিকদের অনেকেই এই ঘটনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন৷ মনে করছেন, কান ঘেঁষে কেটে গেল বড় বিপদ৷ এ দিনের ঘটনায় অন্তত তিন জনের গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া ছাড়াও কমপক্ষে ৩০-৩৫ জন সামান্য বা মাঝারি অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানা গিয়েছে৷ মেট্রোকর্মীদেরই একাংশ মনে করছে, 'নন-এসি রেক হওয়ায় জানালা খোলা ছিল কামরার৷ ফলে ভ্যাপসা গরমে শ্বাসকষ্ট হলেও, অক্সিজেন চলাচল পুরো বন্ধ না-হওয়ায় জোর বেঁচে গিয়েছেন যাত্রীরা৷' তাঁরা প্রমাদ গুণছেন, এই ঘটনা দুর্ভাগ্যক্রমে যদি এসি রেকে হত, তা হলে ভিড়ের মধ্যে কত যাত্রী যে অক্সিজেনের অভাবে দমবন্ধ হয়ে মারা যেতেন বদ্ধ কামরার ভিতর, তার ইয়ত্তা থাকত না৷

তখন বেলা ১১টা ২৩ মিনিট৷ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, ময়দান ও পার্ক স্ট্রিটের মাঝে সুড়ঙ্গের মধ্যে আচমকা থমকে যায় দমদমগামী ট্রেনটি৷ শুধু তা-ই নয়, বিদ্যুত্‍ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আলো-পাখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দরজা আটকে গিয়ে ভয়াবহ দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়৷ ভুক্তভোগী যাত্রী অনির্বাণ সেনের কথায়, 'মূল অফিস-টাইম সদ্য পেরিয়ে যাওয়ায়, সে সময়ে ট্রেনে ঠাসাঠাসি অবস্থা ছিল না বটে, কিন্ত্ত ভিড় ছিল যথেষ্টই৷ দরদর করে ঘামতে শুরু করি৷ একসময় শ্বাসকষ্ট শুরু হয়৷ ধীরে ধীরে আতঙ্ক ছড়াতে দেরি হয়নি৷ ট্রেন যে এগোবে না, বিদ্যুত্‍ সংযোগও ফিরবে না, আমাদের সকলকে চালকের কেবিনের দরজা দিয়ে সিড়ি দিয়ে নীচে নামতে হবে বদ্ধ কামরা থেকে বেরোনোর জন্য, সেই অ্যানাউন্সমেন্টটাও হয়েছে ১২টার একটু আগে৷'

শ্বাসকষ্টের সমস্যা যখন কমবেশি সকলকেই কাবু করতে শুরু করেছে, তখন দেবমিতা ভট্টাচার্যের মতো অ্যাজমা রোগীর অবস্থা একেবারে কাহিল হয়ে পড়ে৷ একটি দৈনিক সংবাদপত্রের কর্মী ট্রেন থেকে নেমেই অচৈতন্য হয়ে পড়েন৷ ভূগর্ভ থেকে বেরোনোর বেশ কিছু ক্ষণ পর তাঁর জ্ঞান ফেরে৷ ঘটনার প্রায় ছ' ঘণ্টা পর, একটু ধাতস্থ হয়ে এ দিন সন্ধেয় তিনি বলেন, 'মেট্রো থেমে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পর আলো-পাখা বন্ধ হয়ে যেতেই যাত্রীরা উসখুস করতে শুরু করে৷ ১০-১৫ মিনিট কেটে যাওয়ার পরও যখন বিদ্যুত্‍ সংযোগ ফিরছে না, দরজাও খুলছে না, তখন আতেঙ্ক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়৷ ইনহেলার নেওয়ার পরও শ্বাসকষ্ট থেকে রেহাই পাইনি৷ ভাগ্যক্রমে আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়৷ অনেক ক্ষণ পর ট্রেন থেকে নামলাম, এটুকুই শুধু মনে আছে আমার৷'

দেবমিতার সেই সহকর্মী তমাল চট্টোপাধ্যায় বলেন, 'মেট্রো থেকে নামার পর ১০০ মিটারেরও বেশি পথ প্রায় অন্ধকারে হেঁটে এসে স্টেশনে উঠি৷ তখন প্রায় সাড়ে বারোটা৷ মাঝের সময়টা যে কী ভাবে কেটেছে, তা ভাবতেও ভয় লাগছে! সুড়ঙ্গের আলো-আঁধারি পরিবেশে ভয়ের রেশটা রয়ে গিয়েছিল প্ল্যাটফর্মে ওঠা পর্যন্ত৷' আর এক যাত্রী প্রিয়তোষ মণ্ডল জানান, অন্তত একজন প্রৌঢ় এবং দু'জন যুবতীকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখেছেন, যাঁদের সঙ্গী অথবা সহযাত্রীরা রীতিমতো পাঁজাকোলা করে তাঁদের বয়ে আনেন পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত৷ 'কোনও মেট্রোকর্মীকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দেখা যায়নি৷ যাঁরা উদ্ধার করতে এসেছিলেন, তাঁদের ব্যবহার ছিল দায়সারা গোছের৷ অসুস্থদের জন্য স্ট্রেচারের ব্যবস্থাও করেনি মেট্রো রেলওয়ে,' বিরক্ত ওই ট্রেনের যাত্রী অনুষ্কা দত্তের৷

অভিযোগ, যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়লেও উদ্ধারকাজে আদৌ তত্‍পরতা দেখায়নি মেট্রো কর্তৃপক্ষ৷ উল্টে এ বিষয়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছেন মেট্রোকর্তারা৷ 'একটা যান্ত্রিক ত্রুটি থেকেই রেক আটকে গিয়েছিল' মন্তব্য করে গোটা ঘটনাকে প্রথমে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেন মেট্রো রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক রবি মহাপাত্র৷ পরে তিনিই ফের বলেন, 'এত বড় যাত্রী দুর্ভোগের ঘটনাকে খাটো করে দেখা হবে না৷ এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গড়া হচ্ছে৷' মেট্রোর 'বুড়ো রেক'-এর দিকে আঙুল তোলার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা আছে কিনা, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন রবিবাবু৷ তিনি জানান, এ দিনের ঘটনার প্রায় দু' ঘণ্টা পর (১টা ১৪ মিনিট) বিদ্যুত্‍ সংযোগ ফিরিয়ে এনে থমকে পড়া ট্রেনটিকে পার্ক স্ট্রিট স্টেশনে আনা হয়৷ তার পরই স্বাভাবিক হয় ট্রেন চলাচল৷

http://eisamay.indiatimes.com/city/kolkata/metro-railways-snag-causes-inconveniences-to-commuters-in-kolkata/articleshow/37112649.cms?

No comments:

Post a Comment