Saturday, August 2, 2014

মায়ের কোলে ঘুমন্ত শিশুরও রেহাই নেই

মায়ের কোলে ঘুমন্ত শিশুরও রেহাই নেই

প্রতাপ চন্দ্র
শিশুদের কাছে মায়ের কোলই সবচে' নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনের গাজা নগরীর শিশুদের কাছে মায়ের কোলে ঘুমন্ত শিশুও আর নিরাপদ নয়। ইসরাইলের ওপর ফিলিস্তিনি হামাস যোদ্ধাদের রকেট হামলার প্রতিশোধের নামে গাজায় চলছে সামরিকভাবে শক্তিশালী ইসরাইলের উন্মত্ত বর্বরতা। ইসরাইল-হামাসের অসম লড়াইয়ে মার খাচ্ছে গাজার বেসামরিক মানুষ। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা; যাদের সঙ্গে এই বিরোধের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। নিজ বাড়ির শোবার ঘর, খেলার মাঠ কিংবা আশ্রয় শিবির -কোনো জায়গাতেই নিস্তার নেই। বিমান হামলা হচ্ছে সবখানেই। মুহুর্তে ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়ছে অগণিত অসহায় শিশু। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইসরাইলি সর্বশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা সাড়ে ১৬শ' ছাপিয়ে গেছে। এদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক শিশু-কিশোর। হাসপাতালে আরো শত শত শিশু আহত হয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ইসরাইল জানিয়েছে, গাজায় অভিযান চালাতে গিয়ে তাদের ৬৩ জন সেনা এবং হামাসের রকেট হামলায় একজন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে।

এদিকে বিবিসি জানায়, গাজায় শুক্রবারের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কমপক্ষে ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই ঘটেছে দক্ষিণ গাজার রাফাহ এলাকায়। ইসরাইলি হামলার অন্যতম লক্ষ্যস্থল ছিল রাফাহ, যেখানে ফিলিস্তিনিদের হাতে একজন ইসরাইলি সৈন্য ধরা পড়েছে বলে মনে করা হয়। গত দু'দিনেও নিহতদের প্রায় সবাই বেসামরিক লোক। আহতরা হাসপাতালেও থাকতেও ভরসা পাচ্ছেন না। প্রচন্ড গোলাবর্ষণের কারণে রাফাহ'র প্রধান হাসপাতালটি থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, হাসপাতালেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে দ্বিধাবোধ করবে না ইসরাইল। কারণ গতকাল ইসরাইলের এক মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মহল থেকে যতই সমালোচনা হোক না কেন, তাতে গুরুত্ব দেবেন না তারা। হামাসের শক্তি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত গাজায় বিমান ও স্থল হামলা চলবেই। 

শুক্রবার ৭২ ঘন্টার যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি বলবত্ করা হয়েছিল তা কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ভেঙে ফেলে ইসরাইল। এরপরেই পূর্ণ শক্তি নিয়ে গাজার উপর নৃসংশ তান্ডব শুরু করে দেশটির সেনারা। এই হামলার মধ্যে মিসরের উদ্যোগে শুরু হয়েছে নতুন একটি যুদ্ধবিরতির চেষ্টা। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল-সিসি বলছেন, সবশেষ এই উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে গাজায় রক্তপাত বন্ধ হবার সম্ভাবনা আছে। হামাসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে একটি ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদল কায়রো যাচ্ছে। তবে ইসরায়েল কোন প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।

এ যেন শিশু নিধন যজ্ঞ!

ইসরাইল গাজায় হামলা শুরু করার পর জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরাইলকে আহ্বান জানানো হয় বেসামরিক লোকজনের যেন প্রাণহানি না হয়। কিন্তু সেই আহ্বানকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যেতে থাকে ইসরাইলি বাহিনী। এসব হামলার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সবচে' গুরুত্ব দিয়ে যেটা প্রচার করছে তা হলো ব্যাপক সংখ্যায় শিশু-কিশোরদের হতাহতের ঘটনা।

গত বুধবার জাবালিয়ার একটি আশ্রয় শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরাইল। এতে ১৬ জন নিহত হয়। টিভিতে দেখা যায়, এদের প্রায় সবাই নারী ও শিশু! এই ঘটনা দেখে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন একটি বিবৃতি দিয়ে একে 'জঘন্য মাত্রার বিভীষিকা' হিসেবে উল্লেখ করেন। এর দু'দিন আগে সোমবার গাজার একটি পার্কে খেলা করছিল একদল শিশু। ইসরাইল হয়তো এদের মধ্যে হামাস জঙ্গিদের ভুত দেখেছিল। মুহুর্তের মধ্যে মৃত্যুদূত হয়ে উড়ে এলো একটি ক্ষেপণাস্ত্র। মাঠের মধ্যে খেলায় ব্যস্ত ৯ শিশুর সবাই নিহত হলো। এর বাইরে এক শিশুর মাও মারা গেলেন। মাঠের বাইরে থাকা আরো ৪৬ জন আহত হলেন।

এর আগে ১৬ জুলাই গাজা সিটির পশ্চিম অঞ্চলে আরেকটি মাঠের মধ্যে খেলা করছিল একদল শিশু। সেখানেও ছোড়া হলো ক্ষেপণাস্ত্র। মারা গেল ৮ শিশু। এসব শিশুদের বয়স ৯ থেকে ১১ বছরের মধ্যে ছিল। সেখানে কয়েকজন বিদেশী নাগরিক এই হত্যাকান্ডের দৃশ্য দেখে দু'টি শব্দে ঘৃণা প্রকাশ করেছিল- বর্বর, অসভ্য!

দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, ২০ জুলাই সবচে বড় আকারের নৃসংশতা চলে শিশুদের উপর এদিন কয়েকটি ভবনে ইসরাইলি বিমান হামলায় শতাধিক লোক নিহত হয়। এদের মধ্যে ২৩ জনই ছিল শিশু! ১০ বছরের বালিকা আফনান ছাদের উপর তার কাজিনদের নিয়ে খেলা করছিল। তারা হঠাত্ তাকিয়ে দেখে পাখির মতো কি যেন একটা তাদের ভবন লক্ষ্য করে উড়ে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। দু'দিন পর ভবনের ধ্বংসস্তুপ থেকে তাদের লাশ বের করা হয়। গত ৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া হামলার প্রথম দশ দিনে ৭৩ জন শিশু নিহত হয়। এদের মধ্যে ৫০ জন ছেলে এবং ২৩ জন মেয়ে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে জাতিসংঘের একটি স্কুলে স্থাপিত আশ্রয়শিবিরে ইসরাইলি হামলায় ১৬ জন শিশু নিহত হয়।

সারা বিশ্বের মানবাধিকার গ্রুপগুলো এভাবে গণহারে শিশুনিধনের নিন্দা জানাচ্ছে। গতকালও ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ অনেক দেশে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। কিন্তু শিশুনিধন বন্ধ হবে কিনা তার নিশ্চয়তা কারো কাছে নেই।

ইসরাইলি সেনাদের চোখে কুমিরের অশ্রু

এই গণহারে শিশু-কিশোর নিহত হবার ঘটনায় 'দুঃখিত' বলে দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন একজন সিনিয়র ইসরাইলি সেনা। তিনি বলেছেন, হামাসের বিরুদ্ধে তারা অভিযান চালাচ্ছেন। কিন্তু কয়েকজন নারী ও শিশু নিহত হয়েছে। তাদের প্রতি আমাদের সমবেদনা রইল! তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, এসব শিশুদের নিহত হবার ঘটনায় গাজার হামাসই দায়ি। কারণ তারা শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। শিশুদের আড়ালে বসে তারা ইসরাইলে রকেট হামলা করে।

বেচে থাকা শিশুদের কি হবে

ইউনিসেফের একজন শিশু বিশেষজ্ঞ গার্ডিয়ান পত্রিকাকে বলেন, গাজার অন্তত ৬০ হাজার শিশুর মানসিক কাউন্সেলিয়েংর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এর মধ্যে নতুন করে ইসরাইলি হামলায় তারা চোখের সামনে শত শত শিশুর মৃত্যু দেখছে। এতে তাদের মানসিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। হামলা থেমে যাবার পরেও এদের স্বাভাবিক হতে অনেকটা সময় লেগে যাবে। কোমল মনের এসব শিশুদের সবাই স্বাভাবিক জীবন লাভ করতে পারবে কি না তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
The Daily Ittefaq

No comments:

Post a Comment