Saturday, August 2, 2014

নেতা-কর্মীদের সড়ক অবরোধ প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলন


তোবা শ্রমিকদের ব্যাপারে কাজ শুরু করেছি : বিজিএমইএ

ইত্তেফাক রিপোর্ট
বেতন-ভাতা আদায়ের দাবি এখন পাঁচ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। শ্রমিক নেতারা বলেছেন, এ দাবি যতক্ষণ পর্যন্ত আদায় না হবে অনশন কর্মসূচিসহ আন্দোলন চলবে। প্রয়োজনে দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। গতকাল রাজধানীর বাড্ডায় বিক্ষোভ সমাবেশে এ ঘোষণা দেয়া হয়।

তোবা গ্রুপের পাঁচ কারখানার ১৬০০ শ্রমিক চার মাস ধরে বেতন-বোনাস পাচ্ছেন না। এ দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও ঈদের আগের দিন থেকে অনশন করছেন তারা। গতকাল অনশনকারী শ্রমিকদের পাশে থাকার অঙ্গিকার করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেয়।
সকাল ১১টা থেকে সমাবেশ শুরু হয়ে বেলা দেড়টা পর্যন্ত চলে সমাবেশ। সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের হতে বাধা দেয় পুলিশ। অবশ্য সেখানে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বাড্ডার হোসেন সুপার মার্কেটে যেখানে তোবা গ্রুপের তিনটি কারখানা রয়েছে, সেখানে আগে থেকেই দুইটি জলকামান ও দুই প্লাটুন পুলিশ সার্বক্ষণিক মোতায়েন রেখেছে প্রশাসন। হোসেন মার্কেটের ৬ষ্ঠ তলায় অনশন করছেন ওই গ্রুপের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা।

শ্রমিকেরা বলছেন, ঈদের আগে বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য সরকার তার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। ফলে মাটি হয়েছে ঈদের আনন্দ। গার্মেন্টের শ্রমিকদের কাছে বার বার দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারায় বিজিএমইএ নেতাদের উপর চরম ক্ষোভ ব্যক্ত করেন শ্রমিক নেতারা। এসব ক্ষোভের বহি:প্রকাশ হয়েছে শ্রমিক নেতাদের বক্তব্যে, শ্রমিকদের শ্লোগান ও প্ল্যাকার্ডে।

'শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম চলছে, চলবে।' 'অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলছে, চলবে।' এমন বিভিন্ন শ্লোগান দিতে দিতে শুরু হয় বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি। পরে হোসেন মার্কেটের সামনের সড়ক অবরোধ করে কয়েকশ শ্রমিক বিক্ষোভ করেন। 'তোবা গ্রুপ শ্রমিক সংগ্রাম কমিটির' ওই বিক্ষোভ সমাবেশে শ্রমিক নেতাদের পাশাপাশি, রাজনৈতিক দলের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রনেতা ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা যোগ দেন।

সমাবেশে তেল-গ্যাস-বিদ্যুত্ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, আজকের এ সমাবেশ মিথ্যাচার, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, দেশে সরকার যে আছে তা বোঝা যায় না। সরকারের অস্তিত্ব আমরা শ্রমিকদের উপর পুলিশের লাঠি চার্জের সময় টের পাই। খুনিদের মুক্তি দেয়ার সময় ও ভূমিহীনদের উচ্ছেদের সময় টের পাই; কিন্তু শ্রমিকরা না খেয়ে থাকলে টের পাই না। বেতন-বোনাস না পেয়ে তোবার শ্রমিকরা যে অনশন করছেন তার দায় মালিকের যেমন আছে তেমনি বিজিএমইএ ও সরকারের আছে। তিনি বলেন, গার্মেন্ট মালিকরা শ্রমিকদের টাকা না দিয়ে টাকা পাচার করছে। রানা প্লাজার শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার নিজেই টাকা তুলে তা শ্রমিকদের দিচ্ছে না।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ভিক্ষা বা ব্যাংক লুট করে এনে তার টাকা নিতে চায়নি শ্রমিকরা। তারা তাদের ন্যায্য অধিকার চেয়েছে। তাই এ ন্যায্য দাবি আজ শুধু ১৬০০ শ্রমিকদের নয়। দেশের ১৬ কোটি মানুষের। তিনি বলেন, তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ারকে বিতাড়িত করে সরকার একে অধিগ্রহণ করে তা পরিচালনা করুক। মালিক যদি পালিয়ে থাকে তাহলে বিজিএমইএ কী করল? বিজিএমইএ যদি কিছু না করে তাহলে সরকার কী করল? শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে না পারলে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

বাংদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, তোবা গ্রুপের এমডি দেলোয়ারকে মুক্ত করানোর জন্য কোন চালাকি-জালিয়াতি চলবে না। শ্রমিকদের দাবি না মেনে সেটা করা হলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। শ্রমিকরা আন্দোলন করলে সরকারের ঘুম হারাম হয়ে যাবে।

নাগরিক এক্য পরিষদের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না শ্রমিকদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, আপনারা যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন তারা ভাল মানুষ নয়। মালিকপক্ষ, বিজিএমইএ ও সরকার কেউই প্রতিশ্রুতি রাখেনি। এ সরকার মালিকের সরকার, শ্রমিকের বন্ধু নয়। শ্রমিকদের সঙ্গে যেটা করা হচ্ছে তা অন্যায় ও বর্বরতা। তাই নাগরিকদের তিনি তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের জন্য শত শত কোটি টাকা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে দেয়া হয়েছে। সে টাকা এখনো তাদেরকে দেয়া হয়নি। সেসব টাকা থেকে কেন তোবার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেয়া হচ্ছে না।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক রাজেকুজ্জামান রতন তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেনের জামিন বাতিল করার দাবি জানান।

সমাবেশে তোবা গ্রুপের মালিক দেলোয়ার হোসেনের জামিনের বিরোধিতা করছেন শ্রমিক নেতারা। অনশনরত শ্রমিকদের বেশিরভাগই মালিকের জামিন হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে শ্রমিকদের অন্য একটি অংশ বলছেন, আমাদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। সে জন্য মালিক জামিন পেলেও আপত্তি নেই। 

এদিকে ৬ষ্ঠ দিনের মতো টানা অনশন কর্মসূচি চালিয়ে এলেও সরকার বা বিজিএমইএ-এর কোন প্রতিনিধি অনশনস্থলে উপস্থিত হন নি। টানা অনশনে এখন শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়েছেন বলে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক জনকে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের অনশনস্থলেই চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।

পাঁচ দফা দাবি

শুক্রবার শ্রমিকদের পক্ষে অনশনস্থলে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ওভারটাইম এবং ঈদের বোনাস অবিলম্বে পরিশোধ করার পাশাপাশি তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য সব কারখানা সচল রাখা, অনশনে অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিকদের সরকারিভাবে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, তোবা গ্রুপের এমডি দেলোয়ার হোসেনের জামিন বাতিল করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া এবং তাজরীন গার্মেন্টসে হতাহত ও নিখোঁজ শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি তুলে ধরা হয়।

বিজিএমইএর বক্তব্য

গত বৃহস্পতিবার সাত কার্যদিবসের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছিলেন বিজিএমইএ নেতারা। অবশ্য শুক্রবার তা প্রত্যাখ্যান করেছেন তোবা গ্রুপের অনশনরত শ্রমিকরা। এ বিষয়ে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এসএম মান্নান কচি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, তারা প্রত্যাখ্যান করেছে কি করেনি সেটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা আগে থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম এখনো চেষ্টা করছি। আজ (শনিবার) থেকে আমরা আমাদের কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে আমরা ব্যাংকের সঙ্গে আলাপ করেছি। আর অন্যান্য অফিসিয়াল কাজ আগামীকাল (রবিবার) থেকে শুরু হবে। খুব শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।

বিভিন্ন স্লোগান ও প্ল্যাকার্ড

যেসব স্লোগান ছিল তা হলো, দুনিয়ার মজদুর এক, এক হও। ফাঁসি, ফাঁসি ফাঁসি চাই, খুনি দেলোয়ারের ফাঁসি চাই। আমাদের সংগ্রাম চলছে চলবেই, রুটি-রুজির সংগ্রাম চলছে চলবেই, ভাত কাপড়ের সংগ্রাম চলছে চলবেই, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলছে চলবেই। অনশন কর্মসূচির স্থল এবং বাইরে সমাবেশ স্থলে শ্রমিকদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা ছিল, তোবা গার্মেন্টে অনশনরত শ্রমিকদের বেতন-বোনাস অবিলম্বে পরিশোধ কর। বেতন বোনাস দিতে দেলোয়ারের জামিন লাগবে কেন? শ্রমিকরা না খেয়ে মরে, সরকার কি করে? তাজরীন হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি দেলোয়ারের ফাঁসি চাই। তোবা গার্মেন্টের শ্রমিকের পাশে আছে সমগ্র বাংলাদেশ। মালিকরা ঈদ করে বিদেশে আর শ্রমিকরা ঈদ করে অনশনে।

বাড্ডার হোসেন মার্কেট ভবনে তিনটি তলায় রয়েছে তোবা টেক্সটাইল, তায়েব ডিজাইন ও মিতা ডিজাইনের কারখানা। পাশের ফুজি ভবনে রয়েছে বুকশান ও তোবা ফ্যাশনস। ওই গ্রুপের ৫টি কারখানার ১৬০০ শ্রমিক গত মে মাস থেকে বেতন পাচ্ছেন না। বকেয়া মজুরির দাবিতে এর আগেও একাধিকবার তারা রাস্তায় নেমেছেন। সর্বশেষ গত ২৩ জুন বিজিএমইএতে কারখানা কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও বিজিএমইএ'র প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে গত ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে জুনের বেতন পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু মালিক পরিশোধ করেননি। এরপর বিজিএমইএতে এক বৈঠকে ২৬ জুলাই বেতন পরিশোধের বিষয়ে আশ্বাস দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাও হয়নি। নিরুপায় শ্রমিকরা ঈদের আগের দিন থেকেই হোসেন মার্কেটে অবস্থিত কারখানায় আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।

ফেডারেশনের সাংবাদিক সম্মেলন

তোবা শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে ৭ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন। গতকাল শনিবার ফেডারেশন-এর উদ্যোগে নির্মল সেন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঘোষণা দেয়া হয়। সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রেডিমেড গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি লাভলী ইয়াসমিন। এতে সভাপতিত্ব করেন জোটের সমন্বয়ক শাহিদা সরকার। তোবার কয়েকজন শ্রমিক ও জোটের অন্য নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বেতন পরিশোধের দাবিতে ফেডারেশন আজ রবিবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবে। পরে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি প্রদান ও কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স ঘেরাও করবেন। 

শ্রম মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ 

তোবা গ্রুপের শ্রমিকদের ৩ মাসের বকেয়া বেতন-ওভারটাইম ও ঈদ বোনাসের টাকা আজকের মধ্যে পরিশোধ না করলে আগামীকাল সোমবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। আমরণ অনশনরত তোবার শ্রমিকদের পাওনা অবিলম্বে পরিশোধের দাবি এবং শ্রমিকদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার উদ্যোগে গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচি দেয়া হয়। বাম মোর্চার সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মোর্চার কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সাইফুল হক, জোনায়েদ সাকী, অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, হামিদুল হক, শহীদুল ইসলাম সবুজ প্রমুখ। সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল পল্টন এলাকা প্রদক্ষিণ করে।

আশুলিয়ায় মানববন্ধন 

আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় তোবা গ্রুপের তারজীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহত শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও প্রতিষ্ঠানটির মালিকের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে তাজরীন ফ্যাশনের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা। গতকাল শনিবার দুপুরে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় তারজীন ফ্যাশনের পুড়ে যাওয়া ভবনের সামনে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির উদ্যোগে এ মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়।

No comments:

Post a Comment