Thursday, June 26, 2014

রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন রবিবার যুদ্ধাপরাধী বিচার

রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন রবিবার
যুদ্ধাপরাধী বিচার
বিকাশ দত্ত ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার রাজাকার কমান্ডার ছৈয়দ মোঃ হাসান আলীর বিরুদ্ধে রবিবার ধানমণ্ডির সেফহোমে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে তদন্ত সংস্থা। হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুট, আটক ও নির্যাতনের মতো ৬টি অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তদন্ত সংস্থার দুই সমন্বয়ক এমএ হান্নান খান ও সানাউল হক আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন। উল্লেখ্য, হাসান আলীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ৩০ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন নির্ধারণ করা আছে। এর এক দিন আগেই তদন্ত সংস্থা এ রিপোর্ট প্রকাশ করতে যাচ্ছে। তদন্ত সংস্থা সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
ট্রাইব্যুনাল আসামি হাসান আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পরও এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ওসি এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দিয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে- আসামিকে এখন পর্যন্ত আটক করা যায়নি। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। চেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ এ তথ্য জানিয়েছেন।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার পর তদন্ত সংস্থা আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। এ পর্যন্ত তদন্ত সংস্থা ব্যক্তি ও সংগঠনসহ মোট ১৯টি মামলার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রবিবার একটি মামলার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া আরও ৮টি মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, সহসা আরও কয়েকটি মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করা হবে।
তদন্ত সংস্থা এর আগে ১৯ মামলার তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- জামায়াতের সাবেক রুকন বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আযাদ, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীম, বদরবাহিনীর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীন, জামায়াতের বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী, জামায়াতের নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য মীর কাশেম আলী, বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকন, আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোবারক হোসেন, জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম ও জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের মামলা। এ ছাড়া জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির একেএম ইউসুফ মারা যাওয়ার পর তাঁর মামলাটি আর না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তিনি ৯ ফেব্রুয়ারি মারা যান। এ ছাড়াও রয়েছে পিরোজপুরের রাজাকার ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার আর সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী। তদন্ত সংস্থা যে ১৯টি রিপোর্ট প্রদান করেছে তার মধ্যে ৯টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আপীল বিভাগে একটি মামলার বিচার নিষ্পত্তি করে রায়ও কার্যকর করা হয়েছে। আরও একটি মামলার রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। যে কোন দিন আপীল বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এ ছাড়া দুটি ট্রাইব্যুনালে আরও ৪টি মামলার রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। ৪টি মামলার বিচারকাজ চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত সংস্থায় ৬শ’ আবেদনের মধ্যে প্রায় তিন হাজার লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এগুলো থেকে যাচাইবাছাই করে পর্যায়ক্রমে মামলার তদন্ত শুরু করা হবে। এখন আরও ৮টি মামলার তদন্ত চলছে। সেগুলোর মধ্যে- বিএনপি নেতা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, রাজাকার সিরাজুল ইসলাম মাস্টার, রুস্তম আলী, আমজাদ, যশোরের মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, আলবদর বাহিনীর উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, মোঃ নাসির ও আতাউর রহমান।
তদন্ত সংস্থার তদন্ত কর্মকর্তা হরিদেব নাথ আসামি হাসান আলীর বিরুদ্ধে তদন্তকাজ পরিচালনা করছেন। তিনি জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, ‘আমরা হাসান আলীর বিরুদ্ধে রবিবার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করব। এর পর তা প্রসিকিউশনে দাখিল করা হবে। তার বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধশতাধিক হত্যা, হিন্দু জনগোষ্ঠী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।’
রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর মামলার সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ জনকণ্ঠকে বলেছেন, ‘আমরা অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে গেছি। হাসান আলীরা দুই ভাই রাজাকার। তার পিতাও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রাস ছিল রাজাকার হাসান আলী। মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট করার সঙ্গে সে সরাসরি জড়িত ছিল। তার নির্দেশেই তাড়াইলে হত্যাকাণ্ড গুলো সংঘটিত হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের আবেদন জানানো হবে। একেকটি অভিযোগের বিপরীতে ৬ থেকে ৭ জন সাক্ষী করা হয়েছে।’
তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা যায়, একাত্তরের ২৭ সেপ্টেম্বর সোমবার কিশোরগঞ্জের তাড়াইল থানাধীন বোরগাঁও সাকিনের বেলংকা রোডে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ময়মনসিংহ জেলার কেন্দুয়া থানার পাকুড়া গ্রামে (বর্তমান নেত্রকোনা জেলা) ৮ জন পুরুষ ও ৪-৫ জন মহিলা ভারতে যাওয়ার জন্য নৌকাযোগে তাড়াইলে আসেন। নৌকার ছইয়ের উপর থেকে আরও তিনজনকে নামিয়ে আনা হয়। নৌকার ৮ যাত্রীকে নিচে নামিয়ে এনে গুলি করে হত্যা করা হয়। যাঁদের হত্যা করা হয় তাঁদের মধ্যে রয়েছেন- মঞ্জু বালা ঘোষ, সুরেশ চন্দ্র ঘোষ, জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণ চন্দ্র ঘোষ শিবু, সুকুমার ঘোষ, রুহিনী চন্দ্র ঘোষ, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ।
একাত্তরের ৮ অক্টোবর শুক্রবার রাকাজার হাসান আলীর নেতৃত্বে তাড়াইলের ১নং তাল জাঙ্গলা ইউনিয়নের আড়াইউড়া গ্রামের কামিনী কুমার ঘোষ ও জীবন কৃষ্ণ ঘোষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে রাজাকার বাহিনী জীবন কৃষ্ণ ঘোষের স্ত্রী মিলন রানী চক্রবর্তীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার ঘর থেকে সোনা রুপার অলঙ্কার লুট করে নেয়। এর পর জীবন কৃষ্ণ ঘোষকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করলে তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এর পর রাজাকার হাসান আলীর নির্দেশে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ দিন রাজাকার বাহিনী দুইজনকে গুলি করে হত্যা করে। তাঁদের ধরে এনে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে গুলি চালালে তাঁদের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়। একাত্তরের ২৩ আগস্ট তাড়াইলের ২নং বাড়তি ইউনিয়ন পরিষদের কোনা ভাওয়াল গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন ভুইয়া ওরফে লালু ভুইয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১১ ডিসেম্বর আব্দুল রশিদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই দিন রাজাকার বাহিনীর ৪০-৫০ জন সদস্য আব্দুর রশিদের বাড়ি ঘেরাও করে। তার পর তাঁকে ধরে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া ওই দিন তাড়াইলের ৬৪টি হিন্দু পরিবারের ১০০টি ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। এর আগে হাসান আলীর নেতৃত্বে ওই গ্রামে লুটপাট চালানো হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সূত্রে আরও জানা যায়, একাত্তরের ২৭ এপ্রিল তাড়াইলের সানাইন গ্রামে পূর্বপাড়ার হাচান আহম্মেদ হেচুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৯ অক্টোবর হাসান আলীর নেতৃত্বে তাড়াইলের শিমুলহাটি পালপাড়াতে হত্যাকা- ঘটানো হয়।
ঘর থেকে পুরুষরা বের হওয়ার পর তাঁদের ধরে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। যাঁদের হত্যা করা হয় তাঁরা হলেন- অক্রুর চন্দ্র পাল, শরৎ চন্দ্র পাল, সুরেশ চন্দ্র পাল, উপেন্দ্র চন্দ্র পাল, গোবিন্দ চন্দ্র পাল, ধরনী চন্দ্র পাল, যোগেস চন্দ্র পাল, দীনেশ চন্দ্র পাল, যতিন্দ্র চন্দ্র পাল, রাখাল চন্দ্র পাল ও মোঃ সুরুজ আলী।
তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, সৈয়দ হাসান আলীর বাবা পূর্ব পাকিস্তানের ডেমোক্রেটিক পার্টি করতেন এবং তৎকালীন কিশোরগঞ্জ মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি নিজে তাড়াইলের রাজাকার কমান্ডার ছিলেন। তবে হাসান আলীর রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলেননি এই প্রসিকিউটর।
সৈয়দ হাসান আলী, পিতা সৈয়দ মোসলেম উদ্দিন। তাদের মূল বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি শিক্ষকতার উদ্দেশে ১৯৩৬ সালে কিশোরগঞ্জ এসে হযরতনগর সাকিনে আনোয়ারুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৯ সালে তা কামিল মাদ্রাসায় উন্নীত হয়। তখন তিনি ওই মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫২ সালে নেজামে ইসলামী পার্টি প্রতিষ্ঠা হলে তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নিয়োজিত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি পূর্বপাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান হন। ওই সময় তিনি কিশোরগঞ্জ মহকুমার শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পাকিস্তানের পক্ষে বিবৃতি প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতায় ঘোর বিরোধিতাকারী ছিলেন।
আসামি পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজাকার বাহিনীতে যোগদান করে এবং কিশোরগঞ্জ মহকুমার তাড়াইল থানায় রাজাকার কমান্ডার হিসেবে নিয়োজিত হন। সে ওই সময় তাড়াইল থানা এলাকায় রাজাকারের দারোগা হিসেবে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আসামি হাসান আলী রাজাকার কমান্ডার হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনসহ পাকিস্তানীদের সমর্থক পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের মানবতাবিরোধী অপরাধ কর্মকাণ্ডে সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করত। হাসান আলী অন্যান্য সহযোগীসহ কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল থানার বিভিন্ন এলাকায় ও কিশোরগঞ্জে নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যা, বাড়িঘর লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, জোর করে টাকা আদায় ও ধর্মান্তরিতকরণসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করে।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment