Tuesday, June 24, 2014

কেবল বৈঠক দ্বারা সুদিন ফিরবে এই আশাবাদ কতটা সঠিক? আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

কেবল বৈঠক দ্বারা সুদিন ফিরবে এই আশাবাদ কতটা সঠিক?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
পাকিস্তানের একটি উর্দু দৈনিকের লন্ডন প্রতিনিধি হলেন আকরম হোসেন। আমার চাইতে বয়সে অনেক ছোট। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করতে এসেছিলেন। আর দেশে ফিরে যাননি। এখন সাংবাদিকতা করেন, সেই সঙ্গে শিক্ষকতাও। তাঁর সঙ্গে আমার কালেভদ্রে দেখা হয়। দেখা হলেই তিনি উপমহাদেশের রাজনীতি নিয়ে আলাপ শুরু করেন। যদিও তিনি খাঁটি পাঞ্জাবী, কিন্তু বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ আন্তরিক। ’৭১ সালের ট্র্যাজেডির জন্য তিনি ভুট্টো-ইয়াহিয়া এবং পাকিস্তানের আর্মি জেনারেলদেরই দায়ী করেন।
দু’তিন দিন আগে আকরম হোসেন আবার আমার বাসায় এলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর লেখালেখির সময় ছাড়া বাসায় অত্যন্ত নিঃসঙ্গ বোধ করি। তাই অনেকদিন পর আকরম হোসেনের দেখা পাওয়ায় খুশি হলাম। অন্তত কিছুটা সময় তাঁর সঙ্গে আলাপ করে ভাল কাটবে। তাঁকে স্বাগত জানিয়ে সোফায় বসাতেই জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি একটি ভারতীয় কাগজে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বৈঠকের ওপর কুলদীপ নায়ারের লেখাটি পড়েছেন?
বললাম পড়েছি। আকরম বললেন, কুলদীপ নায়ার মোদি সমর্থক ছিলেন না। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যে গণতন্ত্র ও সমঝোতার পথে চলবেন সে সম্পর্কে কুলদীপ আশাবাদী হয়েছেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখনও তীব্রভাবে ভারতবিরোধী। তাদের ইচ্ছা ছিল না নওয়াজ শরীফ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যান। কিন্তু শরীফ তাঁদের আপত্তি উপেক্ষা করে দিল্লীতে গেছেন এবং মোদির সঙ্গে আলাপের সময় একবারও কাশ্মীর সমস্যার কথা তোলেননি। তাতে কুলদীপ খুশি হয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন মোদি-শরীফ বৈঠক দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের সুুদিন ফেরাবে।
অবশ্য একই সঙ্গে কুলদীপ তাঁর নিবন্ধে লিখেছেন, ‘পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে নওয়াজ শরীফের উপদেষ্টা সরতাজ আজিজ বলেছেন, মোদির সঙ্গে কথা বলার সময় শরীফ গোপনে কাশ্মীর সমস্যা সম্পর্কে তাঁর ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন। দেশে ফিরে আজিজ কেন যে আবার কাশ্মীর ও অন্যান্য বিষয়ে তিক্ততা জাগিয়ে তুললেন তা বোঝা গেল না। হয়ত দেশবাসীকে খাওয়ানোর জন্য এবং সেনাবাহিনী ও মৌলবাদীদের আশ্বস্ত করার জন্য তাঁকে এই কথা বলতে হয়েছে।’
কুলদীপ নায়ারের মূল ইংরেজী প্রবন্ধটি আমি পড়েছি। কলকাতার ‘দৈনিক স্টেটসম্যানে’ তাঁর যে বাংলা অনুবাদ (৬ জুন শুক্রবার) বেরিয়েছে, সেটিও আমার চোখে পড়েছে। আকরম হোসেন আমাকে জানালেন, নায়ারের প্রবন্ধটি পাকিস্তানের একটি ইংরেজী কাগজেও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আমার কাছে প্রশ্ন তুললেন, কুলদীপ নায়ার যেভাবে বলছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর পদে বসার পর কট্টরপন্থী নরেন্দ্র মোদি বদলে গেছেন এবং শরীফের সঙ্গে বৈঠকের পর মোদির মুসলিমবিরোধী নীতি অনুসরণের যে আশঙ্কা ছিল তা কেটে গেছে, তা কি আপনি সঠিক মনে করেন? পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সত্যই কি সম্পর্কের সুদিন ফিরে আসতে চলেছে?
আকরম হোসেনকে বলেছি, আমি এ প্রশ্নের জবাব এখনই দিতে পারব না।
মোদি সরকার মাত্র ক্ষমতায় বসেছে, তাদের কার্যকলাপ আমাদের আরও কিছুদিন লক্ষ্য করতে হবে। তবে কুলদীপ নায়ারের অতি আশাবাদে শরীফ হতে চাই না। কাশ্মীর সমস্যায় সমাধান ছাড়া ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে তা আমি বিশ্বাস করি না। বর্তমানে দিল্লী ও ইসলামাবাদের মধ্যে যে স্থিতাবস্থা, তা আমেরিকার চাপিয়ে দেয়া স্থিতাবস্থা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালেও সিমলায় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কাশ্মীরসহ দুই দেশের মধ্যে স্থিতাবস্থা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু বেশিদিন তা রক্ষা করতে পারেননি। বর্তমানে নওয়াজ শরীফও তা পারবেন মনে হয় না। শুধু পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে নয়, পাকিস্তানের জনগণের মধ্যেও কাশ্মীর নিয়ে তীব্র ভাবাবেগ আছে। এই ভাবাবেগ পাকিস্তানের কোন সরকারই উপেক্ষা করতে পারবে না।
কথায় বলে ‘যে মার দেয় সে ভোলে, যে মার খায় সে ভোলে না।’ কাশ্মীর সমস্যায় ভারত মার দিয়েছে, সে তা ভুলতে পারে কিন্তু এই সমস্যা নিয়ে পাকিস্তান মার খেয়েছে, সে তা ভুলতে পারে না। কুলদীপ নায়ার একজন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ কলামিস্ট হয়েও এই সত্যটি ভুলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লী সফরে আসা এবং মোদি সরকারের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর মধ্যে দুই দেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা দেখছেন। একজন ভারতীয় সাংবাদিকের দৃষ্টিকোণ তাঁর। একজন পাকিস্তানী সাংবাদিকের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারতেন না। মোদি সরকার আন্তরিক হলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক বাড়তে পারে। কিন্তু কাশ্মীর সমস্যার সমাধান ছাড়া এই দু’দেশের মধ্যে প্রকৃত মৈত্রী ও সম্পর্ক যে গড়ে উঠবে না এই বাস্তবতা নায়ারের মতো বুদ্ধিজীবীরা বুঝেও বুঝে উঠতে চান না।
‘কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এই দাবি মেনে নিয়ে যদি পাকিস্তানকে ভারতের সঙ্গে মৈত্রী করতে হয়, তাহলে গত ৬০ বছরে তিন তিনটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কেন? কাশ্মীর-বিভক্তি কেন? কাশ্মীর মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হওয়া কেন? এসব প্রশ্ন আমার কাছে রেখে আকরম হোসেন সেদিন বিদায় নিয়েছিলেন; কিন্তু প্রশ্নগুলো আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। আমার মনে হয়েছে, পরিস্থিতি এবং আমেরিকার চাপে পাকিস্তান কাশ্মীর সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে ভারতের সঙ্গে কিছুকাল স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে পারে। কিন্তু কতদিন তারা সেটা পারবে তা নির্ভর করে মোদি সরকারের কার্যক্রমের ওপর।
কাশ্মীরের ভারত-ভুক্তির সময় তাকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করে ভারতের সংবিধানে একটি বিশেষ ধারা যোগ করা হয়েছিল। এটি ৩৭০ ধারা। নরেন্দ্র মোদি তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকারে বলেছেন, সংবিধানের এই ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মীরকে ভারতের পুরোপুরি অঙ্গীভূত করা হবে। মোদি প্রধানমন্ত্রীর পদে বসার পর যদি শিব সেনা, আরএসএস-কে খুশি করার জন্য কাশ্মীর সম্পর্কে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তাহলে শুধু কাশ্মীরেই নয়, ভারতেও গোলযোগ দেখা দেবে। কুলদীপ নায়ারও এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। গোঁদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আছে মোদির আরেকটি নির্বাচনী অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারটি হলো বাবরী মসজিদ যেখানে ছিল সেখানে রামমন্দির তৈরি করা। মোদি সরকার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গেলে সারা ভারতেই আবার সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়বে।
অনেকের আশা নির্বাচনী প্রচারণায় মোদি যা-ই বলে থাকুন, ভারতের মতো এত বড় দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি তাঁর আগের উগ্রপন্থী ভাবমূর্তি মুছে ফেলা এবং দেশের ভেতরে-বাইরে সংঘাত সৃষ্টি নয়, সমঝোতা তৈরির পথেই অগ্রসর হবেন। এখন পর্যন্ত এই সমঝোতা প্রতিষ্ঠার পথেই তিনি এগোচ্ছেন মনে হয়। তিনি তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত সকল দেশের প্রধানমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। যা আগে ভারতের আর কোন প্রধানমন্ত্রী জানাননি। চিরবৈরী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশের যে হাসিনা সরকারের প্রতি মোদি সরকার সহযোগিতার হাত বাড়াবেন না বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেই হাসিনা সরকারের সঙ্গে প্রথমেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন মোদি। বাংলাদেশের সঙ্গে সকল সমস্যার সমাধান করার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারতের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রথমেই বাংলাদেশ সফরে আসছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় মোদি যে চীন সম্পর্কে হুমকি দিয়ে কথা বলেছিলেন, সেই চীনের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের বিদেশমন্ত্রীর সব চাইতে সখ্যপূর্ণ বৈঠক হয়েছে এবং তারা দু’দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেছেন। মোদি জাপানের সঙ্গেও সহযোগিতা চান এবং সবচাইতে বড় কথা, মোদিকে প্রায় ৯ বছর যাবত আমেরিকায় যাওয়ার ভিসা না দেয়ায় ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পাতাতে খুব অনুকূল মনোভাব পোষণ করবেন না বলে যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তিনি সেটাও অমূলক প্রমাণ করেছেন। তিনি আমেরিকা সফরের জন্য প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন এবং আগামী সেপ্টেম্বর মাসেই তাঁর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের জন্য সেদেশে যাচ্ছেন। গত কংগ্রেস সরকারের আমলে ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানীকে হেনস্থা করা নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে শীতল আবহ তৈরি হয়েছে, মোদি সরকার সেটা কাটিয়ে উঠতে চায় বলে দিল্লীর পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
এক কথায় প্রধানমন্ত্রী মোদি শুধু নিজের আগের ভাবমূর্তিই পাল্টাচ্ছেন না; তাঁর সরকারেরও একটা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন বলে এখন পর্যন্ত মনে হয়। কিন্তু তিনি কতদিন তা পারবেন এবং কতদিন এই পরিবর্তিত ভাবমূর্তিতে অবস্থান রাখতে পারবেন সেটাই এখন প্রশ্ন। এই প্রশ্ন শুধু পাকিস্তানের সাংবাদিক আকরম হোসেনের নয়, কোন কোন ভারতীয় সাংবাদিকেরও। কুলদীপ নায়ারের মতো এক কালের মোদিবিরোধী কলামিস্টও ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা পরিবর্তনের আশাবাদী; কিন্তু তার সরকারের ভবিষ্যত কার্যক্রম সম্পর্কে এখনও সংশয় ত্যাগ করতে পারেননি।
পারবেন কি মোদি সরকার কাশ্মীর সমস্যার একটা সুরাহা করতে, যা পাকিস্তানের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব হবে, কাশ্মীরের জনগণকে সন্তুষ্ট করবে এবং অন্যদিকে ভারতের মানুষকেও আশ্বস্ত করবে? এটা করা একমাত্র মোদি সরকারের পক্ষেই সম্ভব। কারণ ভারতীয় মানসিকতা কাশ্মীরের ব্যাপারে বিজেপি ভারতের স্বার্থ বিসর্জন দেবে না এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী। কংগ্রেস সরকারের ওপর তাদের সে বিশ্বাস ছিল না। আগের বিজেপি সরকারও তাই পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নে এগোতে পেরেছিল, বর্তমান বিজেপি সরকারও পারবে। আগের বারের চাইতে একটু বেশি পারবে। কারণ বর্তমান বিজেপি-প্রধানমন্ত্রীর হাতে এখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং দেশে মোদি হাওয়া বইছে।
কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হলে উপমহাদেশে সন্ত্রাসের সম্ভাবনা দূর হবে এবং জঙ্গী মৌলবাদের উৎপাত বন্ধ হবে। কাশ্মীর সমস্যা থেকেই প্রথম উপমহাদেশে সন্ত্রাসী তৎপরতার সূচনা এবং তা শুধু ভারতে নয়, বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে স্থায়ী সমস্যার রূপ ধারণ করেছে। ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান দ্বারা যেমন মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তেমনি কাশ্মীর সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান দ্বারাও উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এমনকি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য আঞ্চলিক দেশসহ এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার কমনওয়েলথ গড়ে তোলা যায়, যা ভারতীয় মহাসাগরীয় এলাকাকে বাইরের হস্তক্ষেপ ও সর্বপ্রকার সন্ত্রাসমুক্ত করবে এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ী হবে। কাশ্মীরের মতো মূল সমস্যাকে এড়িয়ে অন্যান্য সমস্যার মীমাংসা দ্বারা পারস্পরিক সহযোগিতা স্থায়ী করা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে লাভ নেই।
ভারত ও পাকিস্তানের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ওপর গোটা উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নির্ভরশীল এ কথা বলা হলে অত্যুক্তি করা হয় না। গণতন্ত্রের ভবিষ্যতও এই সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তানে সেনা সমর্থন-নির্ভর গণতন্ত্রের (মার্কিন পাহারায়) বদলে খাঁটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। জঙ্গী মৌলবাদীদের প্রভাব থেকে সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসন মুক্ত করা প্রয়োজন। একটি গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের সঙ্গেই বাংলাদেশ, ভারতসহ সকল প্রতিবেশি দেশের গণতান্ত্রিক মৈত্রী ও সহযোগিতা গড়ে উঠতে পারে। একটি দুর্বল ও সেনানির্ভর গণতন্ত্র পাকিস্তানে টিকিয়ে রাখা হলে তার সঙ্গে মৈত্রী ও সহযোগিতা টিকিয়ে রাখা প্রতিবেশী কোন দেশের পক্ষেই সম্ভব হবে না।
পাকিস্তানে ভারত-বৈরী সেনাশাসনের উদ্ভবও কাশ্মীর সমস্যার কারণে। ভারত সামরিক অভিযান চালিয়ে কাশ্মীর দখল করার পর পাকিস্তানের ভীত রাজনৈতিক নেতারা (লিয়াকত সরকার) আমেরিকার কাছে অস্ত্র সাহায্যের জন্য ধর্ণা দেয় এবং আমেরিকা সেই সুযোগে পাকিস্তানকে নিরাপত্তা দানের আশ্বাস দিয়ে সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ করে। আমেরিকার মদদেই পাকিস্তানে সেনা শাসন শুরু হয় এবং সেনা শাসকরা সম্মুখযুদ্ধে না পেরে কাশ্মীরে সন্ত্রাসী পাঠানো শুরু করেন। ভারতবিরোধিতা থেকে এককালের সেক্যুলার কাশ্মীরে জঙ্গী মৌলবাদের সমর্থন বাড়ে। আফগান যুদ্ধ এই মৌলবাদের শক্তি বাড়ায়। এই মৌলবাদের থাবা এখন বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রসারিত। এই ইসলামী জঙ্গীদের পাশাপাশি ভারতেও হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থী দল গড়ে উঠেছে।
নরেন্দ্রনাথ মোদি এই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছেন এটা সত্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি এই হিন্দুত্ববাদের খোলসে ঢাকা থাকবেন, না এই খোলস ভেদ করে গণতান্ত্রিক ভারতের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসরণ করে নিজেকে ‘জনগণমন অধিনায়কের’ অবস্থানে তুলে আনবেন এটা তাঁর এবং তাঁর সরকারের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে। তিনি কি দুঃসাহসী হয়ে কাশ্মীর সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বড় বড় সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান দ্বারা গোটা এশিয়ায় গণতান্ত্রিক ভারতের নেতৃত্বকে স্থায়ী ও নিশ্চিত করতে চাইবেন? -যদি তিনি তা চান, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ বাধিয়ে রাখা নয়, তাঁকে দেশটির সঙ্গে কাশ্মীর ও অন্যান্য বিরোধ মিটিয়ে ফেলে একটি গণতান্ত্রিক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কাজে সহযোগিতা যোগানো উচিত। উপমহাদেশের সমৃদ্ধি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি গণতান্ত্রিক পাকিস্তান দরকার; সন্ত্রাসকবলিত এবং সেনাশাসিত পাকিস্তান নয়।
শুধু মোদি-শরীফ বৈঠক দ্বারা উপমহাদেশের সুদিন ফিরবে না। এটা অলীক আশা। উপমহাদেশে সুদিন ফেরাতে হলে সবচাইতে বড় দেশ ভারতকেই সাহসের সঙ্গে সঠিক নীতি-নির্ধারণ করতে হবে।
লন্ডন, মঙ্গলবার, ২৪ জুন ২০১৪।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment