সিডনির মেলব্যাগ ॥ হারিয়ে যাওয়া চশমা
অজয় দাশ গুপ্ত
কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এসেছিলেন বাংলাদেশে। মিডিয়ায় খুব একটা গুরুত্ব পায়নি তাঁর আগমন। একদিকে বিশ্বকাপের উন্মাদনা অন্যদিকে তাঁর দেশটিও ভারত বা আমেরিকা নয়। আমাদের যাবতীয় উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে উত্তেজনা। পাকিস্তান ভারত আমেরিকা মানেই কোননা কোন ধরনের উত্তেজনা। তাঁর সফর নিয়ে আমারও কোন মাথাব্যথা নেই। আমাদের দেশে যে যখন গদীতে তাদের বিদেশ সফর বা তাদের আমলে কেউ আসার অর্থই হচ্ছে তথাকথিত নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়া। বাস্তবে পর্বতের মূষিক প্রসব। বিশেষত আমাদের নেতারা বিদেশ গেলেই সরকারী মিডিয়ার ভেতর দিয়ে এক ধরনের বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে যায়। চনমন করে ওঠে তাদের প্রতিভা! বিমান বন্দর থেকে গণভবন বা প্রেস ব্রিফিং সর্বত্র সাফল্যে গর্বিত বাকস্ফুর্তি। হুন সেনের এই সফরে নিশ্চয়ই ভাল কিছু হয়েছে। তিনি এমনি এমনি আসার মানুষ নন। তাঁদের দেশে এখন উন্নয়ন কাজ চোখে পড়ার মতো। বিপ্লবের নামে পলপটের গণহত্যা আর এককেন্দ্রিক পাগলামির কারণে যে মাতম তার নাগপাশ মুক্ত কম্বোডিয়া দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। সে দেশের মানুষ এখনও মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরোপুরি। এখনও সেখানে প্রবীণ মানুষের মনে আতঙ্ক আর এক প্রজন্মের মানুষ জীবিত নেই বললেই চলে। গৃহযুদ্ধের কালে বেছে বেছে মেরে ফেলা হয়েছিল তাদের। বিশেষত যারা ভাবতে জানত দ্বিমত পোষণ করত বা একনায়কতন্ত্র মানত না তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হয়নি। আমাদের মতো দু’ ভাগে বিভক্ত সেই জাতি সর্বনাশের কিনারা থেকে ঠিক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অতীতের স্মৃতি থাকলেও অতীত নিয়ে হানাহানি নেই। বিষাদ মোড়ানো মানুষগুলো জেগে উঠেছে নতুন স্বপ্নে। এরা ইউরোপিয়ান নয়, আফ্রিকান নয়, মঙ্গল গ্রহেরও নয়। আমাদের মতো এশিয়ান। খাদ্য বস্ত্র আচার সংস্কৃতি সবকিছুতেই আমাদের কাছাকাছি। তারা পারলে আমরা কেন পারছি না? শুধু কি ধর্মের কারণে আমরা মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সমঝোতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান থেকে বঞ্চিত হলাম বা হয়ে চলেছি? আমার তা মনে হয় না। নানা কারণে আজ আমাদের এই দূরবস্থা। আমরা হুন সেনের কাছ থেকে জেনে নিতে পারতাম সিহানুকের ঘোর সমর্থক ডান আর পলপট ঘেঁষা বামের ভেতর কি ভাবে ঐক্য সম্ভব হলো। যে দেশে আমাদের মতো আমেরিকা দুশমন আর সাম্রাজ্যবাদ তার থাবা হেনেছিল সে দেশে আজ রাস্তা ঘাটে আমেরিকান। বয়ে চলেছে পর্যটনের স্রোতধারা। না আমাদের মতো মাতবরী করার রাষ্ট্রদূত নাই সে দেশে। একদা শত্রুও বুঝে গেছে মাতবরী চলবে না। চলবে বিনিময়। পারস্পরিক সমঝোতা আর সম্মানের এই জায়গাটা আমরা আজও তৈরি করতে পারিনি। পারিনি নিজেদের ঐক্য আর ভালবাসায় অন্যকে পরাজিত করতে। কম্বোডিয়া পেরেছে। আগেই বলেছি, কয়েক বছর আগে আমি কম্বোডিয়া গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ভ্রমণ ও পাশাপাশি পলপটের গণহত্যা, নির্যাতনের পর দেশটির বর্তমান গতিধারা দেখে আসা। কিভাবে তারা তাদের দেশের যুদ্ধাপরাধী ও দালালদের সাইজ করে সমন্বয় সাধন করল সেটাও দেখার বিষয়। নমপেনের জাদুঘরে যাওয়ার পর এটা মানতেই হলো আমাদের চেয়ে খারাপ ছাড়া নভাল কিছু ঘটেনি সে দেশে। পলপটের কথিত বিপ্লবে নিষিদ্ধ তালিকায় যুবকদের হস্তমৈথুন ও জায়গা করে নিয়েছিল। এমন খবর জানলেই গুলির নির্দেশ। আরও কত কি! কৃষকের রক্ত ছাড়া আর কোন রক্তই অপবিত্র এমন ধারণায় সে দেশের মানুষ মরেছে পাখির মতো। আশ্চর্য হয়ে গেছি ভারি পাওয়ারের চশমা বা যাদের চশমার কাঁচ পুরু তাদের ও মেরে ফেলার নির্দেশ ছিল। কারণ তারা জানে আর জানলে কম মানে।
সে দেশটির জাদুঘরে তাদের রাজাকারদের মার্জনা ভিক্ষার দলিল আছে। সারি সারি সে দেশীয় রাজাকারের বয়ান আর মূলস্রোতে ফেরার কাহিনী অবাক করার মতো। আমরা পারিনি। আমাদের রাজাকাররা দিনকে দিন বলশালী হয়ে আমাদের চেপে ধরেছে। এজন্যে কি আমরা দায়ী নই? আমাদের সহমর্মিতা বা উদারতা কোথায় মার খেল? নাকি আদৌ তা ছিলই না আমাদের? সেদেশে উভয় দিক থেকে বিষয় নিষ্পত্তি করার আগ্রহ দেখেছি। জাদুঘরে কথিত বিপ্লবের অত্যাচার শেষে যারা গদীতে যারা দেশ শাসনে তাদের সমন্বয় প্রক্রিয়াও লিপিবদ্ধ আছে। আমারা সেখান থেকে শিখতে পারতাম। আমি নিশ্চিত হুন সেনের সাথে এজাতীয় কোন আলাপ হয়নি। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শান্তি স্থাপনের সহাবস্থানের কৌশল জেনে নিতে চাইনি আমরা। জানতে চাইনি আমেরিকার চির বৈরী এ দেশের এটিএম মেশিনে কিভাবে দু’ ধরনের কারেন্সি বের হয়। একটি তাদের টাকা আরেকটি মার্কিন ডলার। বাজারে হাটে সর্বত্র আমেরিকান মুদ্রার চল। এভাবেই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে তারা।
কম্বোডিয়ার দ্বিতীয় বড় শহর সিয়ামরিপ। শ্যাম থেকে সিয়াম। ভারতীয় ঐতিহ্য আর ইতিহাসের ধারক এই নগরী। কোনদিন ভরতা আসেননি এমন কারিগররা রামায়ণ আর বুদ্ধের কীর্তি খোদাাই করে রেখেছে দেয়ালে দেয়ালে। অভূতপূর্ব। পলপট বাহিনী নাস্তিক ধর্মবিদ্বেষী হবার পরও তা গুঁড়িয়ে দেয়নি। শোনা যায় পরাজয় নিশ্চিত জেনে সিহানুক বাহিনীকে সেই পুরাকীর্তির দুর্গ ছেড়ে বাইরে আসার হুকুম দিয়েছিলেন সিহানুকের সরকার। যাতে সেই প্রাচীন স্তাপনা চুরমার হয়ে না যায়। এ কারণেই হয়ত তাদের ঐক্য অটুট। তারা যুদ্ধ করলেও আমাদের মতো জ্বালাও পোড়াও বা ঐতিহ্য বিনষ্ট করেনা। এন্কার ওয়াট খ্যাত সেই সিয়ামরিপ নগরী এখন পর্যটকে ঠাসা। ভারতীয় সংস্কৃতি রামায়ণ মহাভারত বুদ্ধ নাস্তিকতা চলছে হাতে হাত ধরে। কি ভাবে তা সম্ভব? আমরা জানি না, জানতে চাই না।
হুন সেন ফিরে গেছেন। আমরাও খুশী মনে বলছি সব ঠিক সব ঠিক। কিন্তু আমাদের জ্বলন্ত অতীত আর বিপজ্জনক ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলছি না। বলছিলাম সে দেশে এক সময় মাথার চুলের স্টাইল এমনকি চশমা পরা নিয়েও ঝামেলা ছিল। হয়ত সে কাহিনী জেনে বা জানতে জানতে আমাকেও পেয়ে বসেছিল অজানা আতঙ্ক।
নমপেন থেকে ফেরার পথে বিমান বন্দরে ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে দেখি চশমার খাপ আছে চশমাটা নাই। বড় প্রিয় চশমার ফ্রেম ছিল সেটি। দীপার চশমা দিয়ে কাজ সারলেও মন খারাপ হয়েছিল কিছুদিন। ফিরে এসে ঢাকার কাগজে নমপেনে হারিয়ে যাওয়া চশমা নামে একটি আহাজারীও লিখেছিলাম।
আজ আবার মনে পড়ল। চশমাটা থাকলে দেখতে পেতাম হুন সেন আর আমাদের ভেতর কতটা দূরত্ব। আমি কি পলপটের ভয়ে না একাত্তরের দুঃস্বপ্নে চশমা খুইয়েছিলাম তাও বুঝিনি। এটুকু বুঝি আমাদের জীবনে সহাবস্থান ও শান্তি হারিয়ে যাওয়া চশমা। বেদনার মতো জেগে থাকে দেখা যায় না।
সে দেশটির জাদুঘরে তাদের রাজাকারদের মার্জনা ভিক্ষার দলিল আছে। সারি সারি সে দেশীয় রাজাকারের বয়ান আর মূলস্রোতে ফেরার কাহিনী অবাক করার মতো। আমরা পারিনি। আমাদের রাজাকাররা দিনকে দিন বলশালী হয়ে আমাদের চেপে ধরেছে। এজন্যে কি আমরা দায়ী নই? আমাদের সহমর্মিতা বা উদারতা কোথায় মার খেল? নাকি আদৌ তা ছিলই না আমাদের? সেদেশে উভয় দিক থেকে বিষয় নিষ্পত্তি করার আগ্রহ দেখেছি। জাদুঘরে কথিত বিপ্লবের অত্যাচার শেষে যারা গদীতে যারা দেশ শাসনে তাদের সমন্বয় প্রক্রিয়াও লিপিবদ্ধ আছে। আমারা সেখান থেকে শিখতে পারতাম। আমি নিশ্চিত হুন সেনের সাথে এজাতীয় কোন আলাপ হয়নি। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে শান্তি স্থাপনের সহাবস্থানের কৌশল জেনে নিতে চাইনি আমরা। জানতে চাইনি আমেরিকার চির বৈরী এ দেশের এটিএম মেশিনে কিভাবে দু’ ধরনের কারেন্সি বের হয়। একটি তাদের টাকা আরেকটি মার্কিন ডলার। বাজারে হাটে সর্বত্র আমেরিকান মুদ্রার চল। এভাবেই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে তারা।
কম্বোডিয়ার দ্বিতীয় বড় শহর সিয়ামরিপ। শ্যাম থেকে সিয়াম। ভারতীয় ঐতিহ্য আর ইতিহাসের ধারক এই নগরী। কোনদিন ভরতা আসেননি এমন কারিগররা রামায়ণ আর বুদ্ধের কীর্তি খোদাাই করে রেখেছে দেয়ালে দেয়ালে। অভূতপূর্ব। পলপট বাহিনী নাস্তিক ধর্মবিদ্বেষী হবার পরও তা গুঁড়িয়ে দেয়নি। শোনা যায় পরাজয় নিশ্চিত জেনে সিহানুক বাহিনীকে সেই পুরাকীর্তির দুর্গ ছেড়ে বাইরে আসার হুকুম দিয়েছিলেন সিহানুকের সরকার। যাতে সেই প্রাচীন স্তাপনা চুরমার হয়ে না যায়। এ কারণেই হয়ত তাদের ঐক্য অটুট। তারা যুদ্ধ করলেও আমাদের মতো জ্বালাও পোড়াও বা ঐতিহ্য বিনষ্ট করেনা। এন্কার ওয়াট খ্যাত সেই সিয়ামরিপ নগরী এখন পর্যটকে ঠাসা। ভারতীয় সংস্কৃতি রামায়ণ মহাভারত বুদ্ধ নাস্তিকতা চলছে হাতে হাত ধরে। কি ভাবে তা সম্ভব? আমরা জানি না, জানতে চাই না।
হুন সেন ফিরে গেছেন। আমরাও খুশী মনে বলছি সব ঠিক সব ঠিক। কিন্তু আমাদের জ্বলন্ত অতীত আর বিপজ্জনক ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলছি না। বলছিলাম সে দেশে এক সময় মাথার চুলের স্টাইল এমনকি চশমা পরা নিয়েও ঝামেলা ছিল। হয়ত সে কাহিনী জেনে বা জানতে জানতে আমাকেও পেয়ে বসেছিল অজানা আতঙ্ক।
নমপেন থেকে ফেরার পথে বিমান বন্দরে ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে দেখি চশমার খাপ আছে চশমাটা নাই। বড় প্রিয় চশমার ফ্রেম ছিল সেটি। দীপার চশমা দিয়ে কাজ সারলেও মন খারাপ হয়েছিল কিছুদিন। ফিরে এসে ঢাকার কাগজে নমপেনে হারিয়ে যাওয়া চশমা নামে একটি আহাজারীও লিখেছিলাম।
আজ আবার মনে পড়ল। চশমাটা থাকলে দেখতে পেতাম হুন সেন আর আমাদের ভেতর কতটা দূরত্ব। আমি কি পলপটের ভয়ে না একাত্তরের দুঃস্বপ্নে চশমা খুইয়েছিলাম তাও বুঝিনি। এটুকু বুঝি আমাদের জীবনে সহাবস্থান ও শান্তি হারিয়ে যাওয়া চশমা। বেদনার মতো জেগে থাকে দেখা যায় না।
http://allbanglanewspapers.com/janakantha/
No comments:
Post a Comment