Thursday, June 26, 2014

তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি বিষয়ে সবুজ সঙ্কেত ॥ সুষমার দিনভর ব্যস্ততা

তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি বিষয়ে সবুজ সঙ্কেত ॥ সুষমার দিনভর ব্যস্ততা
স্টাফ রিপোর্টার ॥ তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সই ও স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে ভারত। একই সঙ্গে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে ভারত মাথা ঘামাবে না। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নেই আগ্রহী ভারত। অপরদিকে ভারতের কোন সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করতে দেয়া হবে না বলে তাদের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। ঢাকায় সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর বৈঠক হয়। বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানান, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারতে মতৈক্য তৈরির চেষ্টা চলছে জানিয়ে এ চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। পাশাপাশি ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত চুক্তি ও এর আওতায় স্বাক্ষরিত প্রটোকল বাস্তবায়নের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করতে দেশটির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের ভিসা ব্যবস্থা সহজ করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয় বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
৬৫ বছরের বেশি এবং ১৩ বছরের কম বয়সী বাংলাদেশীদের জন্য পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা দিতে ভারত সম্মত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মাহমুদ আলী বলেন, বৈঠকের শুরুতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের সম্পর্ক যে রক্তের ঋণে আবদ্ধ। এ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে দৃঢ় প্রত্যয় জানিয়েছেন তিনি।
সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ পেলে ভারত ইতিবাচক সাড়া দেবে বলেও বৈঠকে জানিয়েছেন সুষমা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর তরফ হতে প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির পত্র হস্তান্তর করেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্যের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনন্য অবদান উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, দু’দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক সামনের দিনগুলোতে নতুন মাত্রায় উন্নীত হবে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব সময়োত্তীর্ণ বলেও মন্তব্য করেন। বাংলাদেশে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারত সর্বদা পাশে থাকবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এছাড়া বৈঠকে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সন্ত্রাসবাদ দমন নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে মাহমুদ আলী বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ত্রিপুরায় ১০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য পরিবহনে ভারতকে সম্মতি দেয়া হয়েছে বলে মাহমুদ আলী জানিয়েছেন। তবে ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হয়নি। ট্রানজিট নিয়ে কোন আলোচনাও হয়নি বলে তিনি জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবনের প্রস্তাবিত নক্সা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ॥ বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও ক্রমবর্ধমান উন্নয়নমূলক সম্পর্ক গড়তে আশাবাদী ভারত। এক্ষেত্রে দু’দেশের পারস্পরিক সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলতেও আগ্রহী নয়াদিল্লী। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে ভারতের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তাঁর সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, স্থল সীমান্ত চুক্তি, তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি ও সীমান্তের বিএসএফের হত্যার বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন। তিনি জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে খুব ইতিবাচক এবং ক্রমশ উন্নয়নশীল সম্পর্ক দেখতে চাই। আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে আমরা পারস্পরিক সব বিষয়ের সমাধান করতে চাই। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের ব্যাপারে ভারত গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান সুষমা। এ সময় ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণপত্র শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করেন সুষমা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেন, ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ আমন্ত্রণপত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সুষমা স্বরাজের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
একেএম শামীম চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দু’দেশের মধ্যে যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের কথা বলেছেন। তিনি এর সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিশেষ করে উনি বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শত্রু দারিদ্র্য এবং এ দারিদ্র্য নির্মূলে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সীমান্তে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখানো হবে। সন্ত্রাসী ও জঙ্গীদের জন্য বাংলাদেশের মাটি নয়। নূর হোসেনসহ বাংলাদেশের যেসব অপরাধী ভারতে লুকিয়ে আছে প্রধানমন্ত্রী তাদের ফেরত দিতে বলেছেন বলেও জানান তাঁর প্রেস সচিব।
তিনি বলেন, স্থল সীমান্ত চুক্তি, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ও সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকা- দ্রুত সমাধান করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন। ওদিকে সুষমা বলেছেন, স্থল সীমান্ত বিল পার্লামেন্টে আছে এবং এটা প্রক্রিয়াধীন। সুষমা বলেছেন, ঢাকায় আসার আগে তিনি মমতার সঙ্গে কথাও বলেছেন।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগের প্রকল্প রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত কেন্দ্র দ্রুত’ বাস্তবায়ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনায় জোর দিয়েছেন বলে জানান শামীম চৌধুরী।
তিনি বলেন, আগরতলায় চাল পরিবহনের জন্য বলেছেন, রোড কন্ডিশন ভাল করা দরকার। এ ব্যাপারে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) ভারতের সহায়তা চেয়েছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন, আগরতলার সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সেখানকার মানুষ আমাদের সহায়তা করেছে। সেজন্য সেখানে চাল পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ যা যা করার করবে।
প্রধানমন্ত্রী, মৈত্রী ট্রেনের বগি বাড়ানো, বাস সার্ভিস বাড়ানোর কথা বলেছেন। আমাদের নিউক্লিয়ার প্রকল্পে ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতের ভাবাতে ট্রেনিং সুবিধা দেয়ার কথা বলেছেন। অসম-নাগাল্যান্ডের রিফাইনারি থেকে পার্বতীপুরে পাইপলাইন দিয়ে তেল আনার জন্য বলেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত-চীন-মিয়ানমারের জোট বিসিআইএম নিয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে শামীম চৌধুরী বলেন, এ ব্যাপারে উনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন যে, এটা করা দরকার এবং তিনি আশা করেন যে এই চারটা কান্ট্রি একসঙ্গে কাজ করবে। বাংলাদেশ-ভারত-ভুটানের ত্রিপক্ষীয় জলবিদ্যুত উৎপাদন নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিস্তা ও স্থল সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে আশাবাদ ॥ ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা নদীর অববাহিকায় পানির ন্যায্য হিস্যা প্রতিষ্ঠায় অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর বাংলাদেশের পক্ষ হতে গুরুত্বারোপ করা হয়। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের বিষয়টি উত্থাপন করার প্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য গঠনের জন্য প্রচেষ্টা চলছে। তিনি তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের পক্ষ হতে স্থল সীমা চুক্তি ১৯৭৪ এবং ২০১১-এর প্রটোকলটি অনুসমর্থনের জন্য ভারতীয় পক্ষকে পুনরায় অনুরোধ জানানো হয়। জবাবে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটি সম্পাদনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিষয়টি ভারতের রাজ্যসভায় সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।
বৈঠকে যেসব বিষয়ে দুই দেশ পক্ষ
সম্মত হয়েছে ॥ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ৬৫ বছরের অধিক বয়সের এবং ১৩ বছরের কম বয়সীদের ৫ বছরের মাল্টিপল ট্যুরিস্ট ভিসা সুবিধা প্রদান। আগরতলায় বাংলাদেশ ভিসা অফিসকে সহকারী হাইকমিশনে উন্নীতকরণ। গুয়াহাটি-ঢাকা বাস সার্ভিস পরীক্ষামূলকভাবে চালু। মৈত্রী এক্সপ্রেসের ফ্রিকোয়েন্সি ও যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি। ত্রিপুরার পালাটানা হতে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত আমদানি। দু’দেশের সুবিধাজনক সময়ে যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রিপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দু’পক্ষ সম্মত হয়। দু’দেশের সুবিধাজনক সময়ে যৌথ পরামর্শক কমিশনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সভায় যোগদানের জন্য ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান এবং এটি শীঘ্রই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দু’পক্ষ সম্মত হয়। মেঘালয় সীমান্তে নতুন চারটি বর্ডার হাট স্থাপন। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে যে বিষয়গুলো আলোচিত হয় তার মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। বিদ্যুত খাতে সহযোগিতা। বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা। আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক সহযোগিতা। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা। জনসংযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় সহযোগিতা।
নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতা করবে
দুই দেশ ॥ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ হতে দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান বহুমাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কার্যক্রমের বিষয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের তরফ হতে সন্ত্রাস দমনে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অঙ্গীকারের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশের ভূখ- কোন অবস্থাতেই সন্ত্রাসী কর্মকা-ের জন্য ব্যবহৃত হবে না বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান এবং গৃহীত পদক্ষেপের বিষয় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গভীর ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু পরিচালনার বিষয়ে ভারতীয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেন। সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যার সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার ব্যাপারে আবারও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সীমান্তে অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্মূলে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ডিসি-ডিএম পর্যায়ের বৈঠক নিয়মিত অনুষ্ঠানের বিষয়ে উভয়পক্ষ থেকে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াবে বাংলাদেশ ভারত ॥ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে সার্ক, বিমসটেক ও বিসিআইএমের কার্যক্রমে দু’দেশ একত্রে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিসিআইএমের সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে একত্রে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। উপআঞ্চলিক সহযোগিতার আওতায় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুত-জলবিদ্যুত ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগের ব্যাপারে পরবর্তী যৌথসভায় অংশগ্রহণে বাংলাদেশ সম্মত হয়। জনসংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা-গুয়াহাটি এবং ঢাকা-শিলং বাস সার্ভিস দ্রুত চালুর বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় ।
ভারতীয় হাই কমিশনের সংবাদ সম্মেলন ॥ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফর নিয়ে বৃহস্পতিবার রাজধানীর রূপসী বাংলা হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দিন। এ সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ-মিয়ানমার ডেস্কের প্রধান শ্রিপ্রিয়া রঙ্গনাথ ও ঢাকা হাইকমিশনের কাউন্সিলর (রাজনৈতিক ও তথ্য) সুজিত ঘোষ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ আকবর উদ্দিন বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন হবে। এই সফর অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সৈয়দ আকবর উদ্দিন বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ বার্তা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট পৌঁছে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেছেন বলেও তিনি জানান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে ভারত মাথা ঘামাবে না। ভারতের বর্তমান সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর ও বন্ধুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক গড়তে চায়। আমরা সেভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে যাব।
তিস্তা চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দ আকবর উদ্দিন বলেন, তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ভারত খুবই ইতিবাচক। ঢাকা আসার আগেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এ বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলাপ হয়েছে। আমরা এই চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে সৈয়দ আকবর উদ্দিন বলেন, তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি শুধু রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয় নয়। এখানে ভারত এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনের ফেরতের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, ভারত কোন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেয় না। নূর হোসেনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে বলেও তিনি জানান।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ভারতের ভিসা আরও সহজ করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ভারতের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে বুধবার রাতে ঢাকা পৌঁছান সুষমা স্বরাজ। ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছেই সাংবাদিকদের সুষমা জানান, বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছেন। গতমাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার প্রথম কোন সদস্য হিসেবে ঢাকা এলেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারে অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করায় নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-দিল্লী সম্পর্কের ভবিষ্যত নিয়ে কিছুটা সংশয় দেখা দেয়। তবে পরবর্তীতে দুই দেশের বন্ধুত্ব সম্পর্কের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।
বাংলাদেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম সফর ঘোষণার মধ্য দিয়ে ঢাকার সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেয় দিল্লী। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গেও সাক্ষাত করেন সুষমা স্বরাজ।
ঢাকা ত্যাগের আগে আজ শুক্রবার বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি। সফরকালে বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল রূপসী বাংলায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিসের আয়োজনে একটি সেমিনারে বক্তৃতা করেন তিনি।
বাংলাদেশ-ভারত বিষয়ক সেমিনার ॥ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অমীমাংসিত সব ইস্যু দ্রুততম সময়ে সমাধানের ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল রূপসী বাংলায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিজ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক : সহযোগিতার রূপরেখা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।

http://allbanglanewspapers.com/janakantha/

No comments:

Post a Comment