Wednesday, June 25, 2014

পাচারের টাকা ফিরবে না!

পাচারের টাকা ফিরবে না!
শাহ আলম খান
প্রকাশ : ২৬ জুন, ২০১৪

আন্তর্জাতিকভাবে আইনের বেড়াজাল, বিদেশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইমেজ সংকট, সুশাসনের অভাব, বিদেশীদের টাকা ফিরিয়ে দিতে অনাগ্রহ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকরী উদ্যোগের অভাবে বিদেশে পাচার করা সমুদয় টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। কিছু টাকা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনতে হলে সবার আগে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে। আইনি কাঠোমো জোরদার এবং সরকার পরিবর্তন হলেও এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। তাহলেই কেবল বিদেশীদের মনে বাংলাদেশের ব্যাপারে ইতিবচাক মনোভাব তৈরি হবে। তখন তারা সরকারের চাহিদাকে গুরুত্ব দেবে। একই সঙ্গে পাচার করা টাকার ব্যাপারে তথ্য দিতে সহায়তা করবে। এর আগে নয়। এছাড়া রাজনৈতিক চাপে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে নিরপেক্ষভাবে জোরালো উদ্যোগ নিতে পারে না। তারা সব সময়ই রাজনৈতিক বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে পাচার করা টাকা ফেরত আনার ব্যাপারে উদ্যোগী হচ্ছে। ফলে বিদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রয়েছে।
কেননা, টাকা পাচারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে এমন সব তথ্য রয়েছে যাতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তির নামও টাকা পাচারকারীর তালিকায় রয়েছে। তেমনই বিরোধী দলের কয়েকজন নেতার নামও এই তালিকায় রয়েছে, যাদের সঙ্গে সরকারের গোপন আঁতাত রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এদের ব্যাপারে গত মহাজোট সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কখনও কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। যদিও গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এদের টাকা ফিরিয়ে আনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা কথা বলে জানা গেছে উল্লিখিত সব তথ্য।
সূত্র জানায়, পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, দুর্নীতি দমন কমিশনকে যৌথভাবে কাজে লাগাতে হবে। একেকটি দেশের সঙ্গে একেকটি সংস্থা কাজ করে। ফলে এদের সমন্বয় ছাড়া সব দেশের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব। সূত্র জানায়, পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি একদিকে যেমন অনেক কঠিন, তেমনই সময়সাপেক্ষ ব্যাপারও। এই ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়াটিই বেশ জটিল। কেননা সব দেশের আইনই ওই দেশের আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে। এই আইনি কাঠামো ভেদ করে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারকারীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করতে একদিকে যেমন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে, অন্যদিকে সুশাসন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। এই দুইয়ের সমন্বয় না হলে পাচারকারীদের টিকিটিও ধরা সম্ভব হবে না। ফলে বিদেশ থেকে পাচারকারীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা যেমন অসম্ভব হবে, তেমনই তাদেরকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনাও হবে অসম্ভব।
সূত্র জানায়, বিদেশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইমেজ ভালো নয়। টাকা পাচারকারীদের সম্পর্কে তথ্য চাইলেই তারা মনে করে, রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, ফলে তারা ওই সব তথ্য দিতে চায় না। বর্তমানে এবং অতীতে এসব তথ্য ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নজির রয়েছে। যে কারণে একমাত্র আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে এখন ওই সব তথ্য সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব।
ইতিমধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর নামে সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে থাকা প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। এটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো পালন করে আনতে হয়েছে। ওই অর্থ এখন সোনালী ব্যাংকের একটি বিশেষ অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধ, পাচার করা টাকা সম্পর্কে তথ্যের আদান-প্রদানের ব্যাপারে কাজ করছে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ)। এটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন ঠেকাতে নীতি প্রণয়নের কাজ করে। ওই নীতি বাস্তবায়ন করে এফএটিএফের সহযোগী সংস্থা এগমন্ট গ্র“প। ১৪৭টি দেশ এর সদস্য। ওই সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে রয়েছে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (এফআইইউ)। এই এফআইইউর মাধ্যমে দেশগুলোর এগমন্ট গ্র“পের সদস্য। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে ওই নীতি বাস্তবায়নের দিক তদারকি করে এশিয়া প্যাসিফিক গ্র“প অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)।
এর বাইরেও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের সঙ্গে এসব বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের আইনের প্রতিই পরস্পরের শ্রদ্ধা থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট থেকে ২৪টি দেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেছে। আরও ৩টি দেশের সঙ্গে এ চুক্তি করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নিয়মের বেড়াজালে পাচার করা টাকা : প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এগমন্ট গ্র“পের মাধ্যমে পাচার করা টাকার কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে হলে সুনির্দিষ্টভাবে পাচার করা ব্যক্তির নাম-ঠিকানা দিয়ে তথ্য চাইতে হবে। ওই সব তথ্য মিলিয়ে তারা পাচারসংশ্লিষ্ট তথ্য পেলে তা সংশ্লিষ্ট দেশকে জানিয়ে দেবে। কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশে ভিন্ন নামে সম্পদ রাখেন, ওই নাম যদি যে দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে সেই দেশ না জানে তবে ওই ব্যক্তির সম্পদ উদ্ধার করা একেবারেই অসম্ভব। আর পাচার করা টাকা সাধারণত কোনো ব্যক্তি নিজ নামে রাখেন না। রাখেন ভিন্ন কোনো নামে। যেমন ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমিন বিদেশে খ্রিস্টান নাম ধারণ করে টাকা পাচার করেছেন।
দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার আওতায় পাচার করা টাকা আনতে হলে আগে দেশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। ওই মামলায় প্রমাণ করতে হবে যে, ওই ব্যক্তি দেশ থেকে টাকা পাচার করেছেন। এ ধরনের রায় কোর্ট থেকে এলে তা নিয়ে যে দেশে টাকা পাচার করা হয়েছে সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটি অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে তাদের দেশে মামলা করে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি টাকা পাচার প্রমাণিত হয়। তা হলে ওই টাকার মালিক হবে বাংলাদেশ। তার পর আসবে আমানতকারীর প্রশ্ন। যে দেশে টাকা পাচার করা হয়েছে সেই দেশে পাচারকারী একজন আমানতকারী। তিনি আমানতকারী হিসেবে সব সুবিধা পাবেন। সব দেশের আইনই আমানতকারীর আমানতের নিরাপত্তা দিতে সচেষ্ট। এ কারণে ইচ্ছে করলেও টাকা ফেরত আনা সম্ভব নয়।
বিশেষ করে সুইজ্যারল্যান্ডে আমানতকারীদের কঠোর নিরাপত্তা দেয়া হয়। তাদের দেশের আইনে কোনো ব্যাংকে কার কত সম্পদ আছে তা প্রকাশ করা যাবে না। ফলে সুইস ব্যাংক দেশওয়ারি আমানতের পরিমাণ প্রকাশ করলেও ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে পারবে না। তবে এ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন নিয়ে প্রকাশ করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, যেসব দেশে বাংলাদেশ বা অনুন্নত দেশ থেকে টাকা পাচার করা হয়, ওই সব দেশই চায় না টাকা ফেরত দিতে। কেননা তারা পাচার করা টাকাতেই উন্নত। ফলে তারা কোনোভাবেই চাইবে না পাচার করা টাকা ফেরত দিতে। ’৯০-এর দশকে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) তাদের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য উল্লেখ করত। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা আইএএফের এক কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পরের বছর থেকে আইএমএফ এ সংক্রান্ত আর কোনো তথ্য তাদের প্রতিবেদনে দিচ্ছে না।
ওই কর্মকর্তার ধারণা, এখন সুইস ব্যাংকের এই তথ্য নিয়ে বিভিন্ন দেশে হইচই হচ্ছে। একসময় দেখা যাবে তারাও আর এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করছে না।
সূত্র জানায়, সুইজারল্যান্ড থেকে পাচার করা টাকার তথ্য আনা অনেক কঠিন। কেননা তাদের দেশের আইনে ব্যাংকের গ্রাহকের কোনো তথ্য গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না। তবে এ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন নিয়ে প্রকাশ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকারক হিসেবে শনাক্ত করা ছাড়া আমানতের তথ্য বের করা সম্ভব হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে তা বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন হবে। এর চেয়ে আরও একটি সহজ ব্যবস্থা আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে। সুইজারল্যান্ডে কর সংস্থাগুলো বেশ শক্তিশালী। তারা কর দিয়ে ব্যক্তির অবৈধ সম্পদ শনাক্ত করতে পারে। এজন্য সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে এনবিআরের একটি সমঝোতা স্মারক করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করে কিছু তথ্য তাদের দেশ থেকে সংগ্রহ করেছে।
- See more at: http://www.jugantor.com/first-page/2014/06/26/115592#sthash.x5ulQKDG.dpuf

No comments:

Post a Comment