বালুর দূষণ বুড়িগঙ্গার চেয়েও বেশি
পার্থ শঙ্কর সাহা | আপডেট: ০১:৫১, এপ্রিল ০৩, ২০১৪
যাত্রা শুরু শীতলক্ষ্যা নদীর কাঁচপুর ঘাট থেকে। প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে শীতলক্ষ্যা। এখানেই উত্তর থেকে এসে মিশেছে বালু নদ।
গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে নয়টায় কাঁচপুরে নৌযানে উঠতেই যে দুর্গন্ধ লাগল, সেটি থেকেই গেল, বরং তীব্রতা বাড়তেই থাকল। নদীর মিশমিশে কালো রং, তাতেও কোনো পরিবর্তন নেই।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) নিয়মিত নদী পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে বালু নদে ছিল এই যাত্রা। কেবল বালু নদের পানির মান দেখা উদ্দেশ্য থাকলেও, শীতলক্ষ্যা থেকে শুরু করে বালু হয়ে যাত্রা শেষ হলো তুরাগে গিয়ে। টানা ৩৫ কিলোমিটারের নৌপথ। পবার বিশেষজ্ঞ দলটির সঙ্গে আছে পানি পরীক্ষার যন্ত্র।
সকাল ১০টার দিকে নৌযান ডেমরা খেয়াঘাটে থামে। বাঁয়ে ডেমরা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। ডান দিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের চনপাড়া। খেয়ানৌকায় মানুষ পারাপার চলছে। নদীর পানির রং আর দুর্গন্ধ এখন বেশ খানিকটা বেড়েছে। আবদুর রাজ্জাক (৭২) এই ঘাটে ২০ বছর ধরে নৌকা চালান। তিনি বললেন, ‘এই নদীতে অ্যাহন পোকাও পাইবেন না, এই পানিতে কিছু থায়ে?’ পরীক্ষণ যন্ত্র জানান দিল, তাঁর কথা নির্ভুল। এখানে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মাত্রা প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক ১১ মিলিগ্রাম। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুসারে পানিতে কোনো প্রাণের অস্তিত্বের জন্য ডিও থাকতে হয় সর্বনিম্ন ৫ মিলিগ্রাম।
পবার যুগ্ম সম্পাদক আবদুস সোবহান বলছিলেন, এই চিত্র বিস্ময়কর। কেননা বুড়িগঙ্গাতে পানির ডিও ছিল আরও বেশি। পবা গত ২৫ মার্চ বুড়িগঙ্গা নদীর ১১টি স্থানে পানির মান পরীক্ষা করে। সেখানে সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক শূন্য ৮ থেকে শূন্য দশমিক ২৩ পর্যন্ত পানিতে ডিও ছিল। তবে গতকাল বালুতে এর পরিমাণ সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক শূন্য ১ থেকে শূন্য দশমিক ১১ পাওয়া গেছে।
যে পথ ধরে যাচ্ছিলাম, এর দুই পাশে তেমন বড় কোনো শিল্পকারখানা নেই। তবে পানির এই হাল কেন?
নদীর বাঁ পাশে ডেমরা ইউনিয়নের ঠুলঠুলিয়া গ্রামের ফরিদা বেগম বললেন, ‘ঢাকার সব ময়লা পানি পড়তেছে রামপুরা খাল হইয়্যা বালুতে। পানি নষ্ট হইবো না ক্যান।’
গ্রামজুড়ে পানির দুর্গন্ধ ভেসে বেড়ায়। গ্রামের খলিল মিয়া (৪৭) বললেন, ‘এখন কেউ এই পানিতে হাতও দেয় না। কিন্তুক এই পানিই তো ফিটকারি দিয়া মিলাইয়া খাইছি ১৫/১৬ বছর আগে।’
কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, তাঁদের ভরসা এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সরবরাহ করা পানি। ভূগর্ভস্থ এই পানির সংযোগ খরচ লাগে পাঁচ হাজার টাকা। দিনে দেড় ঘণ্টা করে দুবার পানি দেয়।
নদী দেখভালের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. সামসুদ্দোহা খোন্দকার গতকাল প্রথম আলোকে জানান, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যায় মোট ৪০০টি পয়োবর্জ্যের নালা তাঁরা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে রামপুরা খাল অন্যতম। পয়োবর্জ্য পরিশোধনের দায়িত্বে থাকা ওয়াসাকে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সামসুদ্দোহা খোন্দকার জানান, এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
কেবল পয়ো বা গৃহস্থালি বর্জ্যই নয়, তুরাগ বয়ে আসা টঙ্গী অঞ্চলের শিল্পবর্জ্যও পড়ছে বালু নদে। প্রায় ২০ কিলোমিটার পার হয়ে বালু উলানপুরে এসে মিশেছে তুরাগের সঙ্গে। এর খানিকটা আগে ডুমনী সেতুর কাছে পানির সর্বনিম্ন ডিও শূন্য দশমিক শূন্য ১। এরপর যত এগোতে থাকি শক্ত পলিথিনের প্যাকেট, টিনের কৌটা, টুথপেস্টের প্যাকেটসহ কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
নদের দুই পাশে ভরা চৈত্রেও সবুজের কমতি নেই। হিজল, কুরচিসহ নানা গাছে ফুলও চোখে পড়ে। একদিকে পয়োবর্জ্য, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য। মাঝের দুর্গন্ধময় জলধারার সঙ্গে সেটি বেশ বেমানান।
No comments:
Post a Comment