ক্ষুধার কবল থেকে ভারতকে মুক্ত করতে পারবেন মোদী?
খাদ্য সুরক্ষা বিল প্রসঙ্গে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে লেখা নরেন্দ্র মোদীর চিঠিতে এই প্রশ্নের উত্তরের কিছুটা ইঙ্গিত মেলে৷ লিখছেনউজ্জয়িনী হালিম
'The right to adequate food is realized when every man, woman and child, alone or in community with others has the physical and economic access at all times to adequate food or means for its procurement' (International Covenant on Economic Social Cultural Rights, General Comment 12)ঠিক দশ বছর হল৷ নভেম্বর ২০০৪৷ রোম৷ আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য সুরক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, জড়ো হয়েছি এই শহরে৷ প্রত্যেকের মনে চনমনে উত্তেজনা৷ বিশ্বকে ক্ষুধা ও অপুষ্টি মুক্ত করার পথে যুগান্তকারী এক কদম নিতে চলেছে বিশ্ব৷
রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফ এ ও ) ১২৭তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হল খাদ্যের অধিকার বাস্তবায়িত করার নির্দেশাবলী৷ যা ছিল আদর্শ, লক্ষ্য, এ বার তা হতে চলেছে বাস্তব৷ইতিহাস দীর্ঘ৷ ১৯৪৮-এর সর্বজনীন মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সেই পথ চলার শুরু৷ তার পরের মাইল ফলকগুলি এ রকম --- ১৯৬৬ -র অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদে স্বীকৃত হল খাদ্যের অধিকারের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা৷ এর তিরিশ বছর পর ১৯৯৬-এ রোমেই অনুষ্ঠিত হল খাদ্য সুরক্ষার শীর্ষ সম্মেলন৷ অবশেষে ২০০৪-এর সেই অধিবেশন৷ এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কী পাওয়া গেল? যা ছিল 'ফুড এইড' বা খাদ্য দানের সাহায্য --- তা রূপান্তরিত হল মৌলিক অধিকারে৷ এই সব ঘোষণাপত্র, সনদ ও নির্দেশাবলীর প্রত্যেকটিতে সই করেছে ভারত সরকার৷
কিন্ত্ত বাস্তব? তা আজও লজ্জাকর৷ বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে বাস করেন বিশ্বের সর্বাধিক নিরন্ন মানুষ৷ খাদ্য সুরক্ষার অধিকার বাস্তবে সুনিশ্চিত করতে প্রথম প্রয়োজন জাতীয় স্তরে একটি আইন৷ ২০০৪-এ রাষ্ট্রসঙ্ঘের নির্দেশাবলীতে সই দেওয়ার পরেও ভারতীয় সংসদ পাক্কা ন'টি বছর লাগাল এই আইনটি তৈরি করতে৷ ২০১৩ সালে, ইউ পি এ-২ সরকার তখন অস্তাচলে৷ বিপুল বিতর্ক বিতণ্ডা, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর৷ কী আছে এই আইনটিতে? আছে দেশে চালু থাকা খাদ্য সংক্রান্ত একাধিক প্রকল্পকে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টি থেকে দেখার প্রচেষ্টা৷ গণবণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলিকে বিপুল ভর্তুকিতে খাদ্যশস্য বিতরণ, স্কুলে মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন, অঙ্গনবাড়ি কেন্দ্রগুলিতে ছয় মাস থেকে ছয় বছরের শিশুদের এবং গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা, প্রতি মাসে ১০০০ টাকা করে ছয় মাস পর্যন্ত দু'টি শিশুর জন্মের জন্য মাতৃত্ব ভাতার প্রবর্তন ইত্যাদি৷ দেশের ৭৫ শতাংশ গ্রামবাসী এবং ৫০ শতাংশ শহরবাসী দরিদ্র মানুষের এই আইনের ফলে উপকৃত হওয়ার কথা৷ প্রশ্ন হল রাষ্ট্রসঙ্ঘের নির্দেশাবলীতে বলা খাদ্যের অধিকারকে বাস্তবায়িত করার পক্ষে এই আইন কি সত্যি উপযুক্ত? বিতর্ক বিস্তর৷ আর এই বিতর্কে অন্যতম সরব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নরেন্দ্র মোদী৷ এই বিল তৈরির সময় তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী৷ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে এ নিয়ে তিনি পাঠালেন একটি লম্বা চিঠি৷ প্রতিপাদ্য -বিলটির নানা সীমাবদ্ধতা৷
সে সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই চিঠি আজ আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, কারণ মোদী নিজেই আজ প্রধানমন্ত্রী৷ সবাইকে নিয়ে দেশের উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি৷ প্রতিটি মানুষের ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা কাজেই হবে তাঁর প্রথম চ্যালেঞ্জ৷ এই প্রেক্ষিতে তাঁর সেই চিঠি ফিরে পড়লে আমরা দেখব সেখানে উল্লেখিত বিলটির বিভিন্ন সমস্যাগুলি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এ সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে তাঁর নীরবতা৷ মোদীর এই সরব ও নীরব অবস্থানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে খাদ্যের অধিকার প্রসঙ্গে তাঁর ও তাঁর দলের অবস্থানের দিকনির্দেশ, যা পরবর্তীতে দেশের খাদ্যের অধিকার এবং সে সংক্রান্ত আন্দোলনের দিকনির্দেশও ঠিক করে দেবে৷
ঠিক কী লিখেছিলেন মোদী? তাঁর মতে বিলটির গোড়ায় গলদ --- বিলের আওতায় কারা আসবেন তা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটিই অত্যন্ত দুর্বল৷ এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজ্যগুলিকে৷ ফলে এই আইনের সুবিধা কে পাবেন সে বিষয়ে জাতীয় স্তরে কোনও যোগ্যতার সর্বজনীন মাপকাঠি গড়ে উঠবে না৷ এই প্রসঙ্গে তিনি খাদ্য সুরক্ষাহীনতার কারণগুলি খুঁজে বের করার উপর জোর দেন এবং পরামর্শ দেন খাদ্য সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে সেই সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা করা উচিত৷ একই সঙ্গে মোদী শুধু বিপিএল বা দারিদ্র সীমার নীচে তালিকাভুক্ত মানুষকে এর সুবিধা দেওয়ার সমালোচনা করে বলেন এর ফলে দারিদ্র সীমার একটু উপরে থাকা (এপিএল ) তালিকাভুক্ত মানুষেরা এই আইনের সুবিধা পাবেন না৷ মনে রাখা ভালো বিজেপি শাসিত ছত্তিশগড় রাজ্যে খাদ্যসুরক্ষা আইন সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য৷ তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছিলেন খেটে খাওয়া মানুষের প্রয়োজনীয় দৈনিক ক্যালোরি জোগানের কোনও ব্যবস্থা এই বিলে নেই৷ তাঁর প্রতিটি কথা যুক্তিপূর্ণ ও বর্তমান আইনের খামতি৷
কিন্ত্ত এই আইনের একাধিক একই রকম গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা নিয়ে মোদী সম্পূর্ণ নীরব ওই চিঠিতে৷ কী সেগুলি? ভারত কৃষিপ্রধান দেশ৷ এ দেশের অধিকাংশ মানুষের খাদ্য উত্পাদিত হয় ক্ষুদ্র কৃষির মাধ্যমে ছোটো জোতে৷ চাষ হয় পারিবারিক উদ্যোগে৷ কিন্ত্ত এই ধরনের চাষ ক্রমাগত অলাভজনক হয়ে উঠছে৷ বাড়ছে কৃষির জন্যে প্রয়োজনীয় উপাদানের দাম৷ নেই যথেষ্ট সরকারি সাহায্য৷
অনেকেরই জানা নেই, ২০১৪ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ঘোষণা অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে 'International Year of Family Farming' বা আন্তর্জাতিক পারিবারিক কৃষিকাজ বর্ষ৷ ক্ষুদ্র পারিবারিক চাষই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে খাদ্য সুরক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার প্রধান পথ৷ কিন্ত্ত ভারতে তা গভীর সংকটে৷ একে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মৌলিক ভূমি ও কৃষি সংস্কার৷ দরকার জমি, জল, বীজের উপরে অধিকার প্রকৃত চাষি এবং অবশ্যই কৃষক-রমণীদের হাতে থাকা৷ ভারত সরকার কৃষিতে এই সংস্কার আনতে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ --- ২০০৬ সালে ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রে-তে অনুষ্ঠিত 'ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন অ্যাগ্রারিয়ান রিফর্ম অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ' (আইকার্ড)-এর শীর্ষ সম্মেলনের অধিবেশনে সেই মর্মেই সই দিয়ে এসেছে আমাদের দেশ৷ বাস্তব সম্পূর্ণ বিপরীত৷ বর্তমান খাদ্য সুরক্ষা আইনে এর কোনও দিশা নেই৷ মোদী নীরব৷
খাদ্য সুরক্ষার আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত সংজ্ঞা পরিষ্কার বলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাদ্যাভাসের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ এবং পরিবেশ -সচেতন ভাবে উত্পাদিত খাদ্যের কথা৷ এটি সরাসরি উত্পাদন মডেলের সঙ্গে যুক্ত৷ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কর্পোরেট পরিচালিত বৃহত্ কৃষিব্যবস্থার বিপদ আমরা দেখেছি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া পরিবর্তন ও ছোটো চাষিদের অবিরত চলতে থাকা আত্মহত্যার খবরের মধ্যেই৷ এই তথাকথিত 'উন্নত ' কৃষি যে খাদ্য সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না বিভিন্ন দেশে নানা পরীক্ষার পর সে উপলব্ধিতে পৌঁছেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ৷ খাদ্য সুরক্ষা আইনে নেই এই স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশবন্ধু চাষের কোনও দিশাও৷ মোদী আবার নীরব৷
মোদী খাদ্য সুরক্ষা আইনে ক্যালোরির খামতির কথা বলেছিলেন সঠিক ভাবেই৷ বলেননি পুষ্টির কথা৷ আসলে এই আইন খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যাবে তা কতগুলি বিশেষ খাদ্যশস্যের কথা বলছে৷ সেগুলি কর্পোরেট চালিত বৃহত্ কৃষির মাধ্যমে উত্পাদন সম্ভব৷ স্থানীয় ভাবে উত্পাদিত শাক সবজি , ফল -মূল ও আমিষ -খাদ্য , যা দরিদ্রকে দিতে পারে স্বল্প মূল্যে সুষম পুষ্টিকর আহার তার কথার কোনও উল্লেখই নেই খাদ্য সুরক্ষা আইনে৷ মোদী নির্বাক৷
এ ছাড়া আছে খাদ্য সংগ্রহ, মজুত ও বণ্টন ব্যবস্থার গভীর সমস্যা৷ এ দেশে ভেঙে পড়া গণবণ্টন ব্যবস্থাকে আপাদমস্তক না শুধরালে, অপচয় বন্ধ না করলে ও খাদ্যশস্য নষ্ট না করে মজুত করার ব্যবস্থা বিপুল ভাবে না বাড়ালে বর্তমান আইন ঠুঁটো জগন্নাথ৷ মোদী এখনও এই বিষয় নিয়ে মুখ খোলেননি৷ আশা করি খুলবেন শীঘ্রই৷ রাষ্ট্রই খাদ্য সুরক্ষার অধিকার পূরণে দায়বদ্ধ৷ আন্তর্জাতিক নির্দেশাবলী তাই বলে৷ এই দায়িত্বের 'আউটসোর্সিং' হতে পারে না৷
পাইয়ে দেওয়ার মনোবৃত্তি ও রাজনীতি থেকে খাদ্য সুরক্ষা চিন্তাকে বার করে তাকে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার করে তুলতে হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মডেলকেই আম আদমির অধিকারের স্বীকৃতি ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে৷ এর কোনও বিকল্প নেই৷ সিঙ্গুর থেকে সানন্দ যাই ঘটুক না কেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, দেশের সামনে 'কঠিন সময়' তাই প্রয়োজন 'কঠিন পদক্ষেপের'৷ ক্ষুধার থেকে কঠিনতর দুর্দশা একটি দেশের আর কী হতে পারে? ভারতে যা প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ আছে তাতে এই দুর্দশা থেকে মুক্তি মোটেই অসম্ভব নয়৷ বাধা পদে পদে কায়েমি স্বার্থের বেড়াজাল৷ প্রধানমন্ত্রী মোদী কি এই স্বার্থ ছিন্ন করে 'কঠিন পদক্ষেপ' নেওয়ার সাহস দেখাবেন? অপেক্ষায় রইলাম।
লেখক রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য সুরক্ষা কমিটির সিভিল সোসাইটি মেকানিজম -এর দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি
'The right to adequate food is realized when every man, woman and child, alone or in community with others has the physical and economic access at all times to adequate food or means for its procurement' (International Covenant on Economic Social Cultural Rights, General Comment 12)ঠিক দশ বছর হল৷ নভেম্বর ২০০৪৷ রোম৷ আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য সুরক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, জড়ো হয়েছি এই শহরে৷ প্রত্যেকের মনে চনমনে উত্তেজনা৷ বিশ্বকে ক্ষুধা ও অপুষ্টি মুক্ত করার পথে যুগান্তকারী এক কদম নিতে চলেছে বিশ্ব৷
রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফ এ ও ) ১২৭তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হল খাদ্যের অধিকার বাস্তবায়িত করার নির্দেশাবলী৷ যা ছিল আদর্শ, লক্ষ্য, এ বার তা হতে চলেছে বাস্তব৷ইতিহাস দীর্ঘ৷ ১৯৪৮-এর সর্বজনীন মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সেই পথ চলার শুরু৷ তার পরের মাইল ফলকগুলি এ রকম --- ১৯৬৬ -র অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদে স্বীকৃত হল খাদ্যের অধিকারের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা৷ এর তিরিশ বছর পর ১৯৯৬-এ রোমেই অনুষ্ঠিত হল খাদ্য সুরক্ষার শীর্ষ সম্মেলন৷ অবশেষে ২০০৪-এর সেই অধিবেশন৷ এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কী পাওয়া গেল? যা ছিল 'ফুড এইড' বা খাদ্য দানের সাহায্য --- তা রূপান্তরিত হল মৌলিক অধিকারে৷ এই সব ঘোষণাপত্র, সনদ ও নির্দেশাবলীর প্রত্যেকটিতে সই করেছে ভারত সরকার৷
কিন্ত্ত বাস্তব? তা আজও লজ্জাকর৷ বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে বাস করেন বিশ্বের সর্বাধিক নিরন্ন মানুষ৷ খাদ্য সুরক্ষার অধিকার বাস্তবে সুনিশ্চিত করতে প্রথম প্রয়োজন জাতীয় স্তরে একটি আইন৷ ২০০৪-এ রাষ্ট্রসঙ্ঘের নির্দেশাবলীতে সই দেওয়ার পরেও ভারতীয় সংসদ পাক্কা ন'টি বছর লাগাল এই আইনটি তৈরি করতে৷ ২০১৩ সালে, ইউ পি এ-২ সরকার তখন অস্তাচলে৷ বিপুল বিতর্ক বিতণ্ডা, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর৷ কী আছে এই আইনটিতে? আছে দেশে চালু থাকা খাদ্য সংক্রান্ত একাধিক প্রকল্পকে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টি থেকে দেখার প্রচেষ্টা৷ গণবণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলিকে বিপুল ভর্তুকিতে খাদ্যশস্য বিতরণ, স্কুলে মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন, অঙ্গনবাড়ি কেন্দ্রগুলিতে ছয় মাস থেকে ছয় বছরের শিশুদের এবং গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা, প্রতি মাসে ১০০০ টাকা করে ছয় মাস পর্যন্ত দু'টি শিশুর জন্মের জন্য মাতৃত্ব ভাতার প্রবর্তন ইত্যাদি৷ দেশের ৭৫ শতাংশ গ্রামবাসী এবং ৫০ শতাংশ শহরবাসী দরিদ্র মানুষের এই আইনের ফলে উপকৃত হওয়ার কথা৷ প্রশ্ন হল রাষ্ট্রসঙ্ঘের নির্দেশাবলীতে বলা খাদ্যের অধিকারকে বাস্তবায়িত করার পক্ষে এই আইন কি সত্যি উপযুক্ত? বিতর্ক বিস্তর৷ আর এই বিতর্কে অন্যতম সরব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নরেন্দ্র মোদী৷ এই বিল তৈরির সময় তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী৷ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে এ নিয়ে তিনি পাঠালেন একটি লম্বা চিঠি৷ প্রতিপাদ্য -বিলটির নানা সীমাবদ্ধতা৷
সে সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই চিঠি আজ আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, কারণ মোদী নিজেই আজ প্রধানমন্ত্রী৷ সবাইকে নিয়ে দেশের উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি৷ প্রতিটি মানুষের ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা কাজেই হবে তাঁর প্রথম চ্যালেঞ্জ৷ এই প্রেক্ষিতে তাঁর সেই চিঠি ফিরে পড়লে আমরা দেখব সেখানে উল্লেখিত বিলটির বিভিন্ন সমস্যাগুলি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এ সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে তাঁর নীরবতা৷ মোদীর এই সরব ও নীরব অবস্থানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে খাদ্যের অধিকার প্রসঙ্গে তাঁর ও তাঁর দলের অবস্থানের দিকনির্দেশ, যা পরবর্তীতে দেশের খাদ্যের অধিকার এবং সে সংক্রান্ত আন্দোলনের দিকনির্দেশও ঠিক করে দেবে৷
ঠিক কী লিখেছিলেন মোদী? তাঁর মতে বিলটির গোড়ায় গলদ --- বিলের আওতায় কারা আসবেন তা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটিই অত্যন্ত দুর্বল৷ এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজ্যগুলিকে৷ ফলে এই আইনের সুবিধা কে পাবেন সে বিষয়ে জাতীয় স্তরে কোনও যোগ্যতার সর্বজনীন মাপকাঠি গড়ে উঠবে না৷ এই প্রসঙ্গে তিনি খাদ্য সুরক্ষাহীনতার কারণগুলি খুঁজে বের করার উপর জোর দেন এবং পরামর্শ দেন খাদ্য সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে সেই সমস্যাগুলি সমাধানের চেষ্টা করা উচিত৷ একই সঙ্গে মোদী শুধু বিপিএল বা দারিদ্র সীমার নীচে তালিকাভুক্ত মানুষকে এর সুবিধা দেওয়ার সমালোচনা করে বলেন এর ফলে দারিদ্র সীমার একটু উপরে থাকা (এপিএল ) তালিকাভুক্ত মানুষেরা এই আইনের সুবিধা পাবেন না৷ মনে রাখা ভালো বিজেপি শাসিত ছত্তিশগড় রাজ্যে খাদ্যসুরক্ষা আইন সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য৷ তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছিলেন খেটে খাওয়া মানুষের প্রয়োজনীয় দৈনিক ক্যালোরি জোগানের কোনও ব্যবস্থা এই বিলে নেই৷ তাঁর প্রতিটি কথা যুক্তিপূর্ণ ও বর্তমান আইনের খামতি৷
কিন্ত্ত এই আইনের একাধিক একই রকম গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা নিয়ে মোদী সম্পূর্ণ নীরব ওই চিঠিতে৷ কী সেগুলি? ভারত কৃষিপ্রধান দেশ৷ এ দেশের অধিকাংশ মানুষের খাদ্য উত্পাদিত হয় ক্ষুদ্র কৃষির মাধ্যমে ছোটো জোতে৷ চাষ হয় পারিবারিক উদ্যোগে৷ কিন্ত্ত এই ধরনের চাষ ক্রমাগত অলাভজনক হয়ে উঠছে৷ বাড়ছে কৃষির জন্যে প্রয়োজনীয় উপাদানের দাম৷ নেই যথেষ্ট সরকারি সাহায্য৷
অনেকেরই জানা নেই, ২০১৪ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ঘোষণা অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে 'International Year of Family Farming' বা আন্তর্জাতিক পারিবারিক কৃষিকাজ বর্ষ৷ ক্ষুদ্র পারিবারিক চাষই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে খাদ্য সুরক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার প্রধান পথ৷ কিন্ত্ত ভারতে তা গভীর সংকটে৷ একে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মৌলিক ভূমি ও কৃষি সংস্কার৷ দরকার জমি, জল, বীজের উপরে অধিকার প্রকৃত চাষি এবং অবশ্যই কৃষক-রমণীদের হাতে থাকা৷ ভারত সরকার কৃষিতে এই সংস্কার আনতে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ --- ২০০৬ সালে ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রে-তে অনুষ্ঠিত 'ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন অ্যাগ্রারিয়ান রিফর্ম অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ' (আইকার্ড)-এর শীর্ষ সম্মেলনের অধিবেশনে সেই মর্মেই সই দিয়ে এসেছে আমাদের দেশ৷ বাস্তব সম্পূর্ণ বিপরীত৷ বর্তমান খাদ্য সুরক্ষা আইনে এর কোনও দিশা নেই৷ মোদী নীরব৷
খাদ্য সুরক্ষার আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত সংজ্ঞা পরিষ্কার বলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাদ্যাভাসের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ এবং পরিবেশ -সচেতন ভাবে উত্পাদিত খাদ্যের কথা৷ এটি সরাসরি উত্পাদন মডেলের সঙ্গে যুক্ত৷ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কর্পোরেট পরিচালিত বৃহত্ কৃষিব্যবস্থার বিপদ আমরা দেখেছি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া পরিবর্তন ও ছোটো চাষিদের অবিরত চলতে থাকা আত্মহত্যার খবরের মধ্যেই৷ এই তথাকথিত 'উন্নত ' কৃষি যে খাদ্য সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না বিভিন্ন দেশে নানা পরীক্ষার পর সে উপলব্ধিতে পৌঁছেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ৷ খাদ্য সুরক্ষা আইনে নেই এই স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশবন্ধু চাষের কোনও দিশাও৷ মোদী আবার নীরব৷
মোদী খাদ্য সুরক্ষা আইনে ক্যালোরির খামতির কথা বলেছিলেন সঠিক ভাবেই৷ বলেননি পুষ্টির কথা৷ আসলে এই আইন খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যাবে তা কতগুলি বিশেষ খাদ্যশস্যের কথা বলছে৷ সেগুলি কর্পোরেট চালিত বৃহত্ কৃষির মাধ্যমে উত্পাদন সম্ভব৷ স্থানীয় ভাবে উত্পাদিত শাক সবজি , ফল -মূল ও আমিষ -খাদ্য , যা দরিদ্রকে দিতে পারে স্বল্প মূল্যে সুষম পুষ্টিকর আহার তার কথার কোনও উল্লেখই নেই খাদ্য সুরক্ষা আইনে৷ মোদী নির্বাক৷
এ ছাড়া আছে খাদ্য সংগ্রহ, মজুত ও বণ্টন ব্যবস্থার গভীর সমস্যা৷ এ দেশে ভেঙে পড়া গণবণ্টন ব্যবস্থাকে আপাদমস্তক না শুধরালে, অপচয় বন্ধ না করলে ও খাদ্যশস্য নষ্ট না করে মজুত করার ব্যবস্থা বিপুল ভাবে না বাড়ালে বর্তমান আইন ঠুঁটো জগন্নাথ৷ মোদী এখনও এই বিষয় নিয়ে মুখ খোলেননি৷ আশা করি খুলবেন শীঘ্রই৷ রাষ্ট্রই খাদ্য সুরক্ষার অধিকার পূরণে দায়বদ্ধ৷ আন্তর্জাতিক নির্দেশাবলী তাই বলে৷ এই দায়িত্বের 'আউটসোর্সিং' হতে পারে না৷
পাইয়ে দেওয়ার মনোবৃত্তি ও রাজনীতি থেকে খাদ্য সুরক্ষা চিন্তাকে বার করে তাকে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার করে তুলতে হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মডেলকেই আম আদমির অধিকারের স্বীকৃতি ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে৷ এর কোনও বিকল্প নেই৷ সিঙ্গুর থেকে সানন্দ যাই ঘটুক না কেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, দেশের সামনে 'কঠিন সময়' তাই প্রয়োজন 'কঠিন পদক্ষেপের'৷ ক্ষুধার থেকে কঠিনতর দুর্দশা একটি দেশের আর কী হতে পারে? ভারতে যা প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ আছে তাতে এই দুর্দশা থেকে মুক্তি মোটেই অসম্ভব নয়৷ বাধা পদে পদে কায়েমি স্বার্থের বেড়াজাল৷ প্রধানমন্ত্রী মোদী কি এই স্বার্থ ছিন্ন করে 'কঠিন পদক্ষেপ' নেওয়ার সাহস দেখাবেন? অপেক্ষায় রইলাম।
লেখক রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য সুরক্ষা কমিটির সিভিল সোসাইটি মেকানিজম -এর দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি
http://eisamay.indiatimes.com/editorial/post-editorial/will-modi-be-able-to-eradicate-poverty/articleshow/37114136.cms
No comments:
Post a Comment