Thursday, July 24, 2014

গাজার গণহত্যা এবং খালেদা জিয়ার ওমরাহ-রাজনীতি শাহরিয়ার কবির

গাজার গণহত্যা এবং খালেদা জিয়ার ওমরাহ-রাজনীতি
শাহরিয়ার কবির
প্যালেস্টাইনের গাজায় ইসরাইলের গত ১৭ দিনের হামলায় সাত শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত কয়েক হাজার এবং লক্ষাধিক গৃহহীন হয়েছেন। ইসরাইল যদিও বলেছে তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু অর্থাৎ হামাস-এর ঘাঁটি ও সুড়ঙ্গপথের উপর আক্রমণ পরিচালনা করছে, কিন্তু যাবতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে- গাজায় শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ হাসপাতাল, মসজিদ, আবাসিক গৃহ কোন কিছুই ইসরাইলী হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশ প্যালেস্টাইনের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ইসরাইলের এই বর্বরোচিত হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান গাজার অসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর নির্বিচার এই হামলার জন্য ইসরাইলকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, গাজায় হামাস-এর সুড়ঙ্গপথ ও ঘাঁটি ধ্বংস না করা পর্যন্ত আক্রমণ অব্যাহত থাকবে। আমেরিকা বরাবরের মতোই দু’মুখো নীতিতে অটল রয়েছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। ইসরাইল ও আমেরিকা এই যুদ্ধের জন্য হামাসকে দায়ী করেছে।
ইসরাইল-প্যালেস্টাইনের সাম্প্রতিক বিরোধ ও সংঘাতের কারণ জানতে হলে প্রথমে হামাস সম্পর্কে জানা দরকার। হামাসের মূল আরবি হচ্ছে ‘হরকত আল মুকাওয়ামা আল ইসলামিয়া’- বাংলায় ‘ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন।’ মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলেমিন)-এর প্যালেস্টাইনীয় শাখা বলা যেতে পারে হামাসকে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে মুসলিম বিশ্বে যখন আল কায়েদা, তালেবান ও অন্যান্য জঙ্গী সংগঠনের উত্থান ঘটছে তখন প্যালেস্টাইনে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যরা হামাস গঠন করেন। প্যালেস্টাইনের মাটি থেকে সকল ইহুদী ও ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটি উৎখাত করে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে হামাস। আল কায়দার মতো বিশ্বব্যাপী হামাসের পরিচিতি ঘটেছে উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে। জিহাদের নামে আত্মঘাতী বোমা হামলা, শিশুদের বোমাবাহক হিসেবে ব্যবহার হামাসই শুরু করেছে।
প্যালেস্টাইনের গাজা হচ্ছে হামাসের প্রধান কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার পর হামাস গাজা ও পশ্চিম তীরে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করেছে। প্রথম দিকে আরব বিশ্ব ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকাও হামাসকে তাদের বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে। আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সৌদি আরব হামাসকে সাহায্য করেছে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন পিএলওর কঠোর সমালোচনার জন্য। আরাফাতের আস্থা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের প্রতি। হামাস তাদের ঘোষণায় স্পষ্টভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ইসলামবিরোধী ও কুফরি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। যে কারণে আফগানিস্তানে আল কায়েদা ও তালেবান গঠনে আমেরিকা ও সৌদি আরব সমর্থন করেছিল, একই কারণে হামাসকে লালন-পালনে তারা সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছে প্যালেস্টাইনে আরাফাতের নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করার জন্য।
তুরস্ক থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী সরকার উৎখাত করে ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের জন্য মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে আমেরিকা সবসময় মদদ দিয়েছে। আল কায়েদা ও তালেবানের মতো হামাসও কাল-পরিক্রমায় আবির্ভূত হয়েছে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানব হিসেবে। ২০০৭-এ ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব প্যালেস্টাইনকে নির্বাচনের জন্য চাপ দেয়। হামাস আগে যে কোনও নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করলেও পশ্চিমা বন্ধুদের পরামর্শে ২০০৬-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং গাজায় আরাফাতের দল ফাতাহ-কে পরাজিত করে সরকার গঠন করে। আরাফাতের বিরোধিতার জন্য সৌদি আরব ও আমেরিকার পাশাপাশি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোশাদও হামাসকে সহযোগিতা প্রদান করেছিল।
হামাস প্রথমে গাজা উপত্যকায় এবং পরে পশ্চিম তীর (ওয়েস্ট ব্যাংক), জর্দান ও সিরিয়ায় তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম প্রসারিত করেছে সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার কথা বলে। প্রথমে তারা আরাফাতের পিএলওর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেনি। ধীরে ধীরে কৌশলে স্বমূর্তিতে আবির্ভাব ঘটেছে হামাসের। আরাফাতের নেতৃত্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকে চ্যালেঞ্জ করে ইসলামী জাতীয়তাবাদ প্রচারের পাশাপাশি সশস্ত্র জিহাদকে তারা স্বাধীনতার একমাত্র পথ ঘোষণা করেছে। ২০০৬ সালে ফাতাহকে হটিয়ে গাজার কর্তৃত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তারা মোল্লা উমরের তালেবানি আফগানিস্তান এবং আয়াতুল্লাদের ইরানের মতো কট্টর ওহাবি রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
নিকট প্রতিবেশী জর্দান ও সিরিয়ার মতো প্যালেস্টাইনে জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হলেও সমাজ সৌদি আরবের মতো রক্ষণশীল ছিল না। জর্দানে বা সিরিয়ায় মেয়েদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক নয়। এখনও নাচ, গান, অপেরা, চলচ্চিত্র সেসব দেশে স্বাভাবিকভাবেই চলে। গাজায় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব গ্রহণ করে হামাস প্রথমেই নারীদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ঘরের বাইরে তাদের কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। গাজার সিনেমা হল, অপেরা হাউস তারা বন্ধ করে দিয়েছে। নৃত্যশিল্পের চর্চা বন্ধ হয়ে গেছে। ইসলামী ভাবধারায় সমৃদ্ধ না হলেও সঙ্গীত পরিবেশনও নিষিদ্ধ হয়েছে। এর পাশাপাশি জিহাদের নামে ইসরাইলে হামলার জন্য শিশুদের তারা বোমাবাহক এবং আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহার করছে। এরপরও অস্বীকার করা যাবে না যে ২০০৬-এর নির্বাচনে প্যালেস্টাইনের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে হামাস জয়ী হয়েছে।
১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইন দখল করে ইসরাইলী রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণার পর থেকে এ অঞ্চলের মানুষ দুর্যোগ-দুর্ভোগের যে মহাসমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হয়েছে- যেভাবে তাদের ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়েছে, যেভাবে হত্যা, নির্যাতন, লাঞ্ছনা প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে, সম্ভবত বিশ্বের অন্য কোন জাতিকে এত দীর্ঘ সময় এ ধরনের দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয়নি।
নাৎসি জার্মানিতে ইহুদীদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ষাট লাখ ইহুদীকে যেভাবে হিটলারের বিভিন্ন বাহিনী হত্যা করেছে- সভ্যতার ইতিহাসে তার দ্বিতীয় নজির নেই। সেই নির্যাতিতরা এবং তাদের বংশধররা প্যালেস্টাইনের নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের ওপর প্রায় ছয় যুগ ধরে যে নির্যাতন চালাচ্ছে পরিসংখ্যানের দিক থেকে না হলেও চরিত্রগতভাবে তা নাৎসিদের চেয়ে কম নৃশংস নয়। এর ফলে মুসলিম মৌলবাদীরা ইসরাইল-প্যালেস্টাইনের জাতিগত বিরোধকে রূপান্তরিত করেছে কোরানে বর্ণিত মুসলিম ইহুদীদের ধর্মীয় বিরোধে এবং চরম ইহুদী বিদ্বেষ থেকে জন্ম নিয়েছে নাৎসি আসক্তি; যদিও দুটি দেশেই ইব্রাহিমীয় তিনটি প্রধান ধর্ম ইহুদী খ্রীস্টান ও ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা রয়েছেন। প্যালেস্টাইনে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাড়াও যে খ্রীস্টান, ইহুদী ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী আছেন হামাসও এই সত্য অস্বীকার করতে পারেনি। তবে তাদের ঘোষণায় বলা হয়েছে, একমাত্র ইসলামের পক্ষপুটেই প্যালেস্টাইনের খ্রীস্টান ও ইহুদীরা নিরাপদ থাকতে পারবে। গাজায় হামাসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর খ্রীস্টান জনসংখ্যা যে দ্রুততার সঙ্গে কমছে এটি অব্যাহত থাকলে আগামী দশ বছরে সেখানে কোন খ্রীস্টান খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, যদিও প্যালেস্টাইনের বেথেলেহেমেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন যীশুখ্রিস্ট।
একথা আমরা বহুবার বলেছি, প্যালেস্টাইনের জনগণ কোনদিনই পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবেন না যতদিন সৌদি আরব মুখে প্যালেস্টাইনের পক্ষে আর গোপনে ইসরাইলের পক্ষে থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান লাঠিয়াল হচ্ছে সৌদি রাজপরিবার। আরব বিশ্বের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত অথবা হত্যার ক্ষেত্রে সবসময় মার্কিন পরিকল্পনার বিশ্বস্ত সহযোগী ছিল সৌদি আরব।
গাজায় ইসরাইলের সম্প্রতি হামলার পর বিশ্বের গণমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ‘দি ওয়ার্ল্ড পোস্ট’ ২০ জুলাই (২০১৪) প্রকাশিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ প্রবীণ সাংবাদিক, ‘মিডল ইস্ট আই’ সাময়িকীর বর্তমান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট-এর এক পিলে চমকানো ভাষ্য। ‘এ্যাটাক অন গাজা বাই সৌদি রয়েল এ্যাপয়েন্টমেন্ট’ শিরোনামের এই লেখায় তিনি লিখেছেন, ‘গাজায় (ইসরাইলের) এই হামলার অনুমোদন এসেছে সৌদি রাজপরিবার থেকে। সৌদি আরবের এই রাজকীয় অনুমোদন ইসরাইলে গোপন কোন বিষয় নয়।’ ডেভিড হার্স্ট ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে লিখেছেন, বর্তমানে ইসরাইলের সঙ্গে মিসর ও আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতম সময় অতিবাহিত হচ্ছে।
(বাকী অংশ আগামীকাল)
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment