Thursday, July 24, 2014

সৈয়দ কায়সারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক অব্যাহত যুদ্ধাপরাধী বিচার

সৈয়দ কায়সারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক অব্যাহত
যুদ্ধাপরাধী বিচার
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত দ্বিতীয় দিনের মতো আসামির বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ৪ আগস্ট পরবর্তী যুক্তিতর্কের জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দু’সদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম। অন্যদিকে প্রসিকিউশন পক্ষ মে মাসের পর থেকে কোন ঝুঁকিভাতা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের জন্য প্রসিকিউটরদের বেতন ও ঝুঁকিভাতার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে ৫ কোটি ৭১ হাজার টাকা চেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইন মন্ত্রণালয় ঝুুঁকিভাতা বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চীফ প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেছেন, ব্যাখ্যা চাইলে অবশ্যই আমরা ব্যাখ্যা দেব।
বৃহস্পতিবার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত আসামি সৈয়দ কায়সারের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্কে বেশ কিছু ডকুমেন্ট তুলে ধরেন। এর মধ্যে ২০০১ সালের দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় সৈয়দ কায়সারের ওপর একটি রিপোর্ট, বেশ কিছু বইয়ের বিবরণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন। বইয়ের মধ্যে রয়েছে এ্যাসোসিয়েট অব পাকিস্তান আর্মি ৭১, সিলেটের গণহত্যা, সেক্টর ফোরামের ৫০ জনের তালিকা যার মধ্যে সৈয়দ কায়সারের নাম রয়েছে।
যুক্তিতর্কে চার্জের ওপর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এই চার্জে ৯ সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। যার মধ্যে ১ সাক্ষী ভিকটিম। সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে মোট নয় ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, আটক, ধর্ষণ, মুক্তিপণ আদায়, অগ্নিসংযোগ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে। সৈয়দ কায়সারের বাবা সৈয়দ সঈদউদ্দিন ১৯৬২ সালে সিলেট-৭ আসন থেকে মুসলিম লীগের হয়ে এমএলএ নির্বাচিত হন আর কায়সার ১৯৭০ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
১৯৭১ সালে দখলদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর হিসেবে তাদের পক্ষ নেন কায়সার। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ স্বাধীনতাবিরোধীকে নিয়ে তিনি নিজের নামে ‘কায়সার বাহিনী’ গঠন করেন। সৈয়দ কায়সার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পথ দেখিয়ে বিভিন্ন গ্রামে নিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের লোক এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালাতেন। পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগে তিনি আত্মগোপন করেন।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে আবারও রাজনীতিতে আসেন কায়সার। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। পরে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং দলের হবিগঞ্জ শাখার সভাপতি হন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন কায়সার। ১৯৮৮ সালে হবিগঞ্জ-৪ আসন থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
কায়সারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল সৈয়দ মোঃ কায়সার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর থানা এলাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে থেকে হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, অত্যাচার ও গুরুতর জখমের ঘটনা ঘটান। একই দিন হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানা এলাকায় তারা একটি বাজারসহ গ্রামের অসংখ্য বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং অনেক লোককে হত্যা করে। ২৮ এপ্রিল সৈয়দ কায়সার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে একটি বাজারসহ কয়েকটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে লুটপাটসহ বহু বাড়িঘর ও বাজার পুড়িয়ে দেয়। পরদিন হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ থানা এলাকায় পাকিস্তানী বাহিনীকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে দুই জনকে আটক, অত্যাচার ও হত্যা করেন কায়সার। ৩০ এপ্রিল কায়সার হবিগঞ্জ সদর থানা এলাকায় সেনা সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে অভিযান চালান এবং বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেন। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে আসামি সৈয়দ কায়সার পাকিস্তানীদের নিয়ে চুনারুঘাট থানা এলাকায় অভিযানে যায়। সেখানে এক সাঁওতালি নারীকে ধর্ষণ করে। ১৫ মে কায়সার তার লোকজন ও সেনা নিয়ে মাধবপুর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটজনকে হত্যা করেন। ২৯ মে কায়সার শায়েস্তাগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে অপহরণ করে দীর্ঘদিন নির্যাতনের পর হত্যা করেন।
১৬ জুন কায়সারের নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা হবিগঞ্জ সদর থেকে একজনকে অপহরণ করে। পরে পাকিস্তানী সেনা সদস্যরা তাকে হত্যা করে। ২৩ জুন সৈয়দ কায়সার নাসিরনগর থানা এলাকায় নিজের লোকজন নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ চালায় এবং লোকজনকে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পর একজনকে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের আগস্টে কায়সার মাধবপুর থানা এলাকায় নিজের লোকজন ও পাকিস্তানী বাহিনীকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে অপরহরণ, নির্যাতন ও ধর্ষণ ঘটায়। ১৮ আগস্ট কায়সার ও তার বাহিনী চুনারুঘাট চা বাগান এলাকায় অভিযান চালিয়ে চার মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করে নির্যাতন চালায় এবং সবাইকে হত্যা করে লাশ কুয়ায় ফেলে দেয়। ২৯ আগস্ট কায়সার তার বাহিনীসহ মাধবপুর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চার মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করে অত্যাচারের পর হত্যা করে। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি একদিন কায়সার তার বাহিনীসহ মাধবপুর থানার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এক মুক্তিযোদ্ধাকে অপহরণ এবং নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে। ১৫ নবেম্বর কায়সার তার বাহিনী ও পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে নাসিরনগর থানা এলাকার ২০-২২টি গ্রামে শতাধিক লোককে হত্যা করেন এবং বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়।
গত ২ ফেব্রুযারি সৈয়দ কায়সারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। কায়সারের বিরুদ্ধে গণহত্যার একটি, হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের ১৩টি এবং ধর্ষণের দু’টিসহ মোট ১৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। গত বছরের ১৪ নবেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়া হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়ে বর্তমানে রাজধানীতে ছেলের বাসায় রয়েছেন কায়সার। কায়সার হচ্ছেন দ্বিতীয় কোন আসামি শর্ত সাপেক্ষে জামিন পেলেন। এর আগে বিএনপি নেতা আব্দুল আলীম শর্ত সাপেক্ষে জামিনে ছিলেন।
প্রসঙ্গ ঝুঁকিভাতা
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকেই রেজিস্ট্রার কার্যালয়, তদন্ত সংস্থা এবং প্রসিকিউশন পক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ ঝুঁকিভাতা পেয়ে আসছেন। এবারই ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটেছে প্রসিকিউশন পক্ষে। প্রসিকিউশন পক্ষে মে মাসের ঝুঁকিভাতা দেয়া হয়েছে। এর পর থেকে আর কোন ঝুঁকিভাতা দেয়া হয়নি। এমনকি প্রসিকিউশন পক্ষের প্রসিকিউটরবৃন্দ জুলাই মাসের বেতন পর্যন্ত পাননি। এ নিয়ে প্রসিকিউটরদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রসিকিউশন পক্ষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রসিকিউটরদের বেতন ও ঝুঁকিভাতা বাবদ ৫ কোটি টাকা খরচের জন্য দেয়া হয়। এর মধ্যে ৩ কোটি টাকা বেতন ও দেড় কোটি টাকা ঝুঁকিভাতা। ২২ জুলাই আইন মন্ত্রণালয় থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব মিয়াজী শহীদুল আলম চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, চীফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে ব্যয় নির্বাহের জন্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে সর্বমোট ৫ কোটি ৭১ হাজার ৮শ’ ৫২ টাকা বরাদ্দের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যান্য ভাতা ঝুঁকিভাতা খাতে দেড় কোটি টাকার প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা প্রদান, ভ্রমণভাতা খাতে চাহিত বরাদ্দের বিপরীতে যৌক্তিক কারণে দেশে-বিদেশে ভ্রমণের অগ্রিম তালিকা, পেট্রোল ও লুব্রিক্যান্ট খাতে বরাদ্দকৃত গাড়ি অনুযায়ী সরকারী বিধিমোতাবেক প্রাপ্যতাসহ উল্লিখিত খাতগুলোর বিপরীতে চাহিত অর্থের প্রয়োজনীয়তার পৃথক পৃথক ব্যাখ্যা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment